ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বৃটিশদের কাছ থেকে আমরা মুক্তি পাওয়ার পরই ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছিল আমাদের। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এটা নতুন কিছুই নয় ।যদিও আইনের নজরে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি পুরো পুরি বেআইনি তার পর ও কে মানে কার আইন। ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করে যাচ্ছে এমন রাজনৈতিক দলের সংখ্যা কত তার হিসাব বোধ করি খোদ নির্বাচন কমিশনও দিতে পারবেনন না। যদি ও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ইসলামিক রাজনৈতিক দল আছে ১০টি। আর আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল গুলির কাছে ও কিন্তু ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলির কদর কম না। বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মহাজোটে বেশ কিছু ইসলামী দল আছে৷ আর বিএনপির ২০ দলীয় জোটেও জামায়াতসহ ইসলামী রাজনৈতিক দলের দাপট কম না৷ আবার ভোটের আগের আমরা দেখি বিভিন্ন দলের প্রধানরাসহ বড় বড় নেতারা চলে যান সৌদিআরবে ওমরা হজ্ব করতে এসেই এক এক জন শাহ সূফি পর্দানশীল বনে যান। তারা পর্দানশীল হবেন ধার্মিক হবেন তার জন্য আমার মোটেও কোন আপত্তি করছি না বা করবো ও না তবে তারা যে নির্বাচন পূর্ববর্তী মাত্র কিছুদিনের জন্য ধর্মিক সেজে ধর্মিক বেশে আমাদের সাধারন মানুষের সাথে চরম প্রতারনা করেন সেটাই আমার ক্ষোভ।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে আজ এক মহাশক্তি হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। ২০১৩ সালের আগে যদিও তেমন কেউ এই সংগঠনটির নাম জানতো না তবে এই সংগঠনটির জন্ম ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি সংগঠনপ্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই সংগঠনটি বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে। ২০১১ সালে তারা বাংলাদেশ নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৯ এর কয়েকটি ধারাকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং ঐ সব ধারা গুলি বাতিলের দাবীতে আন্দোলন করে জনসম্মুখে আসেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে সমগ্র জাতি যখন একাত্তরে মানবতাবিরোধী তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে একত্রিত তখন ই বাংলাদেশের প্রধান ধর্মভিত্তিক ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল জামাত-ই- ইসলাম বাংলাদেশ ও তাদের সহযোগিদের মদদে একাত্তরের মানবতা বিরোধী তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য আদা-জল খেয়ে নামেন । এমন কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যারা জোরালো আন্দোলন করে আসছিলেন তাদের কে নাস্তিক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ফাঁসি দাবী নিয়ে ব্যপক আন্দোলন ও সমাবেশ শুরু করে এই হেফাজতে ইসলাম যার প্রধান হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক শাহ আহমদ শফী। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৫ই মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি নামে হেফাজতে ইসলাম নারকীয় তান্ডব চালিয়ে তা হয়তো দেশের মানুষকে ভুলতে কয়েক যুগ লেগে যাবে ।

২০১৩ সালের ৫ই মে পর থেকে হেফাজতে ইসলাম বর্তমান ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের মনের ভিতর একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। যদিও সরকারের ভিতরের অনেকেই মুখে মুখে হেফাজতে ইসলাম ও এর প্রধান শাহ আহমদ শফী সম্পর্কে নানা মন্তব্য করে আসছেন তবে সেই মন্তব্য তেমন কার্যকর হয়নি। বরং ২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজতে ইসলাম সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবী তুলেছিল সরকার ধীরে ধীরে তাদেরকে খুশি করতে সেই ১৩ দফা দাবী বাস্তবায়নের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে সরকার । হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার একটি ছিল  ‘মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা’। এই দফাকে সমনে রেখেই আমাদের সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে স্হাপিত ভাস্কর্যটিকে সরানোর জন্য নানা ধরনের হুমকি ধমকি দিয়ে আসছিল হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলি। অতি সম্প্রতি গনভবনে কওমী মাদ্রাসার আলেমদের সাথে এক সাক্ষাতে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে স্হাপিত ভাস্কর্যটি সরানোর জন্য যারা আন্দোলন করছেন তাদের সঙ্গেও সহমত পোষন করেন এমন কি প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন এই ভাস্কর্যটি সরানোর জন্য তিনি প্রধান বিচারপতির সাথেও আলাপ করবেন।

হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলি বরাবরই আমাদের অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের চরম বিরোধিতা করে আসছে এমানি নানা সময় নানা ভাবে হুমকি ধমকি ও দিয়ে আসছে কিন্তু তাদের এই হুমকি ধমকি আমাদের সাধারণ মানুষ কখনোই তোয়াক্কা করেনি। ২০০১ সালে আমরা দেখেছি ওদের নারকীয় হামলা তাতেও বন্ধ হয়নি উৎসব। এবার ও বাংলা বর্ষবরণ উৎসবকে শুধু বানচাল করাই নয়, মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়ার জন্য মঙ্গল শোভাযাত্রাবিরোধী নানা হুমকি-ধমকি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বর্ষবরণের অংশ হিসেবে সৃজিত শিল্পকর্মের ওপর দানবীয় হামলা চালায় উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী। মঙ্গলবার গভীর রাতে চট্টগ্রামে পোড়া মবিল ছিটিয়ে চারুকলার শিক্ষার্থীদের আঁকা বর্ষবরণের দেয়ালচিত্র গুলি নষ্ট করে দেয়। আবহমান গ্রামবাংলার কৃষি সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়া, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আনন্দ প্রকাশের স্বাভাবিক সুন্দর ছবিও মৌলবাদীদের সহ্য হয়নি! পারলে তারা মানুষের ছবি শুধু নয়, উৎসবমুখর মানুষের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ত। ওরা বুঝাতে চেয়েছে বাংলা নববর্ষ পালন একটা বিশেষ ধর্মের মানুষের উৎসব এটা কোন মুসলমানের নয়। অথচ নববর্ষ পালনের সঙ্গে ধর্মের যে কোন যোগসূত্র নেই এটাই তো সত্য। শেষ পর্যন্ত আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলতে বাধ্য হয়েছেন সকল ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বাংলা বছরের প্রথম দিন উদযাপন করে। এখানে ধর্মকে টেনে আনার কোন যৌক্তিকতা নেই।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মিক এটা যেমন সত্য তেমনি ধর্মান্ধতাও যে এদেশের মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে এটাও সত্যি। এ কারনেই আমাদের রাজনীতিতে ধর্ম একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। সে কারনেই আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি তাদের আদর্শ ও নীতি ভুলে গিয়ে ক্ষমতায় আসার জন্য বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মকে বিশেষ পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যার মূলনীতিই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি ক্ষমতায় আসার জন্যও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই দলটি বার বার উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠির কাছে মাথা নত করে আসছে যা তাদের জন্য এমন কি জাতির জন্য দুঃখজনক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যাকে এটা মনে রাখতে হবে এই মৌলবাদী গোষ্ঠি তার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করে নিবে ঠিকই কিন্তু ভোটার বেলায় ফলাফল হবে হয়তো তার উল্টো।

আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ কালো ছায়া বরাবরই উড়ছে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষাকরতে হলে মুক্তি যুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়তে হলে বাংলার মাটি থেকে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চিরকালের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।