ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

ছায়ানট- এর হাত ধরে হয়েছিল শুরু

বাংলা ১৩৬৮, ইংরেজি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-শতবার্ষিকী পালন করবার ঐকান্তিক ইচ্ছায় পাকিস্তানি শাসনের থমথমে পরিবেশেও কিছু বাঙালি একত্র হয়েছিলেন আপন সংস্কৃতির মধ্যমণি রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষপূর্তির উৎসব করবার জন্যে। তমসাচ্ছন্ন পাকিস্তানি যুগে কঠোর সামরিক শাসনে পদানত স্বদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্রভাবনা অবলম্বন করে ছায়ানট যাত্রা শুরু করে। ঢাকার রমনা উদ্যানের অশ্বত্থ গাছের নিচে ১৩৭৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাত, ১৯৬৭ সালের মধ্য এপ্রিলে হয়েছিল প্রথম অনুষ্ঠান। পঞ্চবটী বলতে অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকি ও অশোক বোঝায়। ভাল শোনায় বলে অনুষ্ঠানস্থলের নাম করা হয় বটমূল। ১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়ে আসছে সুরের মূর্চ্ছনা আর কথামালায়। আর এভাবেই ছায়ানটের হাত ধরে একদিন রমনা’র বটমূলে শুরু হয়েছিল যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, তা আজ ধীরে ধীরে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবার ১৩২৪ বাংলা নববর্ষের আয়োজনটি ছিল ছায়ানটের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান।

01_Boishakh_Chayanat_Ramna+Botomul_MM_14042017_000017

ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে, পান্তা ভাতে নেমে পড়ে জ্যান্ত ইলিশ

ছায়ানটের বর্ষবরণ উদযাপন’কে কেন্দ্র করে, ধীরে ধীরে যখন রমনা উদ্যানটির আশপাশ জমে উঠতে শুরু করে- তখন একদল বাঙালির মাথায় আইডিয়া ঘুরপাক খেতে খেতে জেগে উঠে ‘মানব প্রেম’। এতো সকালে বহু দূর থেকে এসেছেন তারা, সাজগোজ করে, এসেছেন পরিপাটি হয়ে- কোন প্রকার প্রাতরাশ ছাড়া। মাথা চাড়া দিয়ে উঠে বিবেকবোধ, আর যেহেতু বিবেকবাবু স্বয়ং নিজেই বলে গেছেন ‘জীবে প্রেম করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর’। তাই কতিপয় বাঙালি ভাইয়েরা, বিবেকানন্দ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে অলরেডি নেমে পড়েন মানব সেবায়। পান্তা ভাতে, নুন পেয়াজ আর কাঁচা মরিচে- সাথে মহামূল্যবান জাটকা টাইপ ইলিশের এক পঞ্চমাংশ দিয়ে সাজানো, মাটির সানকি- সাথে আর লাগে কী! মোলায়েম গলায় তারা ডাক পাড়েন ‘ও ভাই’রা ও দিদিমণি, খেয়ে যান প্রতি প্লেট পঞ্চাশ,  ফুরিয়ে যাবে এখুনি’। শহুরে বাঙালি খুব ভালো করে  জানে, এ পান্তা নিতান্তই গরীবের খানা, খাওয়ার নেই কোন মানে,  কিন্তু ইলিশ বলে কথা! তাছাড়া  উদযাপনের এই  ঢং টি তাদের খুব মনে ধরে, অতঃপর পান্তা-ইলিশ বাজারে হীট করে! কেউ কেউ না পেয়ে, ভীষণ আফসোস করে! পরের বছর, পাড়া মহল্লায় বার্তা হয়ে যায় ভূয়া খবর, ছায়ানট খাওয়াচ্ছে- কেউ বলে ফ্রি, কেউ বলে না হোক ফ্রি!  পহেলা, পান্তা আর ইলিশ তিনে মিলে হয় থ্রি! ভরপুর বেচাকেনা যেন পুরাই জমে ক্ষীর! আর সে কী ভিড়, সে কী ভিড়! সে বছর দাম হয়ে যায় এক লাফে প্রতি সানকি টাকা পঁচাত্তর। পরের বছর দাম হয় একশ, কেই-বা করে  প্রশ্ন, আর কেই-বা দেয় তার উত্তর! এদিকে গরম পড়েছে ভ্যাপসা, ওদিকে চরম জমেছে ব্যবসা! আর এভাবেই বাংলাদেশে একদিন ইশ্! নববর্ষের নাম হয় পান্তা ইলিশ! অবশ্য গরীবের কপালে তা জোটে না, বড়লোক চায় বুঝিবার গরীবের কিছু বেদনা! আর এভাবেই, ব্যবসায়ীদের ব্যবসার ফাঁদে আটকে যায় মধ্যবিত্ত- এসো হে বৈশাখ এসো এসো, গানে গানে চঞ্চল হয় চিত্ত। আর এভাবেই নরম বালিশে, তোমার ওই চোখের নালিশে- নববর্ষ রঙিন হয় পান্তা আর  ইলিশে!

 g

নববর্ষ যখন ১৪ এবং ১৫ এপ্রিল

হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে ভারত উপমহাদেশে বাংলা বারো মাসের হিসাব অনেককাল আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন- আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হয়ে আসছিল। এখন যেমন নববর্ষ, নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত। তাই এতদিন বাংলা দিনপঞ্জির সাথে খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য ছিল – খ্রিস্টীয় সনের হিসাব ছিল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এবং খ্রিস্টীয় সনে নতুন দিন শুরু হওয়ার নিয়ম ছিল রাত ১২টা থেকে , আর ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যোদয় থেকেই, বাংলা দিন গণনার রীতি চালু ছিল।

c

১৯৮৭ সাল। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সরকারি সকল কাজ-কর্মে ও নথি-পত্রে খ্রিস্টীয় সন-তারিখের পাশাপাশি বাংলা সন-তারিখ লেখার আদেশ জারি করা হয় এবং এই ব্যাপারে ১৯৬৩ সালে গঠিত ‘বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার’ কমিটি, যার সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সেই ‘শহীদুল্লাহ কমিটি’র আলোকে, ‘বাংলা একাডেমী’কে ‘বাংলা পঞ্জিকা’ তৈরি করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। যদিও সেই সময় শহীদুল্লাহ’র কমিটির দু’একজন সদস্য লিপ ইয়ার গণনা পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকার কারণে, ৮ই ফাল্গুনকে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রাতিষঙ্গ এবং ১লা বৈশাখকে ১৫ এপ্রিল ধরার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ধারণা করা সঙ্গত যে, ভিন্নমত পোষণকারী সদস্যদের মধ্যে হয়তো বায়ান্ন’র মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রবলভাবে কাজ করছিল, কারণ মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দেয়ার বায়ান্ন’র সেই ২১ ফেব্রুয়ারির অগ্নিঝরা দিনটি ছিল বাংলা মাসের ৮ ফাল্গুন। তাঁরা হয়তো চেয়েছিলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ ও ‘৮ ফাল্গুন- এই স্মারক দিনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রতি বছর একসত্তায় হাজির হোক। পরবর্তীতে ১৯৯৪-৯৫ সালে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি সভায় পর্যায়ক্রমিক নানামুখি গবেষণায় ‘বাংলা একাডেমি’ নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেঃ

  • সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিন গণনা করা হবে।
  • গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষ গণ্য করা হবে।
  • অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করা হবে।

এছাড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, গ্রেগরীয় বছরের ১৪ এপ্রিল হবে বাংলা সনের প্রথম দিন এবং ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের বর্ষপঞ্জিকার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ১৪০২ সালের ১লা বৈশাখ থেকে এটি কার্যকর করার জন্য সরকারকে সুপারিশ প্রদান করে ‘বাংলা একাডেমি’।

বাংলাদেশ সরকার ‘বাংলা একাডেমি’র সুপারিশকে নয়া রীতি হিসাবে ঘোষণা করে, ফলত ১৯৯৫ ইং সাল থেকে আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে, গ্রেগরীয় আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাত ১২ টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু হয় বাংলাদেশে। এবং এর পর থেকেই লিপ ইয়ার যেমন- ২০১৬, ২০২০ ব্যতীত অন্য বছরগুলোয় গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে, ১৪ই এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ১৫ই এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়ে আসছে।

d

কুমিল্লা টাউন হল- মাঠ মেলা

একসময় কুমিল্লা ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত, ত্রিপুরার তৎকালীন মহারাজা ছিলেন, বীরবিক্রম মাণিক্য বাহাদুর। তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধান, পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক আনুকুল্যে, ১৮৮৫ সালে নির্মিত হয় ১০ বিঘা জমির ওপর একটি মনোরম শ্বেতশুভ্র ভবন। পরবর্তীতে যার নাম হয় কুমিল্লা টাউন হল ও পাবলিক লাইব্রেরি। এই ভবনটিকে কেন্দ্র করেই, বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে, কুমিল্লা একদিন হয়ে উঠে শিল্প সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধশালী শহর।

সেই টাউন হল মাঠেই প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে, বসতো এক অফুরন্ত প্রাণের মেলা! মেলার মূল আকর্ষণ ছিল- মেলার একাংশ নির্দিষ্ট ছিল মাছের মেলার জন্য। সাথে ছিল অন্যসব আয়োজন- মাটির পুতুল, টেম্‌ টেম্‌, তাল পাতার সেপাই, বাঁশীর ভ্যা পু, ভ্যা পু, পুতুল নাচ আরও কত কী! ভোর হতে হতেই, নতুন বছরের প্রথম দিনে- নব পোশাকে, নব জীবন লাভের আশায়- সেখানে মিলেছে মানুষ, কী নিদারুণ ভালোবাসায়! শৈশবে সেই মেলায় আমি যেতাম বাবার হাত ধরে, ভয় ছিল খুব শত শত মানুষে, যদি যাই হারিয়ে, তাই বাবার হাত ধরে রাখতাম শক্ত করে। সেইসব ভালবাসা কিংবা অস্থিরতা, নির্ঘুম রাতগুলো, আমাদের যাবতীয় কলরব, হারিয়ে ফেলেছি সব হায়রে, আজ আর সাথে কিছু নাইরে!

f

যা বলছিলাম, আজ থেকে বাইশ বছর আগের কথা। ১৪০২ সালে, সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী ১৪ এপ্রিল হয়ে গেল নববর্ষের প্রথম দিন। ডিসি সাহেব বার বার ঘোষণা দিলেন, মাছ বিক্রেতারা যেন মেলা জমাতে অবশ্যই টাউন হল মাঠে আসেন। কিন্তু মাছ বিক্রেতারা মহামান্য ডিসি সাহেবের সেই আহবানে সাড়া দিলেন না। ১৪০২  সনের প্রথমদিন, টাউন হলে মাঠে কোন মাছ ব্যবসায়ী মাছ নিয়ে আর বসলেন না । কেননা  ১৪ এপ্রিল দিনটি, তখন পর্যন্ত ছিল চৈত্র সংক্রান্তি’র দিন! যেহেতু আগের দিন ডিসি সাহেবের আদেশ অমান্য করেছিলেন, তাই সেই বছর পরের দিনটি অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল সকালে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন- মাছ নিয়ে কোথায় বসবেন এই সিদ্ধান্তে! সেই বছর টাউন হল মাঠে তাদের বসতে অনুমতি দেয়া হল না এবং পরের বছর অর্থাৎ ১৪০৩ থেকে সিদ্ধান্ত হল- টাউন হল মাঠে মেলা বসবে শুধুমাত্র ভেজ আইটেম- এর এবং সেই নিয়মে সেই ভেজ মেলাটি আজও এখানে  চলমান- নকুল দানা আর বাতাসায়, কিন্তু শতবর্ষী মাছের মেলাটি টাউন হল মাঠে শেষমেশ মরেই গেল ব্যাপক হতাশায়।

a

রাজগঞ্জ বাজারে, কাতলা মাছের মেলা

তৎকালীন লোকজ জনগোষ্ঠী তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করত এই বাজারে। তখন গঞ্জগুলো, নদী তীরবর্তী শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতো। ত্রিপুরার মহারাজা ছিলেন এই বাজারের প্রতিষ্ঠাতা। যেহেতু রাজার আনুকূল্যেই গড়ে উঠেছিল বাজারটি, তাই বাজারের নাম হয়েছিল ‘রাজগঞ্জ’, বর্তমানে কুমিল্লা শহরের প্রধান বাজার। ১৯৯৫ সালের পর থেকে, কুমিল্লা টাউন হল মাঠের মাছের মেলাটি স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসলো শহরের এই রাজগঞ্জ বাজারে। একে ‘মাছের মেলা’ বললে আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে- এখানে বোধহয় সব রকমের মাছই বেচা-কেনা চলে, আদতে ব্যাপার তা নয়, বরং এই মেলার নাম হওয়া উচিত ‘কাতলা মাছের মেলা’ কেননা নববর্ষে কুমিল্লাবাসী’র প্রধান আকর্ষণের নাম ছিল ‘কাতলা’ মাছ। ইলিশ, রুই, চিতল কিংবা বোয়াল বাদ দিয়ে শুধুই কাতলা মাছেই, কেন এত আগ্রহ ছিল কুমিল্লা বাসীর, ইতিহাস ঘেঁটে সে রকম কোন এক্সক্লুসিভ স্টোরি বা প্রমাণ, তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। কেউ বলেন- যেহেতু কাতলার চেহারা ভালো, সাইজ মনোমুগ্ধকর এবং সর্বোপরি তা দামেও সবার সেরা! তাই কাতলাকে গ্রহণ করা হয়েছিল। কেউ বলেন ক’ দিয়ে কুমিল্লা সেখান থেকে ক’তে  কাচকি, কৈ, কাইক্কা কিংবা কালিবাউশ হলে মানসম্মান হানি হবার সম্ভাবনা ছিল- তাই অনিবার্য ভাবে ‘কাতলা’ ই হয়ে গেল প্রথম পছন্দ।

b

আগের মেলাটি লিপ ইয়ার বাদ দিলে বসত পনের এপ্রিল তারিখে, কিন্তু হাল আমলে এই মেলাটি এখন চলছে বাংলা এবং হিন্দু, এই দুই সিস্টেম অনুযায়ী অর্থাৎ ১৪ এবং ১৫ এপ্রিল দুই দিন ধরেই! শহরের অসমর্থ কিংবা সামর্থবান, প্রায় সকল কুমিল্লাবাসী, বছরের এই দিনে,  প্রয়োজনে নিজ সাধ্য সামর্থ্যর বাইরে গিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন- বছরের সবচেয়ে বড় মাছটি কিনতে। এই মাছের মেলাটি উদযাপিত হয়- রাজগঞ্জ বাজার সংলগ্ন শহরের প্রধান সড়কে। একসময় এই রাস্তাটিই ছিল ঢাকা চট্টগ্রামের মূল হাইওয়ে। সেই রাস্তায় বাজার ছাড়িয়ে শহরের মোগলটুলিস্থিত জিপিও পর্যন্ত, প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার রাস্তায়- গতকাল (১৪ এপ্রিল) জমেছিল সেই বাজার এবং আজও (১৫ এপ্রিল) তা ছিল জমজমাট! খুব সকালেই হয় শুরু, সকালে রোদের তাপ কম থাকা অবধি- মাছের দাম থাকে সর্বোচ্চ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদ চড়ে উঠতে শুরু করলে- মাছ যখন আর তাজা থাকেনা, তখন তার দাম কমতে শুরু করে। চান্দিনা, ব্রাহ্মণপাড়া, চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, কসবা, দেবীদ্বার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নবীনগর, আশুগঞ্জ, ভৈরব, যশোর, রাজশাহীসহ দেশের নানা জায়গা থেকে, প্রায় জ্যান্ত অবস্থায় ধরে এনে- কাতলা মাছ তোলা হয় এই মেলায়। মাছের সাইজ- সর্বনিম্ন আড়াই কেজি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পঁচিশ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। দাম প্রতি কেজি সর্বনিম্ন চারশত থেকে- পনেরশ টাকা পর্যন্ত। একটি বাইশ কেজির কাতলা মাছ, গতকাল বিক্রি হয়েছে আটাশ হাজার টাকায়। ধারণা করা হয় ২০১৭ ইং সালে ১৪ এবং ১৫ এপ্রিল দুই দিনে মেলায় বিক্রি হয়েছে  প্রায় কোটি টাকার উপরে!

এই ঐতিহ্যগত কারণে, ইলিশ মাছের দাম দশ টাকা কিংবা লাখ টাকা হলেও তাতে কুমিল্লাবাসীর কিছু যায় আসে না এবং ‘পান্তা ভাতে ইলিশ’ বছরের প্রথম দিনে, কুমিল্লাবাসীকে কেউ মাগনা দিলেও  সাধারণত, বিপদে না পড়লে তিনি তা খেতে চান না! 

 

e

নববর্ষে দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা, কুমিল্লায়

 

প্রতি বঙ্গাব্দের মাঘ মাসের শেষে, বগুড়ার গাবতলিতে বসে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মাছের মেলা, যা প্রায় চারশত বছর পুরনো মেলা। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে মৌলভীবাজার শেরপুর এলাকায়,  কুশিয়ারা নদীর পশ্চিম পাড়ের  মাছের মেলাটির বয়স প্রায় অর্ধশত বছর। মাঘ মাস শেষে বগুড়া ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম পাশ দিয়ে বহমান বাঙালি নদীর পূর্ব তীরে উদযাপিত হয় শতবর্ষ পুরানো বিখ্যাত বক চর মেলা। হবিগঞ্জ সদর উপজেলায়, প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তিতে বসে দুইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী পইলের মাছের মেলা। নওগাঁর আত্রাইয়ে পৌষ সংক্রান্তির দিন বসে শীতাতলার মাছের মেলা। মাছ নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে এই রকম আরও অনেক বিখ্যাত মেলার নাম পাওয়া যায়। কিন্তু নববর্ষের দিন- শুধু বড় আকারের কাতলা মাছ নিয়ে কুমিল্লার মেলাটির মত এত ব্যাপক দ্বিতীয় কোন মেলার খোঁজ ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় না।

সূত্রঃ  উইকি/ ছায়ানট/ বাংলা বর্ষপঞ্জির জন্ম

ছবিঃ রাহুল চক্রবর্তী