ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

এই বছর ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে এপ্রিল মাসের ২ তারিখ থেকে। আমার একজন নিকটাত্মীয় মফস্বল থেকে ফোন করেছেন, সেটি এ বছর জানুয়ারি মাসের ঘটনা। মেয়ের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু তিন মাস পর, সেজন্য তিনি খুব ব্যস্ত, যদি আমি কষ্ট করে ‘কখগ’ নামীয় মেডিক্যাল কোচিং-এ  তার মেয়েকে ভর্তি করিয়ে আসি – তাহলে তেনাকে আর এই সময়ে ঢাকায় আসতে হয় না – সেটি তার জন্য বিরাট এক উপকার। এই কাজটি করে দিলে তিনি আমার নিকট আজীবন কৃতজ্ঞ থাকতে চান। বলা বাহুল্য, এই কোচিং নগর ঢাকা শহরেই আমার বাসা এবং  বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ কোচিং হাসপাতালগুলো যেখানে অবস্থিত সেই বিখ্যাত ‘ফার্মগেট’ অঞ্চল, আমার বাসা থেকে অতি নিকটে তার অবস্থান। তাই আমার নিকটাত্মীয়কে, যথেষ্ট উৎসাহ এবং উদ্দীপনা সহকারে  কনফার্ম করি – এই কাজটি আমার জন্য মোটেই কঠিন নয়, অযথা টেন্সন নেবেন না দাদা। পরদিন, তিনি আমার ব্যাংক একাউন্টে পনের হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন,  সাথে কুরিয়ারে মেয়ের তিন কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সমূহ। অতঃপর ২৪ ঘণ্টা বাদে আমি ফার্মগেট যেয়ে অনেক ভিড়ভাট্টা সয়ে  ‘কখগ’ নামীয় কোচিং সেন্টারে তার মেয়ের ভর্তি সম্পাদন করে, ক্লান্ত হয়ে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করি।

ডাক্তারের কর্মস্থল’টির নাম আমরা জানি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা চেম্বার । সেই স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারের ব্রশিওরে যে সকল মহামান্য শিক্ষকদের নাম লিপিবদ্ধ করা আছে -তাদের প্রায় সবার নামের আগেই  ‘ডাক্তার’ পদবিটি আছে । একজন অসুস্থ মানুষ ডাক্তারের সেবা শুশ্রূষা পেলে সুস্থ হন , অর্থাৎ কর্মে অক্ষম মানুষ চিকিৎসকের চিকিৎসা পেয়ে কার্যক্ষম হয়ে উঠেন  -অতএব একজন ছাত্র যদি কোচিং সেবা পেয়ে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় পাশ পূর্বক  -ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার জন্য যোগ্য ও সক্ষম হয়ে উঠেন -আর সেবাদাতা ব্যক্তিটি যদি ডাক্তার হন এবং এই মানব সেবার পেছনে যদি অর্থের ইন্ধন থাকে – তাহলে আমরা কোচিং সেন্টার’কে হাসপাতাল ডাকলে নিশ্চয় মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

কিন্তু তাই বলিয়া  কন্যার এইচএসসি পরীক্ষাটি তদবধি শুরুই হয় নাই, কন্যা তাহার, অনাগত সেই পরীক্ষায় পাশ করিবে, না ফেল করিবে – সেই ভবিষ্যৎকালটি কিরূপ হইবেক, তা না জানিয়া, না  বুঝিয়া, এবং যেহেতু  ঈশ্বরচন্দ্র বলিয়া গিয়াছিলেন “লম্ফ দিয়া পথ চলিও না”, তথাপি বাধ্য হইয়া, এই যে আমি লম্ফ দিয়াই ফার্মগেটে গমন করিলাম – উহাকে  নিশ্চয় ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ আপনারা বলিতেই পারেন! নিকটাত্মীয়কে বলা উচিত ছিল ‘কস কী মমিন!’  কিন্তু তাহাকে এমনটি বলা হইলে , তাহা বড্ড ভুল বলা হইত জনাব। কেননা তদস্থলে যাইয়া, আমি যাহা দেখিলাম – তাহা  আমার জানা ছিল না। এইখানে ঘটনার আড়ালে -চলিতেছে অন্য অনেক ঘটনা !

জানুয়ারি মাসের মধ্যে ভর্তি হইলে পাওয়া যাইবে  বিশাল ডিসকাউন্ট, উনিশ হাজার টাকার কোচিং ফিস, চার হাজার টাকা ছাড় পাইয়া, হইয়া যাইবে  মাত্র মাত্র পনের হাজার টাকা! অর্থাৎ  ‘যিনি আগে আসিবেন, তিনি অধিক টাকার সুবিধা পাইবেন’ এই হইতেছে ব্যাপার! জানুয়ারি মাসের পর, ফেব্রুয়ারি মহান ভাষার মাসে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভাষা শহীদ স্মরণে -আসিলে তখনও পাওয়া যাইবে  তিনহাজার টাকা ছাড়! ২৬শে মার্চ গণহত্যা দিবস অর্থাৎ অপারেশন সার্চ লাইট রাত্রির পর দিন পর্যন্ত আসিলে -ডিসকাউন্ট পাইবেন দুই হাজার টাকা! এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড দাবদাহে  ‘এসো হে বৈশাখ’ গান গাইবার তালে তালে, সম্ভবত আগের ডিসকাউন্ট দুইহাজার টাকা স্পেশাল ভাবে বলবত থাকিবে -পান্তা ইলিশে ভরপেট খাইয়া নববর্ষ উদযাপনের দিন পর্যন্ত! তবে এইচ এসসি পরীক্ষা শেষ হইয়া  গেলে, তখন ভর্তিতে কোনরূপ ডিসকাউন্ট ফিসকাউন্ট, নাথিং ইয়ু ওইল গেট, আপনি পাইবেন ঘণ্টা! আমার নিকটাত্মীয় সম্ভবত এই সব নানাবিধ সুযোগ সুবিধা আছে জানিয়াই, ভাবনা চিন্তা করিয়া -আগাম আমাকে দিয়া কিনিয়া রাখিলেন মেয়ের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার টিকিট।

 

a

কোচিং হাসপাতালের ব্রশিওরে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে

  • Must pay the payment in which branch student wants to take admission.
  • Student/Guardian can’t cancel the admission after completing it once.
  • Admission fees is not refundable.
  • Authority has the supreme power to take any kind of decision over any issues.

অর্থাৎ টাকা জমা দিবার পর বাকী সব আলাপ, ভর্তির পর তা ক্যান্সেল করার সিস্টেম নাই, এই টাকা অফেরৎ যোগ্য, এবং কর্তৃপক্ষ যে কোন সময় যে কোন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।

তার মানে মেডিক্যাল কোচিং নিষিদ্ধ করা নিয়ে সরকারের হাঁক ডাক – আদতে নখ দর্প হীন এক ব্যাঘ্রের চিৎকার, ব্যাপার তাহাও  নয় , ইহা কনফার্ম ব্যাঘ্রও  নয় – বিড়ালছানা বড়জোর! এবং এটুকুও  নিশ্চিত জানা যাচ্ছে , মেডিক্যাল-এ ভর্তি পরীক্ষায় কোচিং সেন্টার গুলো’ বন্ধ করবার ব্যাপারটি, এখন আর কোন আলাপে কেন, বোধ করি কোন আকাশেও নেই! বরং সরেজমিনে দেখতে পেয়েছি – কোচিং সেন্টারের উপর ছাত্র-ছাত্রীদের নির্ভরতা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি! “কোচিং ফাঁদে আটকে গেছে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ”, বলি এই কথা আর শুনবো কত ! বেঁচে থাকার নাম যদি ‘শিক্ষা পেছনে দৌড়ে দৌড়ে হয়রান’  হয় , তাহলে এই শহরে  বেঁচে থাকা এমনিতেই ফাঁদময় হয়ে আছে বহু বছর থেকে, অতএব ফাঁদে আটকে যাবেন কী যাবেন না, তা একান্তই আপনার নিজস্ব ব্যাপার! বরং আমি বলতে পারি ‘ফান্দে পইড়া বগা কান্দে না রে’!

প্রশ্ন নম্বর এক হচ্ছে – কোচিং কী কোন অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা? উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই নয় কাগজে কলমে তা প্রমাণ করবার মতো সে রকম কোন নথি পত্র আমাদের হাতে নেই।

প্রশ্ন নম্বর দুই হচ্ছে – তাহলে কোচিং কেন বন্ধ করতে হবে? এর অনেকগুলো উত্তর আছে। উত্তর নম্বর এক – এর ব্যবসা রমরমা হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে এরা , তাই বন্ধ করে দাও।  উত্তর নম্বর দুই – কোচিং সেন্টার প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত প্রমাণ আছে, তাই বন্ধ করে দিতে হবে। উত্তর নম্বর তিন, চার, পাঁচ ও ইত্যাদি যথাক্রমে ‘আমজনতা কোচিং ফাঁদে নিঃস্ব’, ‘কোচিং সেন্টার ঠিক মত ভ্যাট দেয় না’, ‘রাস্তায় অসহনীয় যানজট’ ও আমার ভাল্লাগে না তাই।

যদি শুধু প্রশ্ন পত্র ফাঁস নিয়ে কথা বলি , সেই ক্ষেত্রে প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় ও ইত্যাদি প্রশ্ন 

  • কোচিং সেন্টার কী যাদু মন্ত্র দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করে ?
  • কোচিং সেন্টারের সাথে কী সরকারের অফিস জড়িত নয় ?
  • পায়ে বা মাথায় ব্যথা হলে , কেটে দিলেই কী কাম সাড়ে?
  • মেডিক্যাল কোচিং কি নতুন কোন ব্যাপার ?

পরীক্ষায়  ডিভিশন পদ্ধতি উঠে গিয়ে, দেশে যখন জিপিএ পদ্ধতির আমদানি হল- হিসাব মোতাবেক তার পর দিন থেকেই নম্বর পদ্ধতিতে আর কোন ছাত্রকে মূল্যায়ন করার কোন সুযোগ আমাদের রইল না । অথচ এসএসসির ফলাফলে – জিপিএ ফাইভকে অভিভাবক এবং বিদ্যালয় গুলো গোল্ডেন জিপিএ এবং নরমাল জিপিএ – এই দুই ভাগে বিভাজিত করেছেন, অথচ মন্ত্রণালয়ের কড়াকড়ি নির্দেশনা আছে – গোল্ডেন জিপিএ বলতে কোন কিছু  নেই এবং  তা উচ্চারণ করা পর্যন্ত নিষিদ্ধ! কিন্তু বাস্তবে জিপিএ ফাইভ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, মাত্রা অধিক হওয়ার কারণে, কলেজগুলো, গ্রেড পয়েন্ট সমান হলে – বিষয় ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বরকে  বিবেচনায় নিয়ে ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত হয়েছেন এবং কলেজগুলোর এই পাগলামিতে রাষ্ট্র পুরোপুরি  নির্বাক! কেননা মূলত রাষ্ট্রের পাগলামির কারণেই – আজ এই দায় এসে পড়েছে কলেজের ঘাড়ে! তাই কে কারে সামলায়!

‘গ্রেড’ হচ্ছে ভূতপূর্ব  ‘নম্বর’ পদ্ধতির এডভান্স সংস্করণ। একজন ছাত্রের মেধার মূল্যায়ন করতে গিয়ে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সকালে একবার তার ওজন  মাপছে গ্রেড স্কেলে এবং বিকালে আবার তাকে মাপছে নম্বর স্কেলে। বলি এই অভিনব  খিচুরি রন্ধনের রেসিপি তারে দিল ক্যাঠায় ! গ্রেড এবং নম্বর , যুগপৎ বিবেচনা মোটেই আইন সিদ্ধ নয় এবং তা গ্রেড নীতিমালার পরিপন্থী! খুব সাধারণ এই কথাটিও আজকাল বুঝতে পারছে না আমজনতা ! সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট – পাঁচ হবে না দশ হবে, না এবিসিডিইএফ থেকে শুরু করে জেড পর্যন্ত  হবে – এই নিয়ে শিক্ষাবিজ্ঞানী’দের এক দুই নয় দুইশ সতেরটি , ভিন্ন ভিন্ন মত থাকতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের চলমান নীতিমালা অনুসারে , পরীক্ষায় ১০০তে   ৮০ নম্বর পেলে ‘এপ্লাস’ এবং ৯৯ পেলেও তা ‘এপ্লাস’ই , কোনভাবেই ‘এ ডবল প্লাস’ বা ‘সিগমা প্লাস’ নয়!

অনেকেই বলেন, বিল গেটস বা জুকারবার্গ মেট্রিকে জিপিএ ফাইভ পান নাই, তাতে পৃথিবীর এমন কি ক্ষতি হয়েছে! বিশ্বব্যাপী সফল মানুষদের নানা বিধ কেচ্ছা কাহিনী শুনিয়ে আজকাল অনেকেই ’ফেলটুস’ ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপ্রাণিত করবার চেষ্টায় নিয়োজিত আছেন। বলি সফল মানুষদের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হোন, নো প্রবলেম – সফলতা আসুক বা না আসুক কিন্তু তাতে আপনার কোন স্বাস্থ্যহানি বা অর্থনৈতিক ক্ষতি নেই! কিন্তু বিল গেটস বা জুকারবার্গ যে পদ্ধতি বা যে ক্যারিশমায়  আজ সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেছেন – তার চাইতে পড়াশুনো করে জিপিএ ফাইভ পাওয়া অনেক বেশি সহজ! আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় -‘ইতিহাস’ ফাইনালি সফল মানুষদের গল্প লিখে রাখে, তার খাতায়  – অসফল ব্যর্থ মানুষ, একদা রাজা ছিলেন আজ পথের ফকির, এই রকম লক্ষ লক্ষ গল্প – ইতিহাস লেখে না তার খাতায়।  আর আমরাও জানি না, কখন কেমন করে তারা তারা নিক্ষেপিত হয়েছিলেন আস্তা-কুঁড়ে!  আমরা শুধু জানি, পিথাগোরাস লিখে গেছেন একটি মাত্র উপপাদ্য ’সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ অন্য দুই বাহুর বর্গের যোগফলের সমান’  অথচ  ‘পিথাগোরাস’ এই রকম হাজার হাজার তত্ত্ব উপস্থাপন করে গিয়েছিলেন জীবিতাবস্থায়,  প্রমাণ করে যেতে পারেননি তার কিছুই! ‘অতীন্দ্রিয়বাদী’ পিথাগোরাস বলে গিয়েছিলেন – গ্রহ নক্ষত্র আবর্তিত হলে সেখানে গান উৎপন্ন হয় – আর এই তথ্য থেকেই পরবর্তীতে বিজ্ঞান জেনেছে ‘মিউজিক অব দ্যা স্পেয়ারস’ কী জিনিস!  পিথাগোরাস, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তাই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী’রা -তাঁকে  এবং তাঁর শিষ্যদেরকে এক জায়গায় জড়ো করে আগুন দিয়ে মেরে ফেলেছিলেন, একদিন। তাই জীবদ্দশায়, বেঁচে থাকতে থাকতেই-  নিজে করে গেছেন, খেয়ে গেছেন এবং শুনে গেছেন পরের মুখে নিজের বন্দনা – এ রকম মনোমুগ্ধকর গল্প, সংখ্যায় নিতান্তই সামান্য!  সেই সব গল্প বাদ দিয়ে  বরং অন্য গল্প হোক – কবির মাঝি কিংবা রিক্সা চালক রহিম মিয়ার একজন পুত্র সন্তান ছিল, সেই গল্পটা একটু!

অদম্য মেধাবী সেই পুত্র সন্তানটি, দিনের বেলা যে হাল বেয়েছিল ধানে আর গভীর নিশুতি রাতে হারিক্যান জ্বেলে পড়ে পড়ে – সেকেন্ড ডিভিশন  পাওয়া সেই ছেলেটি,  নাম ছিল তার মোখলেস। তোমরা তারে রোজ রোজ ভেংচি কেটে বলতে ‘বান্দরের মুখ, কুত্তার লেজ মোকলেস’।  ঢাকা শহরে ফার্মগেট ‘কখগ’ কোচিং সেন্টারের নাম সে শোনেনি কখনও! আজ থেকে পঁচিশ  বছর আগের কথা, সে কিন্তু ঠিক ঠিক ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল সেই দিন! রাজধানীর  বিখ্যাত ডাঃ মোখলেসুর রহমান,আজ যার নাম।

অথচ আজ পঁচিশ বছর পর কুড়িগ্রামের উলিপুরের ছেলে, তারও নাম ছিল মোখলেস, ডাবল গোল্ডেন জিপিএ ছাত্র। জানতে চেয়েছিলাম – কী হতে চাও? বলল – ‘মোক দিয়া মেডিক্যাল ফেডিক্যাল ওসব হবার নয়! ঢাকায় যেয়ে কোচিং করবু ও মেলা টাকার মামলা বাহে!’

ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি দেশের নামী মেডিক্যাল  কোচিং এর সাথে জড়িত, শিক্ষক এবং পরিচালক, জানতে চেয়েছিলাম – কোচিং না করে মেডিক্যালে টেকা কি সম্ভব? তিনি বললেন -এটি খুব কম সময়ের পরীক্ষা, কোচিং না করলেও এটলিস্ট তাকে কোচিং গাইডগুলো ফলো করতেই  হবে, যদি সে পারে – নিজ উদ্যোগে মডেল টেস্ট দিয়ে দিয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা ,সঞ্চয় করে রাখতে পারে, কোচিং ছাড়া একেবারে অসম্ভব তা বলছি না, বাট দিস ইজ ভেরী টাফ জব!

এই তথ্যটি আমাদের আজ অজানা নয়। গত দশ পনের বছরে উচ্চশিক্ষায় বুয়েট, কুয়েট,  মেডিক্যাল ও  বিশ্ববিদ্যালয়ে – গ্রাম থেকে  আসা ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে দিনকে দিন! উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর কোচিং সেন্টারগুলো, ছাত্রদের শিখিয়ে দেয় – কী উপায়ে পড়লে সংক্ষিপ্ত সময়ে – খুব ভালো পরীক্ষাটি দেয়া যায়। এটি অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই – এটি একটি তুমুল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, একটি প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়ে গেলেই ঘটে  যেতে পারে চূড়ান্ত সর্বোনাশ! আজ পর্যন্ত যতটুকু দেখে এসেছি – তাতে নিঃসন্দেহে বলতে পারছি – শিক্ষার্থীদের ডাক্তার হবার জন্য মূল রেসটি শুরু হয়ে যায়  এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার ঠিক পর দিন থেকেই! আমেরিকা ইয়োরোপ এবং ভারতেও মেডিক্যালে পড়বার জন্য প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধ্যতা মূলক।  ভারতে মেডিক্যালে পড়বার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাটির নাম  AIPMT / অল ইন্ডিয়া প্রি মেডিক্যাল টেস্ট। ২০১০ সালের পর থেকে অধিক সংখ্যক পরীক্ষার্থীকে সুযোগ করে দিতে, পরীক্ষাটিকে  দুইটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে  – প্রথমে প্রিলিমিনারী, এবং পরে  টিকলে মেইন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার তারিখটি নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে – প্রতি বছর মে মাস শুরুর প্রথম রবিবারে, তা এক যোগে অনুষ্ঠিত হবার নিয়ম। ২০১৫ সালে এই পরীক্ষায় হরিয়ানা রাজ্যে পুলিশ দুইজন ডেন্টিস্ট এবং একজন মেডিক্যালের ছাত্রকে গ্রেফতার করে, যারা ছাত্রের শরীরের ভেতরে গেঞ্জিতে লুকিয়ে রাখা মোবাইল ডিভাইসের সাথে ব্লটুথ  ফোনে, প্রশ্নপত্রের উত্তর বলে দিয়েছিলেন। ঘটনা তদন্ত করে সুপ্রিম কোর্ট এর সত্যতা পায় এবং পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার নির্দেশ প্রদান করে।

যে প্রক্রিয়ায় ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে, তা সঠিক না বেঠিক, এই নিয়ে আলোচনা, অবশ্যই বেহুদা প্যাঁচাল! কেননা রাষ্ট্র কারো কথার ধার ধারছে না, সে আছে নিজের তালে, ধরে নিলাম প্রচলিত পদ্ধতিটিই সঠিক। একজন শিক্ষার্থীর  শিক্ষাজীবনে এইচএসসি পরীক্ষাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে, মহাবিদ্যালয়!  এই ব্যাপার টিকে -খাল থেকে সাঁতরে এসে -নদীতে সাঁতার না কেটেই– সমুদ্রে অবগাহন করবার ব্যাপার বলে মনে করেন বিজ্ঞজন ।

বলি, উচ্চ মাধ্যমিকে  দুইবছর ধরে অক্লান্ত পড়াশুনো করেও, আবার ভর্তির জন্য সুপার স্পেশাল কোচিং কেন?

আমরা কী দেখেও দেখছি না -আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এক নিদারুণ দৈন্যদশা?  মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার আগে,  তিন চার মাসের কোচিং এমন কী যাদু বিদ্যা যা না শিখলে –বৈতরণী পার হওয়া হবে না -এই জীবনে ! না কী এটি  ফেয়ার এন্ড লাভলি,  যা না মাখলে -ধবধবে ফর্সা না হয়ে শিক্ষার্থী ফাইনালি বিদ্যার জাহাজ না হয়ে নৌকা হয়ে –ডুবে যাবেন অথৈ সাগরে!

এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে, সর্বোচ্চ ৭২ ঘন্টার মধ্যেই -মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষাটি সম্পন্ন করবার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। মাধ্যমিক পাশ করবার পর, উচ্চ মাধ্যমিকে   দুই বছর ধরে একজন ছাত্র যে বিদ্যাটি অর্জন করেছেন -এই পরীক্ষায় পাওয়া যাবে তার সঠিক মূল্যায়ন। পরবর্তীতে এই এস সি পরীক্ষার ফলাফলের একটি পারসেন্টেজ-এর সাথে ভর্তি পরীক্ষার নম্বর যোগ দিলেই তৈরী হয়ে যাবে মেধা তালিকা। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরদিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনলাইনে প্রকাশ করে দেবে সেই রেজাল্ট।

যদি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের বছরে পাশ করা  কাউকে দ্বিতীয় বার পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেয় , সে ক্ষেত্রে পুরনো প্রার্থীর নম্বর থেকে ৫ (কিংবা প্রযোজ্য)  নম্বর কেটে নিয়ে তাকে – নতুন দের সাথে প্রতিযোগিতায় বসার অনুমতি দিতে পারে সরকার।

এই প্রস্তাবনার বিপক্ষে সাতশ তেরটি বিরুদ্ধ মত থাকতে পারে, কিন্তু কোচিং করে করে, ঘষে মেজে, ট্রেনিং নিয়ে নিয়ে একজন সাধারণ মানের শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে উঠবার উপযুক্ত হয়ে উঠবেন – আর দেশের অদম্য মেধাবীরা ভ্যানরিক্সা কিংবা জমিতে হাল চাষ করে বেড়াবে – কোচিং  অভাবে, তা অন্যায়! জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে ঢাকা শহর এমনিতেই জ্বলজ্বল করছে মাত্রাতিরিক্ত, সেই আলো উলিপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে অল্প কিছুটা ছড়াক। ভালো পড়াশুনো করা ছাড়া, গরীবের ভাগ্য উন্নয়নের আর কোন দ্বিতীয় যাদুবিদ্যা জানা নেই।

রাষ্ট্র এবার তুমি চোখ নামাও, কোচিং তুমি থামাও।