ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ধর্মীয় উগ্রবাদ আমাদের দেশে নতুন কিছুই নয়। সেই পুরোনো কাল থেকেই আমাদের দেশে এই ধর্মীয় উগ্রবাদ ও উগ্রবাদীদের অবস্থান, যা আজ আমাদের মাঝে জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আমাদের দেশে গত কয়েক বছর ধরে ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি সঞ্চয় ও বিভিন্ন ধরনের বেশ কয়েকটি বড় হামলা দেশের প্রতিটি মানুষকে যেমন ভাবে ভাবিয়ে তুলছে তেমনি চিন্তিও করেছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিস্তারের কারণ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী, নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন এবং নানান পথে জঙ্গিবাদ দমনে চেষ্টা ও চানিয়ে যাচ্ছেন।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তারপরও কেন তথাকথিত এই জঙ্গিদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না? জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ ধর্মীয় উগ্রবাদের শিকার। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধাদের প্রধান শত্রুই ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদ ও উগ্রবাদীরা। সেই সময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারি ধর্মীয় উগ্রবাদীরা মুক্তিযুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। তদের ধারণা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মকে পুঁজি করে খুব সহজেই বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে দাবিয়ে রাখা যাবে বা তাদেরকে পরাজিত করা যাবে। সেই সময় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের এমন ধরণা সম্পূরণ রূপে মিথ্যা প্রমাণ করতে পেরেছে এ দেশের সাধারণ মানুষ।

এরপরও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কু-নজর এড়াতে পারেনি আমাদের এ দেশ। বরাবরই বিদেশি বিভিন্ন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের নজর ছিল বাংলাদেশের দিকে। আর সেই লক্ষেই কাজ করে গেছে নানান বিদেশী ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠি যাদের সহযোগি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে কিছু দেশীয় ব্যক্তি ও সংগঠন। বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদ খুটি গেড়ে বসেছে তার মূলেই ছিল আশির দশকের আফগান-রাশিয়ার যুদ্ধ। সেই সময় অনেক ইসলামিক যোদ্ধা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তানে যায়। যুদ্ধে অনেকে নিহত হয় অনেকে যুদ্ধ শেষে ফিরে আসে। তালেবান হল সুন্নি ওহাবী গোষ্ঠী। যারা তালেবানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে তারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে ওহাবী কিংবা সালাফি ছিল কিনা তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও তারা যে ফিরে আসার সময় ওহাবী মতবাদ মাথায় করে নিয়ে এসেছে তা স্পষ্টভাবে বলা সম্ভব।

দেশে এসে তারা বিভিন্ন মাদ্রাসা, মসজিদ তৈরি করে কেউ বা মসজিদ মাদ্রাসার প্রধান হয়ে বসে। সুতরাং মাদ্রাসায় ইসলামিক শিক্ষার নামে বলে বলে ওহাবী মতবাদের প্রসার আর মসজিদের খুতবায় চলে ওহাবীদের পক্ষে প্রচার। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বীজ বপনের কাজটি হয়েছে সেসময়। পরবর্তীতে আমাদের ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দল গুলি তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নানান সময় নানান ভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের ব্যবহার করেছে। আর এ থেকেই দেশে আজ ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদ আজ শক্তিশালী অবস্থানে আছে।

গত ১৭ মার্চ ঢাকার আশকোনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন বা র‌্যাবের নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে৷ এতে হামলাকারী নিহত ও দুই ব়্যাব সদস্য আহত হয়। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস এই হামলার দ্বায় স্বীকার করেছে। তবে বরাবরই আমাদের সরকার ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিন দেশে আইএস এর অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছেন। যদিও বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই এ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছিল। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স অ্যান্ড টেররিজম রিসার্চের (আইসিপিভিটিআর) পরিচালক প্রফেসর রোহান গুণারত্ন এই বিতর্কে কিছুটা খোঁচা মেরেছেন এই বলে যে “হলি আর্টিজানে যারা হামলা চালিয়েছিল, তারা জেএমবি নয়, তারা আইএস। এটি সেই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী, যারা নিজেদের ইসলামিক স্টেট বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওই হামলা সম্পর্কে সত্য বলেননি।

তবে সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তির মুখে মাঝে মাঝে এমন বলতে শুনা যায় যে দেশে আইএস নেই তবে তাদের আদর্শে বিশ্বাসী কেউ কেউ থাকতে পারে । আইএস ও আইএস আদর্শে বিশ্বাসী বলতে তারা কি বুঝাতে চান তা মোটে ও আমাদের বোধগম্য নয় । এর আগে অবশ্য দেশে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনার পর আমরা সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে বলতে শুনেছি ঐ সব নাকি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ই কাজ । কিন্তু ঘটনা পরিক্রমে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলা পর আমাদের এমন অভিযোগ আর তেমন শুনতে হচ্ছে না ।

আশির দশক ও তার কিছু আগে ও পরে যদি ও ধর্মীয় উগ্রবাদের তালিকায় ওহাবী কিংবা সালাফি আদর্শে বিশ্বাসী মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকের জড়িট ছিল কিন্তু কালের বিবর্তনে এই ওহাবী কিংবা সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী হতে থাকে দেশের নামি দামী সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র ও শিক্ষকেরা যার অনেক প্রমান ই আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি । বর্তমান সরকার ও তার প্রশাসন ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা ধর্মীয় জঙ্গিবাদীদের প্রতিহত করতে যথেষ্ট আন্তরিক। তবে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের প্রতিহত করতে হলে সরকারকে আরো সচেতন হতে হবে সেই সাথে বিশেষ নীতির ও পরিবর্তন করতে হবে । দেশে সুষ্ঠ গনতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে । সকল দল ও মতের প্রতি শ্রদ্ধারেখে জংনকে সাথে নিয়ে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জঙ্গি দমনে এগিয়ে যেতে হবে । জঙ্গি দমনের নাম করে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি যাতে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে তার জন্য সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে । আমাদের প্রিয়দেশ বাংলাদেশ কখোনই উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিবাদের আশ্রয়স্থল হতে পারে না, বা হতে দেয়া যাবে না।

লেখক: ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট