ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের উদ্বোধন ও নবীন বরণ অনুষ্ঠানে আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বিনা দ্বিধায় বলে দিয়েছেন দেশে এখনো পূর্ণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়নি। আমাদের বর্তমান প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের সৎ সাহস ভবিষ্যতের জন্য আমাদের যেমন অনুপ্রেরণার খোরাক হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি চিন্তিতও করছে। অনুপ্রেরণা ও চিন্তার কারণটা সংক্ষেপেই বলে ফেলি। ভবিষ্যতের হয়তো আরো যারা প্রধান বিচারপতির আসনে বসবেন তারা হয়তো চেষ্টা করবেন শ্রী এস কে সিনহার কথাগুলিকে আনুসরণ করে দেশে পুরোপুরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করণীয় তার যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন।

অন্যদিকে মাননীয় প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন মন্তব্যে আমাদের বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিরা কিছুটা হলেও নাখোশ। সেই দিক থেকে হয়তো সরকার পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু দিকের প্রতি নজর রাখবেন যাতে করে পরবর্তীতে এমন অবস্হায় সরকারের কর্তাব্যক্তিদের না পরতে হয়। মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে টানতে হলো সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার কারণে। ঘটনার ধরন যদিও অতি পুরোনো কিন্তু বার বার আমাদের কে ঐ পুরোনে বিষয় নিয়েই আলাপ করতে হয় প্রতিবাদে মুখরোতি হতে হয়।

গাজীপুরের শ্রীপুরে কর্ণপুর ছিটপাড়া এলাকার হযরত আলী সরকার সহজ-সরল ভাবেই জীবন যাপন করে আসছিলেন স্ত্রী হালিমা বেগম কে নিয়ে। নিঃসন্তান এই দম্পতি পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের সাধ পুরন করেছিল আট বছর আগে দত্তক আনা মেয়ে আয়েশা। অবশেষে এই মেয়ে আয়েশারকে নিয়েই জীবন দিতে হলো বাবা হযরত আলীকে।

হযরত ছিলেন অশিক্ষিত দিনমজুর, আর স্ত্রী হালিমা বেগম বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করেই জীবন চালাতেন। একটু ভাল থাকার আশায় গরু পালতেন। সমাজের মানুষ নামক কিছু পশু তাদের ঐ ভাল থাকা সহ্য করতে পারেনি। হযরতের পালের গরুটিকে চুরি করে মাংস ভাগবাটোয়ার করে নেয় ফারুক, আফসু, কুদ্দুকেরা। সেখান থেকে কিছুটা ভাগ পান তথাকথিত জনপ্রতিনিধি নামের স্হানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেনও।

হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম অশিক্ষিত হলেও কিন্তু ভুল করেন নি তিনি স্হানীয় জনপ্রতিনিধি সহ পুলিশ প্রশাসন কে বিষয়টি জানিয়াছেন। কিন্তু আমাদের করিতকর্মা পুলিশের কানে হালিমার আর্তনাদ পৌঁছায়নি। কারণ হালিমারা গরীব, তারা পকেট ভর্তি টাকা দিয়ে আমাদের করিতকর্মা পুলিশকে যে খুশিকরতে ব্যর্থ! তাই পুলিশকে জানিয়ে লাভ হয়নি হালিমার। আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তিনি তো আগের মাংসের ভাগ পেয়ে খুশি। তারপরও জনপ্রতিনিধি বলে কথা, ইউপি সদস্য আবুল হোসেন আপসরফা করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোক দেখানো দায়িত্বও নিয়েছিলেন।

চোরেরা ষাঁড়ের মূল্য দিয়ে দিবে বলে আবুল হোসেন আশ্বস্ত করেন হালিমা ও হযরত কে। কিন্তু ঐ আপসরফা যে ছিল শুধুই লোক দেখানো। যখনই ফারুক, আফসু, কুদ্দুক, আবুল হোসেনেরা জানতে পারলো হালিমা থানায় যেয়ে পুলিশের সাহায্য চাইছেন তখনই তারা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। মানুষ রূপী ঐ জানোয়ারের যৌন নির্যাতনের চেষ্টা চালায় হযরত-হালিমার পালিত কন্যা হেরাপটকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশার উপর। আয়েশা প্রায়ই বাবা মায়ের কাছে অভিযোগ করত স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক হোসেনের নামে। ফারুক তাকে জোর করে সাইকেলে ওঠাত জঙ্গলের দিকে নিয়ে যেতে চাইত। বেশ কয়েকবার একই অভিযোগ করায় হযরত আলী গিয়েছিলেন ফারুক হোসেনের বাবা ফজলু মিয়ার কাছে। কোনো প্রতিকার তিনি পাননি। অনেকটা নিরুপায় হয়েই পরে তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য আবুল হোসেন ব্যাপারীর কাছে। তিনিও বিচার করেননি। পাগল বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন হযরতকে।

হযরত ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছিলেন আজকের সমাজে টাকাই এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর মানুষ আর মানবতার কোনই মূল্য নাই তাই জোর যার মুল্লুক তার। তিনি এ দুনিয়ার সমাজপতিদের কাছে এমন কি আইন রক্ষাকারী কারো কাছেই বিচার পাবেন না। এই সমাজ এই রাষ্ট্র তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় কন্যা আয়েশাকেও নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। তখনই হযরত প্রাণপ্রিয় কন্যা আয়েশকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয়।

আজ শুধু এক হযরত বা আয়েশাকেই বিচারের জন্য জীবন দিতে হয়, হাজারো হয়রত-আয়েশা সাগর-রুনি তনু বা রমেল কে জীবন দিতে হয় বিচারের জন্য বা বিনা বিচারে। হালিমার শূন্য ঘর আজ খা খা করছে। পাগল প্রায় হালিমা আজ মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বিলাপ করছেন প্রলাপ বকছেন। হলিমা জানেন আগেও তিনি গরু ও শিশু কন্যার ইজ্জতের বিচার পান নি, এখনো স্বামী-কন্যা আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের বিচারও পাবেন না। তাই তো হালিমা আজ প্রলাপ করে বলছেন আল্লাহর দুনিয়ায় বিচার না পেয়ে তার স্বামী-কন্যা আল্লাহর কাছে গেছে বিচার চাইতে।

আজ আমরা নিজেদের যে সভ্যসমাজের বাসিন্দা বলে দাবি করছি সেই দাবির দিক থেকেই বলছি, আমরা চাইনা আমাদের সমাজে আর কোন হযরত-আয়েশাকে বিচারের জন্য জীবন দিতে হয়, কোন হালিমাকেই যেন ইহকালে বিচার না পেয়ে পরকালের বিচারের আশায় থাকতে হয়।

লেখক: ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট।