ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

সঙ্গীতশিল্পী স্বীকৃতিকে আমি চিনি না, ওনার গান শুনিনি, সত্যি বলতে নামটাও জানলাম মাত্র কয়েকদিন আগে। এই পোস্টে স্বীকৃতি একটা বাহানামাত্র। যদিও আলোচনাটা শুরু করবো তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া একটা মর্মান্তিক ঘটনা, এবং সেটাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া কিছু ব্যাপার উল্লেখ করেই। আমার এই পোস্টটি স্বীকৃতি’র পড়ার সম্ভাবনা খুব কম, এবং এটা মোটেও তাঁকে আঘাত করার জন্য লিখা না, তবুও তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েই পোস্টটি লিখছি।

কয়েকদিন আগে দেশের অনেক পত্রিকায় এসেছে সঙ্গীতশিল্পী স্বীকৃতির ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার খবরটি (ক্যান্সারে আক্রান্ত সঙ্গীতশিল্পী স্বীকৃতি)। উন্নত চিকিৎসা পেতে আর্থিক সাহায্যের জন্য তাঁর আবেদনও পত্রিকায় এসেছে (সন্তানের জন্য বাঁচতে চান কন্ঠশিল্পী স্বীকৃতি)। এরপর থেকে ফেইসবুকে অনেকের, বিশেষতঃ সঙ্গীতাঙ্গনের মানুষদের নানা রকম মন্তব্য এসেছে – সাহায্যের আবেদন, ক্ষোভের কথা এসেছে। নিজের পেশার মানুষের প্রতি কিছু বেশী আবেগ থাকা আমাদের সমাজে নিয়ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তাই এটা মেনেই নেয়া যায়, স্বীকৃতির পাশে আর্থিকভাবে তাঁরা দাঁড়াবেন, দাঁড়িয়েছেনও তাঁরা।

কিন্তু এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না, সমাজে দীর্ঘদিন থেকে থাকা কিছু ভ্রান্ত ধারণাকে তাঁরা আবার উস্কে দিচ্ছেন। অনেক শিল্পীকে এটা বলে ক্ষোভ দেখাতে – শিল্পীকে কেন চিকিৎসার জন্য হাত পাততে হবে? কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের উচিৎ তাঁর পাশে দাঁড়ানো। স্বীকৃতি নিজেও সরকারের কাছে এই আবেদন জানিয়েছেন (প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহযোগিতা চাইছি)। এটা সবসময়ই দেখি, কোন শিল্পী অসুস্থ হলে, অস্বচ্ছল হলে সরকারের কাছে সাহায্যের দাবি জানানো। আর সরকারও প্রায় সব ক্ষেত্রেই সেই আবেদন কবুল করেন। এসবের মূলে একটা ধারণা কাজ করে যেটা মানুষের মধ্যেও সাফল্যের সাথে ঢুকিয়ে দেয়া গেছে – শিল্পী/সাহিত্যিকদের মূল্য, মর্যাদা অন্য যে কোন পেশার চাইতে বেশী হওয়া উচিৎ।

মূল্য মূলতঃ একটা পারসেপশন। মূল্য আসলে তৈরি করা হয়। বলা বাহুল্য, তথ্যের এই যুগে এই মূল্যটা তৈরি করে মূলত মিডিয়া। মিডিয়া আমাদেরকে জানায়, একজন ক্রিকেটারের মূল্য একজন রিক্সাচালকের চাইতে বেশী; একজন সঙ্গীতশিল্পীর মূল্য একজন গৃহকর্মীর চাইতে অনেক বেশী। দিনের পর দিন এই চর্চার ফলে আমাদের মনের মধ্যেও এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের রাষ্ট্র যখন কোন রুগ্ন/সম্বলহীন শিল্পী-সাহিত্যিকের পাশে আর্থিক সাহায্য নিয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা সেটা মন থেকে মেনে তো নেই ই সেটার জন্য সরকারকে সাধূবাদও দেই।

প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক, কেন শিল্পী/সাহিত্যিকদের আলাদা মূল্যমান থাকবে? অর্থনীতির ব্যাসিক থেকে আমরা জানি, সমাজে বিক্রি হয় দুই রকম জিনিষ – পণ্য আর সেবা। মানুষ তার পছন্দ এবং সক্ষমতা অনুযায়ী পণ্য বা সেবা নিয়ে বাজারে যায়, সেটা বিক্রি করে জীবিকা অর্জন করে। শিল্পী/সাহিত্যিকরা বাজারে তাঁদের সেবা নিয়ে যান, বিক্রি করেন, সেটার নগদ বিনিময় পান। তাঁদের সাথে একজন ব্যাংকার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, দোকানের কর্মচারী, রিক্সাচালক, গৃহকর্মীর পার্থক্য কোথায়? তাঁরাও তো সমাজে সেবা বিক্রি করেন।

পুরো চিকিৎসা করাতে না পারলেও স্বীকৃতি তো তাও ক্যান্সারের ডায়াগলসিসের জন্য ব্যাঙ্ককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে যেতে পেরেছেন। অথচ এই দেশে আমমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী মানুষের জন্য বামরুনগ্রাদ যাওয়া দূর কল্পণা, সরকারি একটা হাসপাতালে গিয়ে ন্যুনতম চিকিৎসা পাওয়াই সম্ভব হয় না। তাদের কন্ঠ মিডিয়ায় আসে না, তাদের আবেদন প্রধানমন্ত্রী দূরেই থাকুক, একজন সরকারী ডাক্তারের কানেও পৌঁছে না।

মানুষের মর্যাদা, মূল্য নিয়ে এই বৈষম্য করার কয়েকটা খুব খারাপ দিক আছে সমাজের জন্য। আমাদের সমাজে কিছু মানুষের পেশার যেহেতু কোন মূল্য দেয়ার চেষ্টা করি না, তাই সেই মানুষগুলো আমাদের কাছে ন্যুনতম সন্মান পাওয়া দূরেই থাকুক, তাচ্ছিল্য আর দুর্ব্যবহারের শিকার হয়। এজন্যই না খেয়ে না দেয়ে আমাদের এই প্রচণ্ড ঘনবসতির দেশটাকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে দেয়া কৃষক পেশাটা আমাদের কাছে গালিতে পরিণত হয়েছে – ‘চাষা’। এজন্যই অমানুষিক পরিশ্রম করে আমাদেরকে বয়ে নিয়ে চলা রিক্সাচালকদের সাথে আমরা কথায় কথায় দুর্ব্যবহার করি, দেই চড় থাপ্পড়ও। এজন্যই আমাদের বাসায় কোন নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা এবং সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া কাজ করা গৃহকর্মীর গায়ে থাকে আমাদের অত্যাচারের দাগ।

আমি জানি কেউ কেউ খুব সহজে অর্থনীতির চাহদা-যোগান তত্ত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইবেন বাজারে অন্যসব পেশার চাহিদার তুলণায় যোগান বেশী, তাই ওটার মূল্য কম। কথা সত্যি, এই কারণেই তো কিছু কিছু শিল্পী/সাহিত্যিক/খেলোয়াড় উপার্জনে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে রাজকীয় জীবনযাপন করেন। তাহলে তো সেই যুক্তিতে বলাই যায়, এই বাজারই নির্ধারণ করছে স্বীকৃতি বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ডায়াগনোসিস করাতে পারার সামর্থ্য অর্জন করবেন, পুরো চিকিৎসা নিতে পারবেন না। এই পেশারই অন্যদিক দেখা যাক, স্বীকৃতি তো তাও দেশের সব মিডিয়ায় দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত যায়গায় যেতে পেরেছেন, কিন্তু এই দেশের কত অসংখ্য শিল্পী জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেও খেয়ে পরে থাকতেই পারছেন না ঠিকমত। কবীর সুমন যথার্থই বলেছিলেন – “সুনীল গাঙ্গুলীর দিস্তে দিস্তে লেখা, কত কবি মরে গেল চুপিচুপি একা একা”। এটাই বাজার।

এই বাজারে একজন শিল্পী/সাহিত্যিক/খেলোয়াড় জেনে শুনেই আসেন এখানে কী হতে পারে সম্ভাব্য পরিণতি। মানি, এসব পেশায় ঝুঁকি বেশি, কিন্তু ঝুঁকি বেশী বলে এখানে কেউ কেউ যে পরিমাণ আর্থিক এবং সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জন করতে পারেন সেটা অবিশ্বাস্য। এসব সেক্টরে আসা অনেকের বিক্রি করার মত এই একটি দক্ষতাই হয়তো আছে। আবার অনেকেই অন্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এসব সেক্টর বেছে নেন। তিনি এই সিদ্ধান্ত সচেতনভাবেই নেন এটা জেনে যে, এই সেক্টর অনিশ্চতায় পরিপূর্ণ। তাই পর্যাপ্ত টাকার অভাবে শিল্পী/সাহিত্যিকদেরকে চিকিৎসার জন্য কেন অন্যের কাছে হাত পাততে হবে কেন, এই ধরণের কথা বলে রাগ-ক্ষোভ দেখানোর কিছু নেই। মিডিয়ায় নিজেদের খবর দেখে, মানুষের হাততালি শুনে, রাস্তায় মানুষদের আগ্রহের দৃষ্টি পেয়ে এই পেশাগুলোর মানুষদের বাজারের এই চরিত্র ভুলে যাওয়া চলবে না।

কোন পেশার একজন মানুষের কোন রকম ক্রাইসিসে কেউ ব্যক্তিগতভাবে বা তাঁর পেশার মানুষরা আর্থিকভাবে দাঁড়াতেই পারেন, কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আর্থিক সাহায্য দেয়াটাকে আমি ভীষণভাবে অনৈতিক বলে মনে করি। জনগণের টাকা যদি সাহায্য দিতেই হয়, তাহলে সেটা পাওয়ার অধিকার রাখে সমাজের সবচাইতে প্রান্তিক মানুষগুলো। যে রাষ্ট্রে চিকিৎসার অভাবে সাধারণ সংক্রামক এবং অন্যান্য প্রতিকারযোগ্য ব্যাধিতে অসংখ্য মানুষ মারা যায়, সে দেশের একজন নাগরিকের জন্য বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার প্রত্যাশা করাটাই অন্যায়, এবং চরম স্বার্থপরতা।

কিন্তু হতাশার কথা হল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে থাকা মানুষগুলো ক্রমাগত পপুলিস্ট আচরণ করে যান – শিল্পী/সাহিত্যিকদের আর্থিক সাহায্য দিয়ে। হুমায়ুন আহমেদের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে তাঁকে দেখতে গিয়ে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। জনগণের টাকা তিনি এমন একজন মানুষকে দিয়ে অপচয় করেছিলেন, যিনি লিখালিখি করে অবিশ্বাস্য পরিমাণ ধনী হয়েছিলেন – বিখ্যাত লেখক সমরেশ মজুমদারের ভাষায় যিনি ‘রাজকীয় জীবনযাপণ করছেন’। এটা নিয়ে একটা পোস্টও লিখেছিলাম সে সময় – হায়! আমি হুমায়ূন আহমেদ নই!

আমাদের জোর গলায় এসবের প্রতিবাদ করতে হবে, কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা জনগণের। শুধুমাত্র এমন কোন কাজ যদি কেউ করেন, যেটা জনকল্যাণমূলক, এবং সেটা যদি হয় ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’, তেমন মানুষের পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াতেই পারে – মূল্যের বিনিময়ে যে কোন ধরণের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা কোন পেশার মানুষের পাশে নয়। হ্যাঁ, সব নাগরিকের জন্য মানসন্মত সরকারী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের পক্ষ থেকে চাপ জারি রাখতে হবে আমাদের পক্ষ থেকে।

এই বাস্তবতা যত তাড়াতাড়ি আমরা বুঝতে পারবো, তত দ্রুত আমাদের মধ্যে অন্যায়, অযৌক্তিক প্রত্যাশা তৈরি হবে না, রাষ্ট্রও জনগণের টাকার নয়-ছয় করতে দ্বিতীয়বার ভাববে। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার কোন ‘ভদ্রলোকী পেশা’ (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যাঙ্কার ইত্যাদি) বা ‘গ্ল্যামারাস পেশা (শিল্পী, সাহিত্যিক, খেলোয়াড় ইত্যাদি) কৃষক, রিক্সাচালক, গৃহকর্মীর পেশার চাইতে টাকা উপার্জনে বড় হতে পারে, মর্যাদায় নয়।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77