ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

একদা  ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

কয়েক হাজার শ্রমিককে একসাথে জড়ো করে, তাদের এনে ছেড়ে দিলেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায়। “এখন থেকে এখানেই খাবে, এখানেই বাঁচবে। তোমাদের নিয়তি আমরা নির্দিষ্ট করে দিয়ে গেলাম -জাস্ট শুধু ভবিষ্যৎটি নির্মাণ করা, এতটুকুই তোমাদের কাজ! নিজের ধান নিজে লাগাও, নিজের পায়ে নিজেই দাঁড়াও, অর্থাৎ নিজে নিজেরটা করে খাও। এখানে গাছ গাছালির কোন অভাব নেই,  প্রকৃতি বড়ই মনোরম ! নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে, নোনা নদীতে মাছ ধরো, নৌকা বাও -যা খুশি ! নোবডি কাম হেয়ার টু ডিস্টার্ব ইয়ো, এঞ্জয় লাইফ এন্ড বিউটি।  বাই বাই!  গুড বাই!” – বলতে বলতে , গভীর বনাঞ্চল সংলগ্ন নদী তীরে অসহায় শ্রমিকদেরকে নামিয়ে দিয়েই – চলে গেলেন মহান ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

জীবন যার নাম, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে, সুতীব্র লড়াই সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই। সামাল দিতে হয় যাবতীয় ঝড় ঝঞ্ঝা। এ যে, জীবন নিয়ে যুদ্ধবাজি খেলা! খেলে যেতে হয় শেষ বাঁশী পর্যন্ত! তাই বাঁচা মরার এই খেলাতে সর্বোচ্চ না খেলে পিছপা হয়েছে মানব সম্প্রদায় – ইতিহাস সেই সাক্ষ্য দেয় না। এভাবেই সুন্দরবনের জন মানবহীন উপকূলে একদিন ধীরে ধীরে গড়ে উঠল জন বসত। এখানে পল্লী কুটিরেই একদিন জমে উঠল হাসি-কান্না, সুখ-স্বপনে জীবন হয়ে উঠল রঙিন।

icddr b (2)

তারপর একদিন , সেটি ছিল ১৮১৭ খৃস্টাব্দের ঘটনা । এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে নেমে এলেন ‘ওলাদেবী’। তখনও পর্যন্ত অত্র এলাকাবাসী জানতো না, কে ছিলেন এই ওলাদেবী?

কে এই ওলাদেবী?

হিন্দু শাস্ত্রমতে তিনি হচ্ছেন ময়দানবের স্ত্রী । তিনি দেখতে লক্ষ্মী-সরস্বতীর মতো হলেও  তাঁর গায়ের রঙ ছিল গাঢ় হলুদ বর্ণ । পরিধানে নীলবর্ণ শাড়ি আর সর্ব শরীর জুড়ে বহুবিধ অলংকার। দুই হস্ত সম্মুখে প্রসারিত অবস্থায় কখনও তিনি দণ্ডায়মান, মাতৃক্রোড়ে শিশু সন্তান নিয়ে কখনও বা তিনি উপবিষ্টা। তবে লক্ষ্মী-সরস্বতীর ন্যায় পেঁচা এবং রাজহাঁস টাইপ বাহন নিয়ে চলাফেরায় তিনি অভ্যস্ত নন । বাহন ছাড়াই তিনি একা, আবার একাই তিনি একশ ! হিন্দুরা তাঁর নাম দিলেন –ওলাদেবী, ওলাই চণ্ডী কিংবা ওলাই মাতা ।

তিনি জাতিভেদ প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন না, কে হিন্দু, কে মুসলমান এইসব তাঁর কাছে কোন সাবজেক্টই ছিল না। মানুষকে ধর্ম দিয়ে মাপামাপি করায়, তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক দেবী। তাই অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমান খৃস্টান বৌদ্ধরাও  তাঁর পূজা করতে লাগলেন। তবে মুসলমান রীতিতে তাঁর গেটাপ মেকাপ ও পোশাক হল একটু অন্যরকম। মুখমণ্ডলে বিরাজমান ছিল লাবণ্য প্রভা, অভিজাত ঘরের আদরের দুলালী তিনি, অপরূপা এক কিশোরী কন্যা। পরনে পিরান,  পাজামা,  টুপি আর ওড়না, গায়ে বেশ কিছু অলঙ্কার। পায়ে নাগরা জুতা, কখনও কখনও পা মোজা দিয়ে মোড়া। চাহিবা মাত্র ইহার বাহক অর্থাৎ ভক্তকূলের মুশকিল আসান  করে দেয়ার জন্য, এক হস্তে  একটি ক্যারিশমেটিক লাঠিদন্ড। মুসলমানরা তাঁর নাম দিলেন –ওলাবিবি, ওলাম্মা কিংবা বিবিমা

মুসলমানরা চালু করেছিলেন, ওলাবিবির  একক পূজা কিংবা ঝোলাবিবি, আজগৈবিবি, চাঁদবিবি, বাহড়বিবি, ঝেটুনেবিবি ও আসানবিবি এ ছয়জনের সঙ্গেও পূজা করায় কোন আপত্তি নেই, সব মিলিয়ে তখন সাতবিবি। হিন্দুরা আগে থেকেই তাঁর পূজা চালু করে দিয়েছিলেন, তারা বললেন –  যাহা ওলাবিবি  তাহাই ওলাদেবী আবার তাহাই   ব্রাহ্মী, মহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী ।  ঘুরিয়ে পেচিয়ে  সবই এক! পণ্ডিতকুল ডিক্লারেশন দিলেন – প্রাচীন মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় এইরকম পূজা পদ্ধতির প্রচলন ছিল, সেটা কিন্তু আমাদের জানা আছে হে! ওলাদেবীর পূজার স্থান নির্দিষ্ট করা হল পল্লীর বৃক্ষতলে পর্ণকুটিরে, শনি অথবা মঙ্গলবার। আর প্রসাদ কিংবা তোবারক হিসাবে – সন্দেশ, বাতাসা, পান-সুপারি, আতপ চাল, পাটালি গুড়, যার যেমন সামর্থ্য। এই বিবি বা দেবীর  পূজায়  কোন বিশেষ মন্ত্র ফন্ত্রও ছিল না,  মূল কাজ হচ্ছে – একমনে  মানত করে ‘ওলাদেবী’কে বলা – রক্ষা করো মা’গো / আম্মাগো বাঁচাও আমাগো । উচ্চবংশীয় কোন হুজুর বা পুরোহিতের কোন প্রয়োজন ছিল না -প্রচণ্ড সাহসী , যিনি কবরে শায়িত করেছেন , ভাসিয়েছেন জলে কিংবা পুড়িয়েছেন শত শত লাশ -তিনিই এই পূজা সম্পাদন করার জন্য দেবীর প্রধান দাস।

এভাবে ওলাদেবীর অকস্মাৎ আগমনে , ‘ওলাউঠা’ বাতাস ছড়িয়ে পড়ল যশোর, কলকাতা ,চব্বিশ পরগনা,  , হাওড়া, বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর প্রভৃতি অঞ্চলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পল্লীতে । গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা প্রত্যেকে নিজ নিজ জীবন রক্ষায় -বাড়ি ঘর সম্পদ ফেলে দিয়ে রওনা হলেন অজানার উদ্দেশ্যে । স্বামী , ফেলে রেখে গেল তার স্ত্রীকে , সন্তান ফেলে গেল পিতাকে , ভাই রেখে গেল বোন , মাতা পড়ে থাকল কুটিরে । সেটি ছিল এক অবর্ণনীয় মৃত্যু-উৎসব ।

icddr b (1)

ভিব্রিও কলেরী , কলেরা

এদিকে শুরু হত ‘ওলাদেবী’র পূজা আরম্ভের প্রক্রিয়া , আর ওদিকে পূজার আয়োজনে ব্যস্ত ছিলেন যে  যুবক  , তার  দেহে ‘ভিব্রিও কলেরী’র জোরালো সংক্রমণে তার অন্ত্রে ঘটে যেত টক্সিনের বিষক্রিয়া -পাতলা পায়খানা করতে করতে  তরতাজা যুবক  মাত্র ১ ঘণ্টায় নিস্তেজ হয়ে যেতেন। রক্তচাপ কমতে কমতে, ‘ওলাদেবী’র  পূজাটি অনুষ্ঠিত হবার আগেই,  প্রাণ বায়ু ত্যাগ করে দুম করে মরে যেতেন সেই তাগরা যুবক। আর যদি সাধারণ মাঝারি মাপের সংক্রমণ হত, তাহলে  রক্তচাপ কমতে সময় লাগত ৪-১২ ঘণ্টা এবং পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন কেউ কেউ। ‘ওলাদেবী’ চটে গেছেন খুব, আদারওয়াইজ কেন মরে গেল তাঁর ভক্ত? কোন ভুল হয়ে গেছে  নিশ্চয়!  তাই  বিপদ থেকে উদ্ধার লাভের জন্য,  মহাসমারোহে আবার শুরু হয়ে যেত ‘ওলাদেবী’র পূজা – হয় সেই বাড়িতেই  না হয় অন্য কোন গ্রামে।

বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ধারনা, সুন্দরবনের নোনা পানি থেকেই জন্ম নিয়েছিল, সর্বগ্রাসী, দেবী বিনাশিনী  সেই ‘ওলাদেবী’। মেডিক্যাল সায়েন্সে যার নাম নির্দিষ্ট হয়েছে ‘কলেরা’ । পাশ্চাত্যে নাম ছিল  ‘এশীয় কলেরা’ । এটি মূলত ‘ভিব্রিও কলেরী’ নামক জীবাণু ঘটিত ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ জনিত সংক্রামক ব্যাধি। আক্রান্ত রুগীর শরীরে কলেরা টক্সিন নামীয় এন্টেরোটক্সিন তৈরি হয়ে যেত। ফলে এর ক্রিয়ায় খাদ্যনালী দেয়ালের আবরণী কলা থেকে বেশি পরিমাণ ক্লোরাইড ও জল নির্গত হয়ে,  তৈরি হত চাল ধোয়া পানির মত পায়খানা । আক্রান্ত রোগী’র ঘনঘন মলত্যাগে শরীর থেকে একদিনে ৩০ লিটারের মতো পানি বের হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না।

icddr b (1)

ইতিহাস বলে, গঙ্গা নদীর অববাহিকাতেই সর্বপ্রথম  কলেরার প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল।  হিন্দু সম্প্রদায় যখন তীর্থযাত্রায় গমন করতেন, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত হরেক রকম তীর্থযাত্রীদের দ্বারা পরস্পর সংক্রমিত হয়ে, ভারতবর্ষে  রোগটির বিস্তার ঘটেছিল। বিশ্বের প্রথম কলেরা মহামারী সংগঠিত হয়েছিল ভারতবর্ষেই, সময় কাল ছিল ১৮১৭ খৃস্টাব্দ থেকে ১৮২৪ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত, যাতে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ১ লক্ষ মানুষ।  ১৮১৭ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের যশোর থেকে শুরু হয়েছিল এবং  পরে সেটি ছড়িয়ে পড়েছিল কোলকাতা থেকে ভারতবর্ষের নানাপ্রান্তে ।

 আই সি ডি ডি আরবি 

সোভিয়েত জোটের ক্ষমতা হ্রাস কল্পে আমেরিকা গঠন করে  সাউথইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন, সিয়াটো।  এদিকে মার্কিন সেনা সদস্যরা যুদ্ধবাজি করতে তখন  ভিয়েতনামে। এমতাবস্থায়  মার্কিন সৈন্যদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে, কলেরা গবেষণার জন্য  একটি কাঠামো স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই কারণে পাকিস্তান সরকার এবং সিয়াটোর যৌথ প্রকল্পের অধীনে ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত হয় “পাকিস্তান কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি”। যেহেতু  একদা, ভারতীয় উপমহাদেশে ‘কলেরা রোগের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল, তাই সংস্থাটি  কলেরা’কে নির্বংশ করার প্রত্যয়ে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রমে নিয়োজিত হয়। ১৯৬৩ সালে চাঁদপুরের মতলবে প্রতিষ্ঠিত হয় রিসার্চ সেন্টার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর , যুক্তি সংগত কারণেই স্থবির হয়ে যায় সংস্থার কার্যক্রম। ১৯৭৮ সালে, দেশ বিদেশের কয়েকজন উদ্যোগী বিজ্ঞানী “কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে” একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরের জন্য আবেদন করলে, জাতীয় সংসদে একটি অধ্যাদেশ দ্বারা সংস্থাটির নতুন নাম হয়  ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ’ আইসিডিডিআর, বি ।

 icddr b (7)

আই সি ডি ডি আর, বি  মতলব

বার্জটি দেখতে যদিও মনে হয় একটি সাধারণ লঞ্চ,  কিন্তু এই বার্জের সাথেই জড়িয়ে আছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস । নদী বিধৌত অঞ্চল বিধায় বর্তমান চাঁদপুর জেলার ‘মতলব’ এলাকায় তৎকালে  কলেরা’র  প্রকোপ ছিল ভয়াবহ! প্রায়শই এখানে মহামারী আকারে দেখা দিত কলেরা। নদীপথ ছাড়া এখানে স্থল পথে, আসবারও কোন উপায় ছিল না  তখন, তাই আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা সুবিধা দেবার সুযোগও ছিল সীমিত। ছবির এই বার্জটি ছিল-পাকিস্তান সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র । ১৯৬০ সালে, একদল মার্কিন ও বাংলাদেশি গবেষকগণ এই বার্জটিতে চেপে – ঢাকা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে মতলবের আশে পাশে  তখন ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছেন। তাদের কাজ ছিল মতলব সংলগ্ন এলাকা সমূহ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করা,  এলাকার মানুষের সাথে মত বিনিময় করা এবং কলেরার বিরুদ্ধে লড়াই করবার পদ্ধতি সমূহ জানিয়ে দিয়ে   তাদের  সচেতন করে তোলা । কেননা তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল,  মতলবে  এমন একটি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা , যা শুধুমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না বরং সেটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম একটি প্রসিদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র। তাই এই কাজের পূর্বে এলাকাবাসীর বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জন করার ব্যাপারটিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন তারা । আর এভাবেই ১৯৬৩ সালে  মতলবে মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম’টি  শুরু হয় এবং এই ভাসমান বার্জটি’ও ইতিহাসের অংশ হয়ে যায় । ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত,  মতলবে  কলেরা রোগের বিভিন্ন টিকার কার্যকারিতার উপর ব্যাপক  পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করা হয়, সেই সাথে ঔষধ, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উপরও গবেষণা পরিচালিত হয়। মতলবে স্থাপিত  হেলথ্ এন্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভিল্যান্স সিস্টেমটি বর্তমানে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাঝে বহুল আলোচিত ও বিখ্যাত একটি মডেল ৷ এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো দীর্ঘমেয়াদী (longitudinal) সার্ভিল্যান্স সিস্টেম ৷ এর মাধ্যমে শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির অনেক মৌলিক ধারণা আবিষ্কৃত হয়েছে ৷ ফলে মতলব অঞ্চল বিশ্বভিত্তিক কর্মসূচীর গবেষণা ও কর্ম-এলাকা হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে ৷ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া চিকিৎসায় জিংকের উদ্ভাবনও এ কেন্দ্রের গবেষণা কর্মের আরও একটি মাইলফলক ৷ ডেঙ্গু, নিপা, সার্স এর মত সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে ,আইসিডিডিআর, বি মতলব রিসার্চ সেন্টার – বাংলাদেশ সরকারকে অব্যাহত সহায়তা প্রদান করে আসছে ৷ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা ও মতলবস্থ হাসপাতাল/ক্লিনিকের মাধ্যমে বছরে দেড় লক্ষাধিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে ৷

icddr b (5)

ছবিঃ ইসমাইল ফেরদৌস , দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

ডায়রিয়া বা উদরাময়

দিনে কমপক্ষে তিনবার পাতলা হলেই তাকে ডায়রিয়া বা উদরাময় বলা যেতে পারে। আর কলেরা হচ্ছে বর্তমান ডায়রিয়া রোগ’টির একটি এক্সট্রিম স্টেজ। ডায়রিয়া হলে  শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ তরল পানীয় বেরিয়ে যায় , তখন শরীরে জলশূন্যতা দেখা দেয় । ত্বকের স্বাভাবিক প্রসারণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে জলশূন্যতার লক্ষণ বোঝা যায় , ত্বকের রঙ হয়ে যায় ফ্যাকাসে ,  ধীরে ধীরে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। হৃৎস্পন্দনের দ্রুত হার  এবং সাড়া দেওয়ার সামর্থ্যে  হ্রাস পেতে থাকে। তবে যে সব শিশু স্তন্যপান করে তাদের পায়খানা পাতলা কিন্তু জলের মত না হয়ে স্বাভাবিকও হতে পারে । ডায়রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল -কোনো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, অথবা গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস নামে পরিচিত একটি রোগের কারণে  অন্ত্রের একটি সংক্রমণ । এই সংক্রমণগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মল দ্বারা দূষিত খাবার বা জল থেকে হয় অথবা সংক্রামিত অন্য কোনো ব্যক্তির থেকে সরাসরি হয়।

এটিকে তিন প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে: (১) স্বল্প স্থায়িত্বের জলের মত উদরাময় (২)  স্বল্প স্থায়িত্বের রক্তাক্ত উদরাময় এবং (৩) দুই সপ্তাহ চলমান, দীর্ঘস্থায়ী উদরাময়। রুগীর চিকিৎসা পদ্ধতি কী হবে , তা জানার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মল পরীক্ষার কোন প্রয়োজন নেই। ডায়রিয়ার প্রধান চিকিৎসা , নিয়মিত ওরস্যালাইন খাওয়া, প্রয়োজনে জিংক টেবলেট । ৬মাস বয়স্ক শিশুর জন্য স্তন্যপান বন্ধ না করা এবং ক্রমাগত চামচে ওরস্যালাইন খাওয়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী শুধুমাত্র নিয়মিত  স্যালাইন পান করলেই সুস্থ হয়ে যান । তবে রক্ত উদরাময় ও সাথে তীব্র জ্বর থাকলেই শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেয়া হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন মুখে স্যালাইন খেতে অক্ষম কিংবা  অধিক জলশূন্যতায় ভুগলে তখন ইন্ট্রাভেনাস/আইভি স্যালাইন প্রয়োগ করা হয়।

 icddr b (8)

ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন, ওরস্যালাইন

১৯৬৮ সালে , কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির গবেষকগণ অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে উদ্ভাবন করেন , এই রোগের অন্যতম প্রধান ওষুধ – যার নাম  ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন ORS বা ওরস্যালাইন, যা মূলত বিশুদ্ধ  পানির সাথে পরিমিত পরিমাণে লবণ ও চিনির একটি মিশ্রণ । পরবর্তীতে বিশ্ব বিখ্যাত বৃটিশ মেডিকেল জার্নাল ‘ল্যান্ডসেট’ এই খাবার স্যালাইনকে “চিকিৎসা ক্ষেত্রে শতাব্দীর অন্যতম সফল অবদান” হিসাবে আখ্যা দেয় । ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৩৭০০ রুগীকে ORS চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয় , যাতে প্রায় ৯৬ শতাংশ রুগীকে সুস্থ হয়ে উঠে।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী গত চার দশকে , আইসিডিডিআর, বি  প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ লোকের জীবন বাঁচিয়েছে । ১৯৮২ সালে সংস্থাটি চাল থেকে তৈরি খাবার স্যালাইনের সফল ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করে । বিশেষজ্ঞরা  ধারণা করে থাকেন, ওরস্যালাইন প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় ত্রিশ লক্ষ শিশুর জীবন রক্ষা করে চলছে এবং এই পর্যন্ত সারা বিশ্বে বাঁচিয়েছে প্রায় ৬ কোটি শিশুর জীবন। কেউ কেউ বলেন , ওরস্যালাইন এর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী আরো প্রসারিত করা গেলে , প্রতি বছর বিশ্বে চিকিৎসা খাতে সাশ্রয় করা সম্ভব প্রায়  ১৫ হাজার কোটি ডলারের সম পরিমাণ অর্থ। সম্প্রতি আইসিডিডিআর, বি’র গবেষণা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত  হয়েছে। নতুন অন্তর্ভুক্ত গবেষণার ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে , শ্বাসরোগ, যৌনরোগ, এইডস, হেপাটাইটিস, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা ও বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি।

icddr b (6)

ছবিঃ ইসমাইল ফেরদৌস , দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

বিশ্বের বৃহত্তম ডায়রিয়া হাসপাতাল  

আইসিডিডিআর বি, ঢাকা মহাখালী হাসপাতালটির উপরের তলা নিরিবিলি শান্ত , আর নীচতলাটি পৃথিবীর সবচাইতে বড় ডায়রিয়া হাসপাতাল। এখানে প্রতিবছর প্রায় দুই লক্ষ বিশ হাজার ডায়রিয়া রুগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় বিনামূল্যে । দুই দিন আগে ভর্তি হওয়া  সিরিয়াস ডায়রিয়া পেশান্টটি হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যায় ৪৮ ঘণ্টা পরেই । বর্ষা কালে হাসপাতালের সামনে পুরো পার্কিং এরিয়া পূর্ণ হয়ে যায় রুগীতে আর রুগীতে। এস এস পাইপের ফ্রেমে কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো বিছানা , তাতে প্লাস্টিকের স্পেশাল তোষক । বিছানার মাঝখানে আট ইঞ্চি মতন একটি গোল ছিদ্র , যার তলে বসানো আছে একটি বাটি যেখানে মলত্যাগ করেন রুগী , সাথে আইভি স্যালাইন ঝোলানোর স্ট্যান্ড। হাসপাতালের মেল, ফিমেল ও চাইল্ড ওয়ার্ড রুগীতে পরিপূর্ণ থাকলেও হাসপাতালের মেঝেটি থাকে নিট এন্ড ক্লিন, এত এত রুগী বিছানায় মলত্যাগ করছেন, কিন্তু হাসপাতাল অভ্যন্তরে কোন দুর্গন্ধ নেই, আছে হাল্কা মেডিসিন কিংবা কেমিক্যালের গন্ধ। সবচাইতে মজার ব্যাপার, রাজধানি এবং রাজধানির বাইরে থেকে, এখানে সাধারণত  ইমার্জেন্সি রুগীরাই আসেন – তথাপি এখানে নেই কোন হই হট্টগোল। ফ্লোরে দায়িত্ব প্রাপ্ত ডাক্তার, সেবক, সেবিকা, সহকারী তারা প্রায় সকলেই, দেশের ভেতরে বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ট্রেনিং নিয়ে এখানে নিয়োজিত। বলা হয়ে থাকে, এরা কলেরা এবং ডায়রিয়া চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য -প্রায় প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন । কিন্তু তাদের চলাফেরা, চেহারা ছবি চোখে তা বোঝা য়ায় না, কিন্তু যখন একজন মৃত্যুপথ যাত্রী রোগির শরীরে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে একটি আইভি স্যালাইন পুশ করে দেন অনায়াসে, যেখানে একজন সাধারণ নার্স পাঁচ থেকে দশ মিনিট শুধু রুগীর ভেইন খুঁজেই বেড়ান – শুধু তখনই বোঝা যায় তাদের সক্ষমতার লেভেল! কর্মরত দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক প্রায় সকলেই -শুধু মাত্র রোগীর  চোখ,  জিহ্বা আর স্কিন দেখেই বুঝে নিতে পারেন- রোগীর জলশূন্যতার মাত্রা। ঘড়ির কাঁটা ধরে ধরে এখানে চলে কাজের মত কাজ। ডিউটি আওয়ার শেষ হতেই নতুন একজন আসেন, এতক্ষণ যিনি ছিলেন তিনি চলে যান নীরবে।  প্রায় ২০ শতাংশ রোগী পাওয়া যায়, যারা কলেরায় আক্রান্ত -তাদের জন্য আছে দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা।

মোঃ মোবারক , বয়েস ছাব্বিশ বছর , একটি প্রেসে কাজ করেন , বন্ধুদের সাথে মেসে থাকেন। তার বন্ধুরা যখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল তখন ঘড়িতে সকাল সাত’টা । মোবারক ছিল তখন অজ্ঞান , যার পালস্‌ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না ঠিকঠাক । তাকে এখানে নিয়ে আসার পর আইভি স্যালাইন দেয়া হয়েছে ছয় লিটার । এখন সন্ধ্যার পর মোবারক যদিও কিছুটা দুর্বল , তথাপি চোখ খুলে ঠিক বলতে পারলেন- “আমি মনে করছিলাম আমি আর বাঁচুম না , আমি মনে হয় শেষ ” । দায়িত্ব প্রাপ্ত নার্স মমতাজ বেগম জানালেন – মোবারকের পায়খানার রঙ সকালে ছিল চাল ধোয়া পানি কালার এখন কিছুটা সবুজাভ । গতকাল রাতে ভাত খাওয়ার পরও মোবারক ছিলেন পূর্ণ সুস্থ কিন্তু ফিল্টার পানি না থাকায় , তিনি ট্যাপের পানি খেয়েছিলেন , রাত দুইটা থেকে তার পাতলা পায়খানা শুরু হয়।

icddr b (9)

প্রেস্টিজ যখন পাতলা পায়খানা

এই শহরে সামর্থবান মধ্যবিত্ত’রা ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হলে , খেয়াল করে দেখবেন তারা -উদরাময় , ডায়রিয়া , পাতলা পায়খানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এই কথা বলেন না। প্রথমেই এন্টিবায়োটিক মেরে দিয়ে , যখন দেখেন আর পায়খানা বন্ধ হচ্ছে না -তখন সাধারণত নামীদামী কোন প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তেনারা । শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ডাবল সীটেড অতি  মনোরম একটি কেবিন হলে খুব ভালো হয় ।

ঠিক এই রকম  একজন সামর্থবান- সম্পর্কে যিনি আমার দূরাত্মীয় , তেনার হয়েছে ডায়রিয়া অথচ  তার ইস্তিরি কচ্চেন- হয়েছে ফুড পয়জনিং। সেই মহামান্য ডায়রিয়া পেশেন্ট’কে শত অনুরোধ, অনেক লেকচার পিটিয়েও আমি মহাখালী নিয়ে যেতে পারলাম না । তেনার পরিবার এবং রুগীর প্রেস্টিজ বিবেচনা করে তাদের কথানুসারে , ঢাকা শহরের একটি নামী প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করাতে বাধ্য হলাম। পরবর্তী দুই দিন, হাই ফাই চিকিৎসার পরও  এক পর্যায়ে তেনার শারীরিক অবস্থা -যখন তখন যায় যায় অবস্থা হয়ে যায় । একপর্যায়ে উক্ত ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তেনাকে দ্রুত আইসিডিডিআর, বি তে স্থানান্তরের পরামর্শ প্রদান করেন । সেই পরামর্শ মোতাবেক তেনাকে আইসিডিডিআর, বি তে  ভর্তি করা হয়। আইসিডিডিআর, বি ৩৬ ঘণ্টা পর, তেনাকে ‘বাড়ি যান’ লিখে ডিসচার্জ করে দেন, কিন্তু আমরা আরও ন্যুনতম একদিন হাসপাতালে থাকতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম ।  কিন্তু কর্ত্তৃপক্ষ সাফ সাফ জানিয়ে দেন – রোগি এখন নিজ বাড়িতে থেকেই সুস্থ হওয়ার যোগ্য, এমতাবস্থায় এই জাতীয় আউট অব ডেঞ্জার রোগি হাসপাতালে রাখার কোন নিয়ম নেই।

তা বলি মহামান্য জনাব, আপনার যখন পাতলা পায়খানা শুরু হয়ে যায় , যখন বাথরুমে দৌড়াতে দৌড়াতে -আপনার অবস্থা কেরোসিন , তখন আপনার মহামূল্যবান প্রেস্টিজ খানা বাড়ির টঙ্গে তুলে রাখুন। বিশ্বের বৃহত্তম ডায়রিয়া হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বিনা পয়সায় চিকিৎসা নিন এবং দ্রুত সুস্থ হোন । এভাবে আপনার যে অর্থটুকু সাশ্রয় হয় তা দিয়ে , না পড়ুন তবু বই কিনুন, প্রিয়জনকে বই উপহার দিন।

ACCESS TO WATER AND SANITATION IN DEVELOPING COUNTRIES

সূত্র ও ছবিঃ

১। উইকিপিডিয়া , বাংলা পিডিয়া , www.icddrb.org

২। “Turning the Tide Against Cholera”  The New York times  by DONALD G. McNEIL Jr. FEB. 6, 2017

৩। Five decades of life-saving solutions”- by Muhammad Nabil  30 June 2016 , www.icddrb.org

৪। Details of Independence Awardee”. Cabinet Division