ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২৭ নভেম্বর ঘটে যাওয়া ‘গরম’ খবরটা, যেটা নিয়ে মূলধারার মিডিয়া আর ফেইসবুক মেতে আছে এখনও, সেটা নিয়ে একটু পরেই কথা বলি। আগে একটু চোখ বুলিয়ে নিতে চাই ওই ঘটনার দুই দিন আগে, ২৫ নভেম্বর রাতের ‘ঠান্ডা’ খবরটায় – এক রাতেই তথাকথিত ক্রসফায়ার এ খুন হয়েছেন ছয়জন মানুষ (বিস্তারিত পড়ুন)। আজও ঢাকায় ক্রসফায়ারের নামে খুন করা হয়েছে দুইজনকে (বিস্তারিত পড়ুন)। হ্যাঁ, আমাদের কাছে ন্যূনতম সংবাদমূল্য না থাকা এসব খবর এখন ভীষণ ‘ঠান্ডা’ই বটে। এসব খবর হঠাৎ চোখে পড়লে আমাদের অনেকেই এখন আনন্দিত হই, কারণ ওই ক্রসফায়ারে মানুষ মরেনি মরেছে ‘ডাকাত’ কিংবা ‘সন্ত্রাসী’। এই বিষয়ে আবার পরে ফিরে আসছি।

 

এবার দেখি ২৭ নভেম্বরের ‘গরম’ ঘটনাটা – কলেজ জাতীয়করণের আন্দোলনে পুলিশি হামলায় ফুলবাড়ীয়ায় একজন শিক্ষক নিহত হয়েছেন। খবরটির উত্তাপ এতটাই যে, মূল ধারার প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খুব গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে, কলাম লিখা হচ্ছে। আর ফেইসবুক তো আছেই বরাবরের মতো নানা ‘দিকনির্দেশনা’ দেবার জন্য – এতে প্রতিক্রিয়ার ধরণ কেমন হওয়া উচিত ছিলো, কে কোন প্রতিক্রিয়া জানালো, বা জানালো না, সেসব নিয়ে কতো বাহাস! এটা স্পষ্ট, এই খবরটা আমাদের খুব স্পর্শ করেছে, আমরা ‘খেয়েছি’ খবরটা।

 

যাবতীয় কর্মকান্ড দেখে এই জাতির ‘পুরোনো রোগ’টি আবার সামনে আসলো। একেকটা ঘটনা ঘটে, আর আমি অবাক হয়ে দেখি একই চক্রে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি; আমরা কোন সমস্যার মূলে কোনদিন যাবার চেষ্টা করি না। আমরা উপসর্গ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করি, রোগ নির্ণয়ে ন্যূনতম আগ্রহ রাখি না, রোগ সরানোর চেষ্টা করা তো বহু দূরের কথা।

 

পুলিশ একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরেছে, আর এই আলোচনায় বার বার আসছে তাঁর শিক্ষক পরিচয়টি। এ আমাদের আরেক পুরোনো রোগ – কোন ঘটনায়/দুর্ঘটনায় কোন ব্যক্তি আলোচনায় আসলে, তার কোন বিশেষ পরিচয় থাকলে সেটা দিয়ে তার ‘ওজন’ বাড়ানোর চেষ্টা করা। ওইদিনই একজন ভ্যানচালককেও হত্যা করা হয়, তাকে নিয়ে কথা নেই আমাদের। একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখবো, আজ পর্যন্ত যত মরণব্যাধিতে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র/ছাত্রীর জন্য সাহায্য চাওয়ার আবেদন দেখেছি, সবক্ষেত্রেই তারা ‘মেধাবী’ ছিল। তার মানে কি ‘অমেধাবী’ ছাত্রের জীবন বাঁচানোর জন্য সাহায্য করতে আমাদের অনেকের মধ্যে তেমন কোন প্রণোদনা কাজ করে না?

 

আসুন, আপাতত সেদিন ফুলবাড়ীয়ায় পুলিশের হাতে খুন হওয়া মানুষটার শিক্ষক পরিচয়টা দিয়ে তাকে ‘উঁচুজাত’ বানানোর প্রচেষ্টাটা বাদ দেই। এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক সংবিধানস্বীকৃত একটা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে খুন হয়েছে। এরকম কিছু ঘটার অনেক সম্ভাবনা কি নেই এই দেশে? এটা কি আমাদের খুব গায়ে লেগে গেলো? নাকি গায়ে লাগার ভান করছি আমরা?

 

আমাদের দেশে কোন রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী নেই, আছে ক্ষমতাসীন দল অনুযায়ী আওয়ামী পুলিশ কিংবা বিএনপি পুলিশ। একটা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেটা ব্যবহৃত হয় মূলতঃ দল এবং গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে – এর চাইতে ভয়ঙ্কর আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটে চলেছে বছরের পর বছর।

 

খুব তুচ্ছ ঘটনায়ও পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের চেষ্টা সংখ্যায় এবং প্রাবল্যে ক্রমাগত বাড়ছেই। আর এর সর্বশেষ সংযুক্তিটি ছিলো গত বিএনপি আমলে পুলিশের অধীনেই র‍্যাব গঠন করে তাদেরকে মানুষ হত্যার লাইসেন্স দিয়ে দেয়া। আর বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিচারবহির্ভুত হত্যা বন্ধের ঘোষণা দিলেও এখন এর ‘মজা’ পেয়ে গেছে। এখন ‘বিশেষ বাহিনী’ র‍্যাব তো বটেই সাধারণ পুলিশও মানুষ খুন করায় র‍্যাবকেও টেক্কা দিচ্ছে। ক্রসফায়ারে খুন হওয়া মানুষগুলোকে অপরাধীর তকমা লাগিয়ে এইসব খুনকে ‘জায়েজ’ করার চেষ্টা আছে বাহিনী এবং সরকার এর পক্ষ থেকে। এই ব্যাখ্যায় তুষ্ট থেকে আমরা অনেকেই এই অনৈতিক, বর্বর খুনগুলোকে দারুণভাবে সমর্থন করি, আর বাঁকি প্রায় সবাই এক রকম মেনেই নিয়েছি।

 

একটা বাহিনী যখন ইচ্ছে হলেই যে কোন মানুষ (কোন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী-ডাকাত হলেও) এর প্রাণ নিয়ে ফেলতে পারে, তখন সেই বাহিনী আর কী কী করতে পারে সেটা বোঝার জন্য কি রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয়? এক যাত্রায় দুই ফল প্রত্যাশা করা স্রেফ আহাম্মকি।

 

ফিরে আসি শুরুর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা ঘটনায়। এই যে তিন দিনের মধ্যে আটজন মানুষকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেললো, সেটা নিয়ে আমরা কয়জন ন্যূনতম টুঁ শব্দটি করেছি? কেন করিনি? ওরা ডাকাত/সন্ত্রাসী হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কারণে? সত্যিসত্যি যদি কেউ ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীও হয়, তাকে পুলিশ মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে?

 

পুলিশই যদি বিচারও করে তাহলে দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আস্ত বিচার বিভাগ পোষার প্রয়োজন কী? সবকিছুর দায়িত্ব পুলিশকে ছেড়ে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেই পারি। অবশ্য আমরা দেই বা না দেই, সিনিয়র পুলিশ কর্তারা সেই দায়িত্ব নিজেরা নিচ্ছেন, আবার জনগণের মধ্যে দায়িত্ব বিলিবণ্টন করছেন – কেউ সন্ত্রাসীকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে বলছেন, আর কেউবা ডাকাতকে হাতে পেলে পিষে ফেলতে বলছেন (বিস্তারিত: লিঙ্ক-১,   লিঙ্ক-২,   লিঙ্ক-৩) অথচ এসব নিয়ে আমরা কথা বলছি না!

 

ফিরে আসি যে কোন ইস্যুতে আমাদের ‘পুরোনো রোগ’ এর কথায়। এই যে একটা কলেজকে সরকারিকরন এর একটা আন্দোলনে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে একজন শিক্ষককে মেরে ফেলা হলো, যেটা নিয়ে আমরা তুমুল ‘হাউকাউ’ করে যাচ্ছি, সেটা কিন্তু স্রেফ উপসর্গ। মূল রোগটা হলো পুলিশ বাহিনী নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবছে, যাচ্ছেতাই করেও পার পেয়ে যাবার আত্মবিশ্বাস তাদেরকে পেয়ে বসেছে।

 

পুলিশের এই রোগেরও কারণ আছে – পুলিশকে বছরের পর বছর অনিয়মতান্ত্রিক, অনৈতিক পথে ক্রমাগত ব্যবহার করেছে এই দেশের রাজনৈতিক দল নামের লুটেরা দলগুলো। আর বর্তমানে নৈতিকভাবে অবৈধ (হতে পারে আইনগতভাবে বৈধ) সরকারটি তো ক্ষমতায় টিকে আছে স্রেফ পুলিশ দিয়ে সব ভিন্নমতকে দমন করে। বিচার বহির্ভুত হত্যা তো আছেই, সাথে আছে ৫৪ ধারার যাচ্ছেতাই অনিয়ন্ত্রিত, অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার করে ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ এর শক্ত অভিযোগও।

 

যে বাহিনীর হাতে অস্ত্র আছে, যে বাহিনী আইনগতভাবে বল প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখে, সেই বাহিনী সেটা ঠিকভাবে করছে কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। এই বাহিনীর হাতে এমনকি ভয়ঙ্কতম কোন অপরাধীও যেন হত্যার শিকার না হয়, সেই চাপ জারি রাখতে হবে। কিন্তু আমরা যদি শুধু একজন শিক্ষক খুন হলে, কিংবা লিমনের মতো কোন নিরপরাধ ছেলে পা হারালেই দারুণ ‘বিবেকবান’ আচরণ করি, তবে সেটা ভন্ডামী। এই ভন্ডামীই আজ পুলিশকে যাচ্ছেতাই করতে প্ররোচিত করছে।

 

আলোচনার ক্যানভাস আর বড় করছি না, যদিও এটা আসলে আরও বড় একটা ক্যানভাসে আলোচনা করা উচিৎ, কারণ একটা ভীষণ দুর্নীতিপরায়ণ দেশে পুলিশকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনে করে সৎ, কর্তব্যপরায়ণ হওয়ার প্রত্যাশা করাও ভীষণ ভ্রান্ত চিন্তা। এটা নিয়ে অনেকদিন আগে একটা ব্লগ লিখেছিলাম, আগ্রহীরা পড়তে পারেন – পুলিশের কাছে আমার প্রত্যাশা সামান্যই, কারণ…

 

 

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77