ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমার পুর প্রকৌশলী বন্ধুরা যারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর’-এ উচ্চপদে কর্মরত আছেন, তারা এই বিষয়ে অধিক জ্ঞান সম্পন্ন, তথাপি ছাত্রাবস্থায় যৎসামান্য কিঞ্চিৎ যা পড়েছিলাম, সেই আলোকে কয়েকটি কথা বলে নিতে চাই।

 

ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, বইতে যা আছে

Stopping Sight Distance/ অনতিক্রমণ দৃষ্টি দূরত্বঃ  কোন কিছু নজরে আসা মাত্রই গাড়ীর চালক ব্রেক চেপে যে  দূরত্বে গাড়িটি থামাতে সক্ষম হন।

Safe Overtaking Sight Distance/ অতিক্রমণ দৃষ্টি দূরত্বঃ চালক যখন ডিজাইন স্পীড বা অভিকল্প বেগে গাড়ি চালান, তখন গাড়ী সমূহের পরস্পর ওভার টেক হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না, কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তব চিত্র হচ্ছে, ধীর গতি সম্পন্ন গাড়িটিকে উঁচু গতি সম্পন্ন গাড়িটি ক্রমাগত পেছনে ফেলে দিয়ে নিজে এগিয়ে যেতে চায়। এটি হচ্ছে ওভার টেক করার আগে এবং ওভার টেক হয়ে যাওয়ার পর পর্যন্ত চালকের যে দূরত্বটুকু প্রয়োজন।

Reaction Time/ সংবিতক সময়ঃ বিপদ বা যে কোন কিছু দেখা মাত্রই যে সময়টুকুর মধ্যে, চালক গাড়িটি থামিয়ে ফেলতে সক্ষম হন। এটি হচ্ছে Perception Time/ বোধগম্য সময় এবং Brake Reaction Time/ কার্যকরী গতিরোধ সময়– এর যোগফল। অর্থাৎ যে সময়টুকুতে, চালক ব্যাপার’টি অনুধাবনের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ব্রেক কষে দিতে সক্ষম হন।

যদি দুইটি গাড়ির গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০কিমি,  রিয়েকশান টাইম/সংবিতক সময় ২.৫ সেকেন্ড, টায়ার ও রাস্তার ঘর্ষণ গুণাঙ্ক .৫ এবং ব্রেক কার্যকরী ক্ষমতা ৫০% হয়, তাহলে

ক। Stopping Sight Distance /অনতিক্রমণ দৃষ্টি দূরত্ব  হবে ৭৫ মিটার বা ২৫০ ফুট। অর্থাৎ ২৫০ ফুট দূরত্বে থাকা অবস্থাতে চালক কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে গাড়ি থেমে গিয়ে দুর্ঘটনা’টি এড়ানো সম্ভব।

খ। Safe Overtaking Sight Distance/অতিক্রমণ দৃষ্টি দূরত্ব হবে ৫৩০ মিটার। অর্থাৎ একটি গাড়ি অন্যটিকে ওভারটেক করতে চাইলে যে গাড়িটি অতিক্রম করবে তার গমনের জন্য প্রায় অর্ধ কিলোমিটার ফাঁকা স্থান আবশ্যক।

ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিল্ডে যা আছে

একটি আধুনিক নগরে,  রাস্তার পরিমাণ হওয়া উচিত ভূমির ২৩-২৫  শতাংশ, অথচ ঢাকায় রাস্তা আছে নগর আয়তনের মাত্র ৮ শতাংশ। বলা হয়ে থাকে একসময় কোলকাতার অবস্থা ছিল ঢাকার চাইতেও করুণ, তবে বর্তমানে তারা কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ পূর্বক যানজট’কে একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্পাদিত এক জরিপ থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালে ঢাকায় গাড়ি চলাচলের গড় গতি বেগ  ছিল ঘণ্টায় ২১.২ কিলোমিটার এবং ২০১৫ সালে গাড়ি চলাচলের গড় গতি বেগ নেমে এসেছিল ঘণ্টায় ৬.৮ কিলোমিটারে। আমাদের জাতীয় মহাসড়কের উল্লেখযোগ্য অংশে  বর্তমানে  যানবাহন ঘনত্ব, স্ট্যান্ডার্ড লিমিটের চেয়ে অনেক বেশি। পাবলিক, পরিবহন ও নজরদারি সংস্থার খেয়াল খুশী মত- মহাসড়কে  চলছে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতা! মুহূর্তেই মহাসড়কে তৈরি হয়ে যাচ্ছে সুতীব্র যানজট! প্রতিটি গাড়ি- একটি আরেকটির পেছনে, প্রায় গা ঘেঁসে ঘেঁষে দৌড়ুচ্ছে যেন! তাই বিপদে বা প্রয়োজনে একটি গাড়িকে আচমকা থামিয়ে দেবার জন্য, গাড়ির ড্রাইভার ক্লিয়ার ২৫০ ফুট দূরত্ব পেলেন কী পেলেন না, এই নিয়ে কোন টেনশন তার নাই। গাড়ি ওভার টেক করার জন্য ৫০০ মিটার সেফ ডিস্টেন্স’টি, তার কাছে ভীষণ আননেসেসারী, বেহুদাই সময়ের অপচয়! আর মহামান্য চালক ভাইয়েরা, এভাবে মেপে মেপে গাড়ী চালাতে অভ্যস্তও নন।  আচমকা কানের সামনে দিয়ে গুলি চলে গেলে, যে অবস্থাটি  হবার কথা, ঠিক তেমন করেই সাঁই সাঁই শব্দে দৌড়ে যায় গাড়িগুলো। আর স্পীড! যে যেমন পারো!

দুর্ঘটনা সংগঠিত হবার অন্যান্য কারণ সমূহ

গাড়ির ফিটনেস, টায়ার কন্ডিশন, ব্রেক এফিসিয়েন্সি, টায়ারের প্রেশার, রাস্তা ও  টায়ারের মধ্যকার ঘর্ষণ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রাস্তার আকার আকৃতি-ধরণ-অতি উন্নতি Super Elevation, ট্রাফিক মুভমেন্ট, রাস্তার উপরিভাগের কন্ডিশন, রাস্তার কার্ভ, যত্রতত্র স্পীড ব্রেকার, অপরাপর গাড়ি সমূহের গতি, রাস্তার পাশে বাজার, দোকান-পাট, কল-কারখানা, দালান কোঠা, রাস্তা পারাপারে গরু ছাগল মহিষ, নছিমন-করিমন, ভ্যান-ঠেলা,  রিক্সা-সিএঞ্জি, রোড সাইন নির্দেশিকার অভাব, মিছিল মিটিং সমাবেশ, হকার জলখাবার, আবহাওয়া ঝড়-বৃষ্টি। আর সাথে চালকের ড্রাইভিং এক্সপেরিয়েন্স, তার শারীরিক এবং মানসিক ফিটনেস, চালকের অবিরাম মোবাইল ব্যবহার, বিড়ি সেগ্রেট ফেন্সি, তার বিরতিহীন গাড়ি চালানো ইত্যাদি।

লাইসেন্স নামীয় এই বস্তুটি আসলে কী?

“ড্রাইভিং লাইসেন্স করার উপায়” এই শিরোনামে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম- এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে জানা যায়-  প্রথমে শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স এর জন্য আবেদন করে অতঃপর লার্নার লাইসেন্স নিয়ে ড্রাইভিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়া যাবে। প্রশিক্ষণের পর নির্ধারিত কেন্দ্রে লিখিত, মৌখিক ও ফিল্ড টেস্টে পাশ করলে পাওয়া যাবে অপেশাদার লাইন্সেস। তারপর একটি নির্দিষ্ট সময় পরে পুনরায় আবার ফিল্ড টেস্ট বা ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাশ করলেই পাওয়া যাবে পেশাদার লাইসেন্স। যদি কেউ পেশাদার ভারী যান চালানোর লাইসেন্স চান, তাহলে আগে পেশাদার হাল্কা যানের লাইসেন্সটি তাকে অর্জন করতে হবে। ওয়েব সাইটে  যাবতীয় ইনফরমেশন দেওয়া আছে,  না বুঝলে প্রয়োজনে অফিসে চলে আসলেই সব বুঝিয়ে দেবার জন্য রেডি আছে বিআরটিএ’র সংশ্লিষ্ট টিম। কোন দালাল-ফালাল ধরবার প্রয়োজন নেই। কাজ খুবই সহজ, টাইম টু টাইম নিয়মানুযায়ী কাজ করলেই পেয়ে যাবেন মাইক্রোচিপ লাগানো ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স।

বিআরটিএ যেমন যেমন বলছে, লাইসেন্স পাওয়ার ব্যাপারটি কী আসলে এতই সহজ? এই প্রশ্নের উত্তর বা এ নিয়ে গবেষণা আপাতত করতে চাচ্ছি না। আমরা বরং শুনে নেই- ফাতিমা আর সলিমের ঘটনা!

ফাতিমা, বৃটেন, লাইসেন্স চাই

ফাতিমা নার্গিস বাড়ি সিলেট, বৃটেনের একটি স্কুলে সহকারী শিক্ষাকর্মী হিসাবে জয়েন করেছেন সদ্য। এক পর্যায়ে, কয়েকটি কাগজ একসাথে স্টেপ্‌লার মেশিনে স্ট্যাপ্লিং করতে যাচ্ছিলেন তিনি, এমতাবস্থায় একজন বৃটিশ মহিলা এসে ফাতিমা’কে বললেন- যতটুকু বুঝতে পারছি তুমি স্কুলে নতুন এবং সম্ভবত স্টেপলার মেশিন কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, এই ট্রেনিং’টি তুমি করো নি। তাই তোমার ‘স্টেপ্‌লার মেশিনে  স্ট্যাপ্লিং’ এই ট্রেনিংটি’র একটি লাইসেন্স নিয়ে, তারপর এই কাজটিতে নিয়োজিত হওয়া  উচিত।

সলিম, গাবতলি, নো লাইসেন্স

সলিমের বয়স যখন তের কী চৌদ্দ, জীবিকা অন্বেষণে ফরিদপুর থেকে, একদিন সে পাড়ি জমায় গাবতলি বাস স্ট্যান্ড। বেতন নাই, আছে  শুধু থাকা আর খাওয়ার নিশ্চয়তা। এই হিসাবে রুমা পরিবহন নামীয় একটি পরিবহনে তার চাকুরী হয় পোস্টের নাম ‘কলার’। ‘যশোর বেনাপোল ডাইরেক্ট ফেরী লাস্ট টিরিপ’ বলে বলে কান ফাটায় দেওয়া, আর চান্স পাইলেই যাত্রী নামক মুর্গা ধরা- ছিল তার মূল কাজ। চারবছর পর, সলিম বাসের হেল্পারী করার দায়িত্ব পায়। তখন তার ওস্তাদ করিমুল্লাহ মাঝে মাঝে নাইট কোচ চালিয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকা’য় ঢোকার সময়, আমিন বাজার ক্রস করা মাত্রই তাকে করিমুল্লাহ ডেকে কইতেন- “কইরে সলিম আয়, স্টিয়ারিং- এ আইসা বয়।” এভাবে আস্তে আস্তে ড্রাইভিং সীটে বসার সুযোগ মেলে সলিমের। এভাবে পরবর্তীতে মাস ছয়েক, প্রায় প্রতিদিন আমিন বাজার আসলেই -গাড়িটি গাবতলি’তে গ্যারেজ করার কাজে, নিয়োজিত হয় সলিম। একদিন তার ওস্তাদ করিমুল্লাহ’র খুব জ্বর, তাই অসুস্থতার কারণে আসতে পারেন নি তিনি। তখন মালিকের ম্যানেজার, সলিম’কে জিজ্ঞেস করেন- “কিরে পারবি আইজকা একলাই?” সলিম উত্তর দেয়- “এইডা কুনু মামলাই না!” অতঃপর সেদিনই সলিম প্রথম বারের মতো ড্রাইভিং সীটে বসে ‘ঢাকা বেনাপোল আপ ডাউন’ মেরে দেয়।

এখন বাইশ বছর পর সেই সলিম, এককোটি পঁচাত্তর লাখ টাকা দামের ব্র্যান্ড নিউ সাতাইশ সীটের হুন্দাই- ‘বেনাপোল ঢাকা চট্টগ্রাম কক্সবাজার’ আপ-ডাউন মারে, গাবতলির সবচাইতে দামী ড্রাইভার এখন সলিম। যাত্রী এবং পরিবহণ সবাই তার ব্যাপারে সেটিস্ফাইড! মাঝে কিছুটা কড়াকড়ি চলতে  থাকায়, তখন সলিম’কে লাইসেন্স নেয়ার জন্য খোদ মালিক পক্ষ তাড়া দিয়েছিলেন। সলিম বলে- “আমার পরীক্ষা নিব এমুন ক্যাডা বিআরটি’তে আছে, কঞ্চাই? এই গল্পটি কোন রূপকথা নয়,  দিস দ্য স্টোরি! এটি একটি দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য, পরিবহণ মালিক এবং ড্রাইভারের বোঝাপড়া এবং এভাবেই হেল্পার থেকে ড্রাইভার হয়ে দিব্যি লং রুটে গাড়ী চালিয়ে- করে খাচ্ছেন শত শত সলিম। ড্রাইভারের লাইসেন্স চেক করার ব্যাপার’টি শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই কিছুটা দৃশ্যমান, ঢাকার বাইরে এবং বিশেষ করে বাস-স্ট্যান্ড সমূহে, পেশাদার ড্রাইভার’দের লাইসেন্স চেক করার কোন চল, একপ্রকার নেই বললেই চলে! সরকার, পরিবহন মালিক ও  ড্রাইভার সবাই তা জানে! তাহলে এই বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে? তাছাড়া একজন পঁচিশ-ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ড্রাইভারের গলায়, আদৌ এই ঘণ্টা বেঁধে, এর ফায়দাই বা কী!

ভারতীয় দণ্ড বিধি 

ধারা ৩০৪,  Punishment for culpable homicide not amounting to murder:

Whoever commits culpable homicide not amounting to murder shall be punished with imprisonment for life, or imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine, if the act by which the death is caused is done with the intention of causing death, or of causing such bodily injury as is likely to cause death or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, or with fine, or with both, if the act is done with the knowledge that it is likely to cause death, but without any intention to cause death, or to cause such bodily injury as is likely to cause death.”

এভাবে মানুষ হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ, কিন্তু খুন নয়। এর শাস্তি- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা  দশবছর কারাদণ্ড- যদি প্রমাণিত হয় চালক স্বেচ্ছায় দুর্ঘটনাটি সম্পাদন করেছেন।

ধারা ৩০৪/ Causing death by negligence:

Whoever causes the death of any person by doing any rash or negligent act not amounting to culpable homicide, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both.”

চালকের অবহেলায় মৃত্যু হলে,  দুই বছরের কারাদণ্ড কিংবা জরিমানা

 

এটি সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম যুগান্তকারী রায়

জামিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, তার মধ্যে প্রথমত ঘাতক বাসটির গতি-নিয়ন্ত্রক যন্ত্রটি বিকল ছিল। আদালতে বিআরটিএর রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্পিড গভর্নর সিল ‘টেম্পার’ করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁর গাড়ি চালনার ছাড়পত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ ২০০৮ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর তিনি নবায়নের জন্য কথিতমতে যে দরখাস্ত দাখিল করেছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ তাঁকে একটি স্লিপ দিয়েছিল। কিন্তু আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, ওই স্লিপটি ভুয়া ছিল। তৃতীয়ত, বাসের ফিটনেস সনদ মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। চতুর্থত, ঘটনার দিন চালক অতিরিক্ত কাজ করার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ওই দিন ভোর চারটায় চুয়াডাঙ্গা থেকে বাস নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান সকাল সোয়া ১০টার দিকে, কিন্তু সকাল সাড়ে ১০টায়ই তিনি পুনরায় চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে যাত্রীবোঝাই গাড়ি নিয়ে রওনা দেন। সুতরাং তাঁর বিশ্রামের ঘাটতি ছিল। পঞ্চমত, ঘটনার দিনটিতে বৃষ্টি হচ্ছিল এবং ঘটনাস্থলের ঠিক আগেই দুটি বাঁক ছিল। শেষের বাঁকটি পেরোনোর সময় চালক তাঁর গাড়িটিকে রীতিমতো একটি আগ্নেয়াস্ত্রে পরিণত করেন। তিনি সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে একটি চলমান মিনিবাসকে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করেন। আর এই ওভারটেক করতে গিয়েই তিনি তারেক মাসুদদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির ডান দিকে সজোরে আঘাত হানেন।

তাঁর গাড়ির গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে আদনানের নিবেদনমতে, ঘাতক বাসটি ১২৬ ফুট দূরে গিয়ে পরপর তিনটি গাছে বাড়ি খেয়ে তবে থেমে যায়। মিশুকদের ১০ জন যাত্রী বহনকারী মাইক্রোবাসটির ডান দিকে থাকা ৫ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাঁদের কাউকেই হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগও পাওয়া যায়নি। ক্যাথরিন মাসুদসহ অন্য ৫ জন অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য ছিল, মিশুকদের বহনকারী গাড়ির চালকের দোষেই এ ‘দুর্ঘটনা’ ঘটেছে। তিনি রং সাইড দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এর সপক্ষে দুজন প্রত্যক্ষদর্শীও হাজির করা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, ঘাতক বাসটি দিয়ে পাঁচজনের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় চালকের ওপরেই সব দায়দায়িত্ব বর্তায় কি না?

(ড্রাইভার জামির’কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত মিজানুর রহমান খান লিখিত,  ড্রাইভার জামিরের কেন এই গুরুদণ্ড? থেকে)

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার , দ্য মোটর ভেহিক্যালস অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ (২৯ নভেম্বর ১৯৯০ এ সংশোধিত) অনুসারে

OFFENCES, PENALTIES AND PROCEDURE

138. Driving without licence – Whoever drives a motor vehicle or public service vehicle or whoever causes or allows a motor vehicle or public service vehicle to be driven in contravention of the provisions of sub-section (1) of section 3 shall be punishable with imprisonment which may extend to four months, or with fine which may extend to four months, or with fine which may extend to five hundred taka, or with both.

লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে চারমাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা কিংবা চারমাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচশত টাকা জরিমানা উভয়।

143. Driving recklessly or dangerously – Whoever drives a motor vehicle at a speed or in a manner which is dangerous to the public, having regard to all the circumstances of the case including the nature condition and use of the place where the vehicle is driven and the amount of traffic which actually is at the time or which might reasonably be expected to be in the place, shall be punishable on a first conviction for the offence with imprisonment for a term which may extend to six months, or with fine which may extend to five hundred taka, and his driving licence shall be suspended for a specified period, and for a subsequent offence if committed within three years of the commission of a previous similar offence with imprisonment for a term which may extend to six months or with fine which may extend to one thousand taka, or with both, and his driving licence shall be suspended for a period not exceeding one month.

বেপরোয়া-ভাবে বা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালালে প্রথম বার হলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচশত টাকা এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইসেন্স স্থগিত পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে আবার একই অপরাধে জড়িত হলে  দ্বিতীয় বারের জন্য ছয়মাস জেল বা একহাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সটি স্থগিত থাকবে একমাস সময়ের বেশী নয়।

144. Driving while under the influence or drink or drug – Whoever while driving or attempting to drive a motor vehicle is under the influence of drink or drug to such extend as to be incapable of exercising proper control over the vehicle shall be punishable for a first offence with imprisonment which may extend to three months, or with fine which may extend to one thousand taka, or with both, and for a subsequent offence with imprisonment which may extend to two years, or with fine which may extend to one thousand taka, or with both and his driving licence shall be suspended for a specified period.

মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালালে প্রথম বার হলে তিনমাস পর্যন্ত জেল বা একহাজার টাকা অর্থদণ্ড বা পরের বারের জন্য দুই বছরের জেল বা একহাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়।

145. Driving when mentally or physically unfit to drive – Whoever drives a motor vehicle in any public place when he is to his knowledge suffering from any disease or disability calculated to cause his driving of the vehicle to be a source of danger to the public, shall be punishable for a first offence with fine which may extend to five hundred taka and his driving licence shall be suspended for a specified period and for a subsequent offence with imprisonment for a term which may extend to three months ,or with fine which may extend to five hundred taka, or with both.

মানসিক কিংবা শারীরিক আনফিট অবস্থায় গাড়ি চালালে প্রথম বার হলে পাঁচশত টাকা জরিমানা এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইসেন্স স্থগিত, পরের বারের জন্য তিনমাস পর্যন্ত জেল বা পাঁচশত টাকা জরিমানা টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়।

ব্যাংকের কিস্তির সাথে সম্পর্কিত গাড়ির উচ্চ গতি

পরিবহণ মালিকদের এই ব্যবসায় মূল অর্থ যোগানদাতা হচ্ছে ব্যাংক এবং লিজিং কোম্পানিগুলো। তাই পরিবহন মালিকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন যেন পরিবহনের চাক্কা সদা সর্বদা ঘুরতেই থাকে। ঢাকা থেকে রাতে ছেড়ে যেয়ে, দূরপাল্লার বাসটি গন্তব্যে পৌঁছে যায় ভোর পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে। তারপর এক থেকে দুঘণ্টার মধ্যেই, আবার বাসটিকে সকাল সাতটা বা আটটায় ফিরতি ট্রিপ মারার জন্য রেডি হয়ে যেতে হয়। একজন ড্রাইভার আপ-ডাউন মারতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং মালিক পক্ষও চান এক হাতেই যেন আপ-ডাউন ট্রিপটি কমপ্লিট হয়। তাই পরোক্ষভাবে বাসটিকে দ্রুত না চালিয়ে মুড়ির টিনের মত চালিয়ে নিয়ে যাবার কোন অবকাশ থাকে না।

বাসের অনেক যাত্রী, কচ্ছপ গতির গাড়ি এবং কচ্ছপ টাইপ ড্রাইভারকে পছন্দ করেন না। গাড়ির গতিবেগ একটু কম হলেই, আমজনতা- ড্রাইভার সাবের বাপ-দাদা চৌদ্ধগুষ্ঠির উদ্ধারে নিয়োজিত হয়ে পড়েন এবং  পরের যাত্রায় এই গাড়িতেই আর উঠতে আগ্রহী হন না, মহামান্য যাত্রী ভাইয়েরা আমার। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশী’- এই মহান বাণীটি ফাইনালি মুখ থুবরে পড়ে থাকে আর গুমরে গুমরে কাঁদে। তাই রেসের ঘোড়া হয়ে যায় বাসটি এবং  ড্রাইভার সাহেবও উরা-ধুরা গতিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।

a

তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরদের দুর্ঘটনা-কবলিত মাইক্রোবাসটির ধ্বংসাবশেষ দিয়ে নির্মিত স্থাপনা , শামসুন্নাহার হল সংলগ্ন সড়ক-দ্বীপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

তাই ড্রাইভারকে দুর্ঘটনার জন্য একক ভাবে দায়ি করতে পারছি না আমি, স্যরি।

 

কিন্তু যদি চালক স্বেচ্ছায় বেপরোয়া গাড়ি চালাতে গিয়ে নিজেই পাগলা ঘোড়া হয়ে যান, তাহলে সেই পাগলা ঘোড়ার লাগামখানিও শক্ত করেই টেনে ধরতে হয়, নো ওয়ে! এবং এই কাজটি চূড়ান্ত দুর্ঘটনাটি ঘটে যাবার আগেই করা উচিত বলে আমি মনে করি! কেউ বেপরোয়া গাড়ি চালালে, যাত্রীদের সেই চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবার জন্য একটি হট লাইন নম্বর দিতে পারে সরকার। সেখানে যাত্রীদের প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সরকারের টিম যাত্রী বেশে গাড়িতে ভ্রমণ পূর্বক সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে পারেন- আনিত অভিযোগের সত্যতা কতটুকু, যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়- তাহলে অন দ্য স্পট চালককে চূড়ান্ত ওয়ার্নিং প্রদান করা যেতে পারে। অর্থাৎ ড্রাইভার মহলে সরকারের উচিত, এমন একটি পায়তারা টাইপের তাফালিং উৎপাদন করা- যাতে একটি দৃশ্যমান ভীতি’র উদ্রেক হয় তার মনে। কুকুরের লেজ সোজা করার কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সোজা না করা গেলে সেই লেজে দুই ইঞ্চি ডায়া’র একটি পাইপ  পরিয়ে দেয়া নিশ্চয়ই তেমন কঠিন কোন কাজ নয়!