ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

কাল রাতে বাসায় ফেরার সময় দেখলাম কত্তো রাস্তায় হরেক রঙের বাতির আলোকসজ্জা, কত্তো তোরণ, বিরাট সব ব্যানার, দানবীয় ছবি, শোলার মূর্তি, এলইডি ডিসপ্লে; আর ভেন্যু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে তাকালে তো আক্ষরিক অর্থে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বলাই যায়, অতি পরাক্রমশালী দলটি এভাবেই ‘কাউন্সিল’ করে প্রকাশ করছে তার আন-চ্যালেঞ্জড ক্ষমতার দম্ভ।

 

দেখে হাসি পায়। এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কাউন্সিলের নামে যা করে, সেই ফাজলামোর জন্য এতো কিছু? নাকি জাঁকজমক করে মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে কাউন্সিলের নামে ফাজলামোটার মূল আলোচনাটাকে আড়াল করা? এই উদ্দেশ্য অনেকাংশেই সফল – পত্রিকা আর টিভির রিপোর্টে এখন কেবলই তথাকথিত কাউন্সিলে কত রাস্তায় আলোকসজ্জা হলো, ঢাকার হোটেলে রুম খালি পাওয়া যাচ্ছে কিনা, কত ফুট বই কতো ফুটের নৌকা-সদৃশ মঞ্চ হলো, খরচ হলো কতো টাকা, কাল কোন কোন রাস্তা বন্ধ থাকবে এসব নিয়েই রিপোর্ট।

 

অথচ এই তথাকথিত কাউন্সিল মানে তো সেই পুরোনো ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’ – দেশের নানা প্রান্ত থেকে তথাকথিত কাউন্সিলররা আসবে, আর এসে ভুরিভোজ করতে করতে তাদের কাজ হবে বলে দেয়া যাবতীয় পদে নিয়োগের দায়িত্ব তারা অর্পণ করছেন তাদের সভানেত্রীর হাতে। এরপর একটা কমিটি ‘নাজিল’ হবে যেখানে এক ব্যক্তির কথাই শেষ কথা। এই তো ক’দিন আগে বিএনপি’র তথাকথিত কাউন্সিলেও দেখা গেছে একই চিত্র – পার্থক্য হলো দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি’র অনুষ্ঠানটা ছিল আওয়ামী লীগেরটার জৌলুসের তুলনায় একেবারেই দীন-হীন।

 

এসব তথাকথিত কাউন্সিলের নামে সীমাহীন অপচয় আর মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ কেন ডেকে আনা হবে সেই আলোচনা করছে খুব কম মানুষই। একটা দলের কাউন্সিলে এতো ঘনবসতির একটা শহরের বেশ কিছু রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে দুইটি দিন যে মানুষের চরম দুর্ভোগ তৈরি করা হবে সেটা কেন? – এই প্রশ্ন তো জোরেশোরে উঠতে দেখছি না আমি! ‘কাউন্সিল’ এর দুই দিনের একদিন ছুটির দিন হলেও দুই কোটি মানুষের এই শহরে কি অসংখ্য মানুষ ছুটির দিনেও জরুরি প্রয়োজনে বের হয় না? আর একদিন তো রীতিমতো কর্মদিবস। মানুষের এই ভোগান্তির মাশুল কে দেবে? আমরা কি তাহলে মেনেই নিয়েছি, যে ভূখণ্ডে আমাদের বসবাস সেটা আর গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র নয়, এটা ইচ্ছে হলে যাচ্ছেতাই করতে পারে এমন সম্রাজ্ঞীদের দ্বারা পালাক্রমে শাসিত রাজ্য?

 

এই তথাকথিত কাউন্সিলের খরচ নিয়ে বিএনপি চিঁ চিঁ স্বরে প্রশ্ন তুলেছিল। ওদের এই স্বরই স্বাভাবিক – ক্ষমতায় থাকলে ওরা কী করে, সেটাও আমরা জানি। তাই এরকম প্রশ্ন তোলার কোন নৈতিক অধিকার নেই ওই দলটির। কিন্তু আমরা যারা ‘সচেতন’ নাগরিক সমাজের অংশ, তারা কেন খুব জোর দিয়ে এই ভয়ংকর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না? কেন জানতে চাইছি না এই টাকার উৎসের কথা? আমরা সব জানি তাই আর ওসব কথা তুলি না?

 

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শেয়ার মার্কেট লুট, ব্যংক লুট আর ৩/৪ গুন খরচে তথাকথিত উন্নয়নের নামে হরিলুট করে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা স্রেফ মেরে দেয়া হয়েছে। গড়ে এই দেশ থেকে বছরে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়; এর মধ্যে এক ২০১৩ সালে পাচার হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা! (বিস্তারিত পড়ুন)। লুটপাটের মচ্ছব থেকে বাদ যায়নি হতো দরিদ্রের জন্য বরাদ্ধকৃত ১০ টাকা কেজি’র চালও। দেশের প্রতিটি সংবাদ সংস্থায় এই ১০ টাকার চাল নিয়ে অসংখ্য অনিয়মের কথা এসেছে।

 

সব সেক্টরের সেই লুটের টাকায় আজ আমাদের দেখানো হয় নোংরা জৌলুস (বিস্তারিত পড়ুন)! এই জৌলুস দেখতে দেখতে আমরা এখন আর প্রশ্ন তুলি না, ৬৭ বছর যে রাজনৈতিক দলের বয়স তার মধ্যে আজও কেন কোন রকম অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই? এরকম একটা দলে কীভাবে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে? কীভাবে আমরা আশা করি এদের মতো দল দিয়ে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হবে? কোন রকম রাজনৈতিক দৃশ্যপটে না থাকা প্রধানমন্ত্রীর কন্যা আর শেখ রেহানা এবং তাঁর পুত্র কোন বিবেচনায় কাউন্সিলর হন? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন এর মতো করে কেন বলি না, ‘রাজনৈতিক দল কোন প্রাইভেইট লিমিটেড কোম্পানি হতে পারে না’?

 

আজ রাতে বাসায় ফিরে নানা রঙের চোখ ধাঁধানো বাতির আলোকসজ্জা দেখে মনে মনে ভাবছিলাম ‘লাল-লাল, নীল-নীল বাতি দেইখা নয়ন জুড়ানোর’ গান যে কালে হয়েছিল, আজকের ঢাকা দেখলে সেই গান কেমন হতো? আমার কিন্তু গা জ্বালা করেছে, তাই আমার মনে সেই বিখ্যাত গানের বিখ্যাত বাক্যটা যেভাবে বেজেছিল সেটাই লিখেছি শিরোনামে। আমার পরানের এই জ্বলুনি হয়েছে এটা দেখে যে দু’টো দল মিলে একটা দেশকে মগের মুলুক বানিয়ে ফেলেছে; এই জ্বলুনি হয়েছে এটাও বুঝে যে আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকরা সব সর্বংসহা হয়ে গেছে; আমাদের গায়ে এখন আর কিছুই লাগে না।

 

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77