ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

‘এই দেশের হিন্দুরা ভারতে এক পা দিয়েই রাখে’ ছোটবেলা থেকে এরকম একটা কথা চারদিকে শুনতাম কারণ এই দেশকে হিন্দুরা নাকি নিজের দেশ মনে করে না। এমনকি ‘হিন্দু’ শব্দটিও খুব কমই শুনতাম, বিভৎস সব শব্দ দিয়ে এই সম্প্রদায়ের মানুষদের বোঝানো হতো। এগুলো মোটামুটি প্রকাশযোগ্য কথা, বলাই বাহুল্য ছিলো আরো অনেক প্রকাশ অযোগ্য কথাও।

চারপাশের কথা শুনতে শুনতে স্কুলের নিচু ক্লাসগুলোতে এক রকম বিশ্বাসই হতো কথাগুলো; হিন্দু বন্ধুদের ওপর অভিমান করতাম – তারা কেন এই দেশকে ভালোবাসে না, নিজের দেশ বলে মনে করে না। বেড়ে উঠতে শুরু করার পর স্কুলের উঁচু ক্লাসগুলো থেকেই বুঝে উঠতে শুরু করি কতটা সমস্যায় পড়লে কিছু মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমায়, তাও এমন একটা দেশে, যেখানেও তাঁদের খুব একটা স্বাগত জানানো হয় না।

পরবর্তী আলোচনায় যাবার আগে এই দেশের হিন্দুদের জনসংখ্যার অনুপাতে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারির ১৩.৫ শতাংশ থেকে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এসে দেশে হিন্দু জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮.৪ শতাংশে। এখন হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত কতো? বলা মুশকিল। আমাদের দেশে প্রতিটি আদমশুমারি করা হয় ১০ বছর পর পর, মানে, আগামী আদমশুমারির সাল ২০২১। তবে মাঝামাঝি সময়ে ‘স্যাম্পল ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিকস’ নামে একটা জরিপ করা হয়, সেখানে অবশ্য দেখা যায় এক অবিশ্বাস্য হাস্যকর তথ্য – ২০১৫ সালে নাকি হিন্দু জনসংখ্যা হয়েছে ১০.৭ শতাংশ (বিস্তারিত পড়ুন)! ২০১৪ সালের নির্বাচন এই সরকারের স্বভাব খারাপ করে দিয়েছে; যাচ্ছেতাই সংখ্যা বলে দেয়া যায় – ২০১৪ সালে ১৪৭ টা আসনের নির্বাচনে (১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত) নাকি প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি ভোট পড়েছিলো!

এই দেশে সব সরকারের সময় গোপন নিপীড়ন তো আছেই, এই দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরণের আক্রমণের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত বিরতিতে। কিছুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনা এই বিষয়ে আলোচনা আবার সামনে এনেছে। নানামুখী আলোচনা-বিশ্লেষণ চলছে মূলধারার মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেক ‘সুশীল’ আমাদের নানা চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সরকারকে। হাসি পায় শুনে – তাঁরা ধর্মের কাহিনী শোনাচ্ছেন সরকার নামের ‘চোর’ কে। এই ‘চোর’ ধর্মের কাহিনী যদি শুনতো, তাহলে কি স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দুই-তৃতীয়াংশ হিন্দু এই দেশ ত্যাগ করতো না। আর গত আট বছর ধরে তো রীতিমত ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষের’ এবং এর আগে ১৯৯৬ সালের পর আরও পাঁচ বছরও ছিল তাদের সরকারই।

১৯৯১ আর ২০০১ সালের আদমশুমারি তুলণা করলে দেখা যায়, এই দশ বছরে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত আড়াই শতাংশ কমেছে। এই দশ বছরের অর্ধেকটার সময় তো ছিল তথাকথিত স্বাধীনতার স্বপক্ষের আর ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আওড়ানো সরকার। আজও এই সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ, নির্যাতন, জমি দখল বন্ধ তো হয়ইনি, বরং নানা ক্ষেত্রে বেড়েছে। একটানা আট বছর ক্ষমতায় থেকেও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন এর অগ্রগতি আদৌ কতোটা হয়েছে, সেটাও দেখেছি আমরা।

আমি অবাক হই এখনও এই দেশের হিন্দুদের অবিশ্বাস্য রকম ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ ধরণের কথা বলতে দেখে। এখনও তাঁরা কথা বলেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে; আওয়ামী লীগ এখনও তাঁদের কাছে ভাসুর, সরাসরি নাম নেয়া যাবে না! তাঁরা স্পষ্টভাবে বলেন না কেন, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যেই হোক না কেন, লুটপাট করা ছাড়া তাদের কোন রাজনীতি নেই, তাই হোক হিন্দু কিংবা অন্য কোন দুর্বল মানুষ, তাকে লুট করতে দু’দলই সমান আগ্রহী, পারদর্শী। তাঁরা কেন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন না, এই দেশে স্বাধীনতার স্বপক্ষের, স্বাধীনতার চেতনা ধারণকারী কোন রাজনৈতিক দল নেই। মুখে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা আওয়ামী লীগ কোনভাবেই স্বাধীনতার চেতনাধারী দল নয়। হলে কি এই দেশে হিন্দুদের এই অবস্থা হয়?

এবার আসি ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ এর কথায়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই দেশের হিন্দুরা নির্বাচনের সময় দীর্ঘকাল থেকেই আওয়ামী লীগকে সব ভোট দেবার ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে রাখেন আওয়ামী লীগের জন্মের পর থেকেই। তাঁদের এই প্রবণতাই একটা ঐতিহাসিক বোকামী, যেটা আজ তাঁদের জীবনে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অথচ তাঁরা হতে পারতেন এই দেশের সরকার গড়ার নেপথ্য কারিগর। কীভাবে, সেই আলোচনায় পরে আসছি।

‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্দশার জন্য দায়ী, সেটা ব্যাখ্যা করার আগে আমাদের দেশের তথাকথিত রসজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র একটু বুঝে নেয়া যাক। এই দেশের একজন অতি আহাম্মকও মনে করে না, এই দেশে প্রকৃত কল্যাণমুখী কোন রাজনৈতিক দল আছে। দুইটি দল পাল্টাপাল্টি করে ক্ষমতায় আসে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সীমাহীন লুটপাট চালিয়ে যেতে। এর মধ্যে তথাকথিত কিছু ‘উন্নয়ন কর্মকান্ড’ দেখাতে হয়, কারণ এসব দেখিয়ে জনগণকে বোকা বানানো যায়, আর মূল উদ্দেশ্য হলো তিন/চার গুন খরচ দেখিয়ে এসব থেকে লুটপাট করা। আর কিছু ‘ভালো’ কাজও করতে হয় ‘ঠেলার নাম বাবাজি’ এই আপ্তবাক্যের সার্থকতা প্রমাণ করতে। অর্থাৎ পাল্টাপাল্টি করে ক্ষমতায় আসা এই দেশের কোন দল তার গোষ্ঠী স্বার্থের বাইরে কোন কাজ করবে না।

এখন এখন প্রশ্ন হলো, বহু আগেই একটা দলকে ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দিয়ে রাখা এই দেশের হিন্দু সমাজ কী করে মনে করে যে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘ঠেলা’ দেবার ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে? হিন্দুদের ক্ষেত্রে বিএনপি’র মনস্তত্ত্ব পরিষ্কার – হিন্দুদের ভালো/খারাপ যায় করুক তারা, ভোট তো আর পাবে না, সুতরাং তাদের খেদিয়ে জায়গাজমি দখল করাই সই। ওদিকে আওয়ামী লীগ ভাবে, তাদের আমলে হিন্দুদের যাই হোক না কেন, তারা আওয়ামী লীগকে ভোট না দিয়ে যাবে কই? সুতরাং তাদের খেদিয়ে জায়গাজমি দখল করাই সই। এজন্য আম-আওয়ামী লীগার তো বটেই এই সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অতি কাছের আত্মীয়ের বিরুদ্ধেও হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করার শক্ত অভিযোগ দেখি আমরা।

কয়েকটি জেলায় ঘনত্ব কিছুটা বেশি হলেও এই দেশের হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় সমভাবে বন্টিত আছে বিভিন্ন জেলায়। এই দেশের মোট হিন্দু জনসংখ্যাকে সংসদের আসন সংখ্যা ৩০০ দিয়ে ভাগ দিলে সংখ্যাটি হয় প্রায় ৫০ হাজার। আর বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ষাট ভাগের মতো ভোটার ধরলে প্রতিটি আসনে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা হয় প্রায় ৩৬ হাজার। এই দেশের অনেক আসনে যখন ৫-২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়, তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট একটা বড় নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারতো। কিন্তু সেটা এই দেশে হয়নি।

এবার একটু ভারতের দিকে তাকানো যাক। সুদূর অতীত থেকে অন্ধভাবে কংগ্রেসকে ভোট দেয়া মুসলিমদের ভোট প্রদানের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে দ্বিগুণ সংখ্যক মুসলিম বিজেপি’র মতো প্রচন্ড হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলকে ভোট দিয়েছিল। পাশের রাজ্যেও কংগ্রেসকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া মুসলিমরা তৃণমূল কগ্রেসকে ভোট দিয়ে অনেক দিক থেকে তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছেন। চাকুরীর ক্ষেত্রে বৈষম্য এখনও খুব একটা না কমলেও নানাদিক মুসলিমদেরকে সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি – সাথে রমজানের সময় রোজা পালন করা, গীতা আর কুরআন দু’টোই সামনে রেখে শপথ নেবার মতো পলিটিক্যাল স্টান্ট তো আছেই।

এই আলোকেই বলতে চাই এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উচিত আওয়ামী লীগকে দেয়া ব্ল্যাঙ্ক চেকটি ফিরিয়ে নেয়া, এবং আগামী যে কোন নির্বাচনের আগে সমর্থনের বিনিময়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ দুই দলের সাথেই দরকষাকষি করা। এরপর দেখা উচিৎ তাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে কিনা। সেটা না হলে পরবর্তী নির্বাচনে ভিন্ন দলকে সমর্থন দেয়া উচিৎ। এভাবেই জাতীয় রাজনীতিতে হিন্দু সম্প্রদায় একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে, এবং শুধু এভাবেই তাঁরা তাদের স্বার্থ রক্ষা করার ব্যাপারে সরকারগুলোকে ঘাড় ধরে বাধ্য করতে পারবেন।

হ্যাঁ, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ঘাড় ধরে বাধ্যই করতে হবে, কারণ এই দেশের বিদ্যমান তথাকথিত রাজনৈতিক দল দু’টির (বা কোন একটির) কাছ থেকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ন্যায়ানুগ কোন পদক্ষেপ আশা স্রেফ আহাম্মকি।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77