ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

ভীষণ রকম ক্রিকেটিয় ডামাডোলের মধ্যেও সোহাগী জাহান তনু’র হত্যা কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের; এখনো কেঁপে চলছি আমরা। আমাদের চোখের সামনে যখন সেনানিবাস হয়ে উঠে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র’, আর সেই ‘রাষ্ট্র’ এর সামনে যখন নতজানু খোদ আমাদের সরকার তখন তো কেঁপে ওঠার কথাই আমাদের।

নানা দিক থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা হলেও আমার বিবেচনায় তনু হত্যা অনেক কাল আমাদের কাছে থেকে যাবে এখনকার মিডিয়া আর অনাগত মিডিয়ার স্বরূপ বোঝার ঘটনা হিসাবে। কাউকে কাউকে বিষয়টা হালকাভাবে উল্লেখ করতে দেখেছি, তবে বিষয়টার গভীরে তেমন কাউকে যেতে দেখিনি, তাই এই পোস্ট লিখার ইচ্ছে হলো।

ধর্ষণ আর হত্যার ঘটনা দীর্ঘদিন থেকেই আমাদের ‘খবর-খাদ্য’। অতি দরিদ্র পরিবারের ‘ফকিন্নি’ না হলে আমাদের মূল ধারার মিডিয়া এসব খবর আমাদের খাওয়ায় খুব। আর সেই ঘটনা যদি হয় সেনানিবাসের মতো এলাকায় সেটা তো তাহলে খাদ্য মূল্যে হবার কথা আকাশচুম্বী। কিন্তু আমরা দেখলাম মূল ধারার সব মিডিয়া, প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক এই দারুণ খবরটা স্রেফ চেপে গেল। খবরটা প্রথম পরিবেশন করলো সামাজিক মিডিয়া, আর কিছু অখ্যাত অনলাইন সংবাদ সংস্থা। বিষয়টা নিয়ে আমাদের অনেক বিশ্লেষক এক ধরণের বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আমি কিন্তু অবাক হইনি এক বিন্দুও, বরং পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই, এর বিপরীত কিছু আমরা প্রত্যাশা করি কীভাবে?

ইন্টারনেট এর মাধ্যমে অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে প্রথাগত (যেটা এখন পর্যন্ত মূলধারা) মিডিয়া তার অস্তিত্ব কতটা রক্ষা করতে পারবে সেটা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রশ্নের জবাবটাও সম্ভবতঃ আমরা অনেকেই প্রায় নিশ্চিতভাবেই জানি – পারবে না।

গভীরভাবে তলিয়ে দেখতে গেলে দেখবো, প্রতিটি মূল ধারার মিডিয়া জন্ম নেয় তার বুকে ধ্বংসের বীজ নিয়ে। একটা পত্রিকা বা একটা টিভি চ্যানেল শুরু করার সময় অবিশ্বাস্য পরিমাণ বিনিয়োগ তো লাগেই, সাথে দরকার হয় বিরাট অংকের পরিচলন ব্যয়। এতো টাকা কেউ বিনিয়োগ করে মুনাফার জন্য সেটা বোঝার মতো ন্যূনতম কান্ডজ্ঞান আছে আমাদের। আর এটাও আমরা জানি মুনাফা আর আপোষ চলে হাত ধরাধরি করে। তাই প্রশ্ন আসবেই, একটা প্রথাগত মিডিয়া, যেটা স্রেফ একটা ব্যবসা, তার পক্ষে কতোটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখা সম্ভব?

সেটা যে আদৌ সম্ভব না, সেটা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের সামনে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। আর আমারদের মতো দেশে, যেখানে গণতন্ত্র বলে কিছুই নেই সেই দেশে এটা আরো অনিবার্য।

আমাদের দেশের মূল ধারার মিডিয়ার মালিক বড় বড় সব শিল্প গোষ্ঠী, যাদের আছে অন্য বহু ব্যবসা, আছে রাজনৈতিক ‘কানেকশন’। তাই বহু গুরুত্বপূর্ন খবর তাদের নিজের ব্যবসার বিরুদ্ধে যেতে পারে; যেতে পারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে। তাই অনেক ভালো ‘খামোশ’ হয়ে থাকা।

একটা উদাহরণ দেয়া যাক। দেশের একটা বড় ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট হতে পারে, দেশের ওষুধ বাণিজ্যের নৈরাজ্য নিয়ে। দেশের প্রেসক্রাইবড ওষুধের অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ (না, আপনি ভুল পড়ছেন না) একেবারে অপ্রয়োজনীয়। ওষুধ কোম্পানিগুলো ডাক্তারদেরকে নানা রকম উপহার (পড়ুন উৎকোচ) দিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরী করে রেখেছে। যার ভয়ংকর মাশুল দিচ্ছি, দেবো আমরা। মজার ব্যাপার এটা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট আমাদের মূল ধারার মিডিয়ায় দেখা যাবে না কোনভাবেই, কারণ আমাদের মূলধারার প্রধান মিডিয়ার অনেকেরই একক বা যৌথ মালিকানায় ওষুধ কারখানা আছে। সম্পূরক প্রশ্ন হতেই পারে যাদের ওষুধ কারখানা নেই, তারা কেন করছে না? উত্তর হলো তাদের অন্য ব্যবসা আছে এবং তাতেও খুঁজলে বহু ঘাপলা বের করা যাবে, তাই অপর পক্ষ তাদের ছেড়ে কথা কইবে না। কিছুদিন আগে দেশের অতি বৃহৎ দুই শিল্প গোষ্ঠী তাদের পত্রিকা দিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে কী যুদ্ধটাই না করলো। দু’জনেরই থলের কিছু বিড়াল যখন বেরিয়ে আরো অনেকগুলো বেরোনোর পথে, তখন তারা ক্ষান্ত দেয়।

এমনকি কেউ যদি শুধুমাত্র একটা পত্রিকা নিয়েই ব্যবসা করতে চায়, তার পক্ষেও সম্ভব না মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সব খবর নিয়ে আসতে, কারণ সে ব্যবসা করছে, তারও বিজ্ঞাপন লাগবে। গুরুত্বপূর্ণ খবরে বিজ্ঞাপনদাতা অসন্তুষ্ট হতে পারে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। এই দেশে মোবাইল ফোন চালু হবার পর থেকে দেশের সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করে এই দেশের কিছু ‘টাউট’কে সাথে নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা তারা বানিয়েছে অবৈধ ভিওআইপি থেকে। কিন্তু দেশের মূলধারার মিডিয়াগুলো বছরের পর বছর চুপ হয়ে ছিল কয়েক কোটি টাকার বিজ্ঞাপণ হাত ছাড়া হয়ে যাবে এই ভয়ে।

এদিকে মূল ধারার মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করা মানে অনেক বেশি হারানোর ঝুঁকি তৈরী হওয়া। তাই ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে যাওয়া অনেক সময়ই সহজ হয় না। একই মালিকের দেশের শীর্ষস্থানীয় দুইটি পত্রিকা কিছুদিন ধরে সরকারের নানা চাপে ‘দৌড়ের ওপরে’ আছে। বিজ্ঞাপন দাতাদের চাপ দিয়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ থেকে শুরু করে সারা দেশে মামলা করে বহু কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করানো পর্যন্ত সবই হচ্ছে। মজার ব্যাপার, এরপর থেকে অন্তত বাংলা দৈনিকটিতে (ইংরেজিটা দেখা হয়নি) সরকারের সমালোচনা আগের চাইতে কমেছে, বা সমালোচনা হলেও ভাষাগত তীব্রতা কমেছে অনেক।

এবার আসা যাক তনু’র ঘটনায় – এতো ‘গরম’ খবর দিব্যি চেপে গেল আমাদের মূল ধারার মিডিয়া। আবারো বলছি, এটাই হবার কথা ছিল। মিডিয়ায় এবং অন্যান্য ব্যবসায় অনেক বড় অংকের বিনিয়োগ করে সেনাবাহিনীর মতো অনেক বড় শক্তির বিরুদ্ধে লাগতে যাওয়াটা স্রেফ ‘নির্বুদ্ধিতা’। এই দেশের ভ্যাট/ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া থেকে শুরু করে অসংখ্য অনিয়মের পাঁকে পড়ে আছে আমাদের শিল্প গোষ্ঠীগুলো। তাই চাইলে ওদের ‘সাইজ’ করা খুব একটা কঠিন না ক্ষমতাশালীদের পক্ষে।

এই পরিস্থিতিতেই আমাদের দেশে দারুণ কাজ করে দেখালো ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এবং সোশ্যাল মিডিয়া; পরিভাষিকভাবে যাদের আমরা এখন বলছি ‘নিউ মিডিয়া’। কী দ্রুত বেগেই না এটা মানুষের সামনে তনু হত্যাকে নিয়ে আসলো, মানুষকে প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিলো। প্রশ্ন হলো, কেন এই মিডিয়া ক্ষমতাশালীদের রক্তচক্ষুকে অনেক কম পাত্তা দেয়? কারণ হারানোর ভয় কম। এই মিডিয়ায় বিনিয়োগ নেই প্রায়, পরিচলন ব্যয় প্রায় ক্ষেত্রেই নেই, তাই তাদের পক্ষে আপোষহীন হওয়া অনেক সহজ। হারানোর ভীতি যেখানে যতো কম, বস্তুনিষ্ঠতা সেখানে ততো বেশী থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

বলা বাহুল্য তনু-হত্যার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ আমাদের মূল ধারার মিডিয়ার মৃত্যুঘন্টা বাজার ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। প্রথাগত মিডিয়ার গুরুত্ব কমার মধ্যে ‘নিউ মিডিয়া’ই যে ভবিষ্যতের মূল মিডিয়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটা বেশ আগেই বুঝেছে আমাদের ধূর্ত সরকারের ধূর্ত তথ্যমন্ত্রী। তাই দেখবো ক্রমাগত নানা রকম ফন্দি করে এই মিডিয়াকেও লাগাম পরানোর চেষ্টা হচ্ছে। অনলাইন সংবাদ সংস্থার নিবন্ধনের চাপ তৈরী হচ্ছে, আইসিটি এক্ট এ অনলাইন প্রকাশনার জন্য কঠোর সব শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে – অনেক ক্ষেত্রেই সেই শাস্তি প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত একই খবরের চাইতে বেশি। আর ফেইসবুক স্ট্যাটাসের জন্য কথায় কথায় ধরে নিয়ে গিয়ে, কারাদন্ড দিয়ে ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’ তো চলছেই। ‘নিউ মিডিয়া’ অতি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার লক্ষণ না দেখলে সরকার এতো কিছু করতে যেত না নিশ্চয়ই।

মানি, একটা নতুন প্রযুক্তি যখন খুব দ্রুত মানুষের হাতে চলে যায়, তখন সংবাদের নামে অনেক জঞ্জালও তৈরি হয়; তাই অন্তত আমাদের দেশে এই ‘নিউ মিডিয়া’ তথ্যকে বস্তুনিষ্ঠতার কাছাকাছি রাখতে পারবে কিনা সেটা একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হতেই পারে। আমি বিশ্বাস করি, সময় গেলেই মানুষ আস্তে আস্তে বুঝে জেতে পারবে কোথায় জঞ্জাল তৈরি হয় আর কোথায় হয় না – তাই সঠিক জিনিষ ছিনে নিতে মানুষ শিখে যাবে অচিরেই। যতো দ্রুত এটা হবে ঠিক ততো দ্রুত মৃত্যুঘন্টা বেজে যাবে প্রথাগত মিডিয়ার।

শেষ প্রশ্ন, প্রথাগত মিডিয়াকে কি বাঁচানো যাবে না? আমার কাছে উত্তর হল, ‘না’, এটা নিয়ে তর্কও হতে পারে না, তবে এটা নিয়ে তর্ক হতেই পারে ওই মিডিয়ার মৃত্যুটা হতে পারে কবে নাগাদ সেটা নিয়ে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77