ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দলীয়করনের রাজনীতিতে আমাদের সাধারন মানুষের শেষ ভরসাই আমাদের বিচার বিভাগ । তবে একটি স্বাধীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ তথা শাসকরাই হোওয়ার কথা ছিল জনগনের আশা আকাংখার আশ্রয় স্হল । জাতি হিসেবে আমাদের সেই সৌভাগ্য আজ ও হয়নি যে আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও আমাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের আশা আকাংখা পূরনের আশ্রয় স্হানে পরিনত হতে পুরো পুরি ব্যর্থ হয়েছে । তাই দেশের সাধার মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ আশ্রয় বিচার বিভাগকে ও আজ প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠে পরে নেমেছে আমাদের রাজনৈতিকবিদ ও নির্বাহী বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা ।অথচ আইন বিচার ও নির্বাহী বিভাগ ই একটি রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ ।কারণ রাষ্ট্রের এই তিনটি বিভাগ পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই দেশের সার্বিক কাঠামোকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু আমাদের শাসক গোষ্ঠির অগনতান্ত্রিক মনোভাবরে কারনেই রাষ্ট্রের অন্যতম মূল স্তম্ভ নির্বাহী বিভাগ আজ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত । বিচার বিভাগ নিয়ে ও আজ একধরনের বিদ্বেশের জন্ম নিয়েছে তাদের ভিতর ।

গত ১ আগস্ট ২০১৭ উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের যে পরিবর্তন ষোড়শ সংশোধনীতে আনা হয়েছিল, তা ” অবৈধ ” ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্ট। আর ওই রায় প্রকাশের পর থেকেই চলছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিয়ে নানা তর্ক বিতর্ক । রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ প্রধান বিচারপতির কড়া সমালোচনা নানান ভাবে করে আসছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন ” বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির কারণে হয়নি ” এমন একটি বক্তব্য এসেছে রায়ে। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করছেন । তাতেই তারা বোধ হয় ক্ষুব্ধ । জনাব আমির হোসেন আমু একজন প্রবীন রাজনীতিবিদ ও বর্তমান শিল্পমন্ত্রী তিনি পর্যন্ত মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কটাক্ষ করতে টেরেন নি । সম্প্রতি ঝালকাঠিতে আন্তর্জাতিক যুব দিবসের এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে জনাব আমির হোসেন আমু বলেছেন, ” পার্লামেন্ট যদি অবৈধ হয়, তোমার নিয়োগও অবৈধ। কারণ এ পার্লামেন্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছে। সে রাষ্ট্রপতি তোমাকে নিয়োগ দিয়েছে। তোমার নিয়োগ অবৈধ, তুমি অবৈধ চিফ জাস্টিস। ” আমু আরো বলেছেন ” এ দেশ স্বাধীন না হলেও আওয়ামী লীগ এ দেশে মাথা তুলে থাকত। আমরা পার্লামেন্টের সদস্য থাকতাম। ১৯৭০-এর নির্বাচন থেকে আমরা পার্লামেন্টের সদস্য। কিন্তু তোমার মতো ছিঁচকে উকিল এ দেশের চিফ জাস্টিস হতে পারত না। এটা স্মরণ রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর অবদানের কারণেই আজ তোমার মতো ছিঁচকে উকিল এ দেশে চিফ জাস্টিসের মর্যাদা পেয়েছ। ”

১২ আগস্ট ২০১৭ কৃষিবিদ ইস্টটিটিউট মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুব মহিলা লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সোংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অপসারণ চেয়ে বক্তব্যদেন তিনি বলেন, ” সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হিন্দু নন। আমরা জানতে পারছি স্বাধীনতার সময় তিনি শান্তি কমিটিতে ছিলেন। এ শান্তি কমিটির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নিধন। তাই একজন হিন্দু কিভাবে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন? তিনি ষড়যন্ত্র করছেন। বিএনপি সুরে কথা বলছেন। আমরা তার অপসারণ চাই।” তার সথে সুর মিলিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আগস্টের মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। নইলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, প্রধান বিচারপতি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার মত ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও আদালতের ওই পর্যবেক্ষণকে ” বাপের নাম ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

প্রকাশিত রায় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রায়ের পর্যবেক্ষণ অংশে প্রসঙ্গক্রমে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দেশের রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনা করেন। ৭৯৯ পৃষ্ঠার ওই রায়ের ৫৪তম পৃষ্ঠায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পর্যবেক্ষণের অংশে বলা হয়েছে, ” কোনো জাতি বা রাষ্ট্র একজন ব্যক্তিকে নিয়ে বা একজন ব্যক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের কথা বলে গেছেন, আমরা যদি সত্যি তা বাস্তবায়ন করতে চাই, আমাদের অবশ্যই আমিত্ববোধের ওই আত্মঘাতী উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর আসক্তি থেকে মুক্ত থাকতে হবে যে কেবল একজন ব্যক্তি বা একজন মানুষই সব করেছে। ” এই রায়ে আওয়ামিলীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে খাটো করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ তুলাহয়েছে তা কোন ভাবেই সঠিক হিসেবে ধরে নেয়ে যায় না । কারণ ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে “ জাতির জনক ” শব্দটি এসেছে ৩২ বার। প্রধান বিচারপতির রায়ে এসেছে ২১ বার। তিনি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে দ্ব্যর্থহীন শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কমপক্ষে তিনবার। এ কারণে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রায়ের ভিত্তিতে বিতর্ক করার অবকাশ নেই।

বিএনপি এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে মিষ্টি খাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে গিয়েছে বলে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা মন্তব্য করলে ও বাস্তবে এটা তাদের মন্তব্য মোটেও সঠেক নয় । কারণ বিএনপি যদি এ রায়কে স্বাগত জানায়, তাহলে জিয়াউর রহমানকে একজন অবৈধ সামরিক শাসক হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছে বিএনপি। কারণ প্রধান বিচারপতি তার রায়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের শাসনামলকে অত্যন্ত ক্ষতিকর শাসনব্যবস্থা ও ব্যর্থ রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা সমালোচনা চলছে। নানা মহল থেকে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য আসছে। কিন্তু আদালতের প্রতি আমাদের মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এমন কাজ করা কখনো ই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনীতি বিদসহ যারা ই এ বিতর্কে জড়িয়েছেন তাদের ঠিক হবে না । কারণ বিচার বিভাগের প্রতি অনাস্থা তৈরি হলে তা দেশের জন্য মারাত্মক সর্বনাশের কারণ হবে। আদালতের রায় নিয়ে রাজনীতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজনে আদালতের এই রায়কে যদি মোকাবিলা করতে হয় তবে তা আদালতে আইনগতভাবে মোকাবিলা করাই হবে সঠিক পথ । রাজ পথে নেমে পেশিশক্তির মাধ্যমে মোকাবেলার পায়তারা দেশের সাধারন মানুষের কাছে কখনোই গ্রহনযোগ্য নয় বা হবে ও না।