ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
narayangan-ivy

এই দেশের রাজনীতি নামের ধান্দাবাজির জগতে রাজনীতিকের মুখোশে থাকা ধান্দাবাজদের মধ্যে যে দুই একজন বিরল প্রকৃত রাজনীতিক আছেন ডাঃ সেলিনা হায়াৎ আইভী তাঁদের মধ্যে একজন বলে বিশ্বাস করি আমি। তাই নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এর গত নির্বাচনটিতে যখন তিনি শামীম ওসমান নামের ‘দানব’টির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হন, তখন দেশের অনেক শুভবোধসম্পন্ন মানুষের মতো আমিও হয়েছিলাম দারুণ আনন্দিত। সেই জয় আর তার পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে আইভী’র কথা মাথায় রেখে অন্তত তিনটি পোস্ট লিখেছিলাম এই ব্লগেই – (১) আইভীর জয়ঃ জেগে ওঠার ডাক; (২) নারায়নগঞ্জ শিক্ষা হয়ে থাকুক দুই নেত্রীর কাছেই; (৩) কুসিক নির্বাচনঃ একজন আইভীর খোঁজে

নারায়ণগঞ্জ যখন পৌরসভা ছিল তখন দুই টার্ম আর সিটি কর্পোরেশন হবার পরে এক টার্ম মিলিয়ে আইভী নারায়ণগঞ্জ এর দায়িত্বে আছেন ১৩ বছর। অনেক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর কিছু ব্যর্থতাও আছে। কিছুদিন আগে একটা সাক্ষাৎকারে দেখলাম এই দেশের গতানুগতিক রাজনীতিকদের মতো নিজেকে শতভাগ সফল দাবি না করে আইভী নিজেই তাঁর কিছু ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন অকপটে; একজন সৎ রাজনীতিকের এটাই করার কথা।

নারায়ণগঞ্জবাসীকে দেয়া তাঁর প্রতিশ্রুতি কতোটা রক্ষা করতে পেরেছেন আর কতোটা পারেননি আইভী, সেই আলোচনায় যাচ্ছি না আমি, তবে নারায়ণগঞ্জবাসীর একটা ‘অলিখিত’ লাভ ভুলে গেলে চলবে না – গত নির্বাচনে শামীম ওসমান মেয়র নির্বাচিত হলে এমনিতেই ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ আখ্যা পাওয়া নারায়ণগঞ্জ এর অবস্থা কী হতে পারতো! শামীম ওসমান এর মতো ‘বুনো ওল’ এর বিপরীতে অনেকটাই ‘বাঘা তেঁতুল’ এর ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন আইভী।

যদিও আইভী’র সাথে হেরে যাবার প্রতিশোধ নানাভাবে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন শামীম ওসমান – প্রকাশ্যে বিষোদগার করা থেকে শুরু করে পোস্টার ছাপিয়ে পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন আইভীর পথে কাঁটা বিছাতে। শেষ চেষ্টা হিসাবে তো ছিলই নায়ারণগঞ্জ আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে প্রস্তাবিত তিন প্রার্থীর একজন হিসাবেও আইভীকে না রাখার মত নোংরা ধূর্ততা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সেই পরিস্থিতির অবসান হয়। এটা ভালো লক্ষণ, ভুল থেকে প্রধানমন্ত্রী শিখেছেন – আগেরবার আইভীকে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে করা ভুলের মাশুল দিয়েছিলেন মুখে শামীম ওসমানের যাচ্ছেতাই পরাজয় এর চুনকালি মেখে।

আইভীর রাজনীতির ক্ষেত্রে পারিবারিক উত্তরাধিকার আছে – নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা আলী আহাম্মদ চুনকার সন্তান তিনি। কিন্তু বলাই বাহুল্য, আইভী নিজ যোগ্যতায় পারিবারিক উত্তরাধিকারের পরিচয়কে ছাড়িয়ে গেছেন বহুগুনে। তাঁর আর সব কর্মকান্ড তো আছেই, ওসমান পরিবারের সন্ত্রাস আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছেন, সেটা নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে অনাগত কালেও। এরকম একজন রাজনীতিক আবার নির্বাচনে আবার বিজয়ী হবেন, নারায়ণগঞ্জবাসীর সেবা করবেন এটা প্রত্যেকটা শুভবুদ্ধির মানুষের কাম্য হওয়া উচিৎ। আমারও কাম্য সেটা; তাঁর বিজয় নিশ্চিতভাবেই দারুন আনন্দ দেবে আমাকে।

খুব বেশি না হলেও আইভীর পরাজয়ের সম্ভাবনা দেখি আমি। বাঁকি আলোচনার আগে একটা উদাহরণ দেয়া যাক – আমরা কি মনে করতে পারি, ‘আধুনিক বরিশালের রূপকার’ হিসাবে পরিচিত বরিশালের দারুন জনপ্রিয় মেয়র শওকত হোসেন হিরণ পরাজিত হয়েছিলেন ২০১৩ সালের মেয়র নির্বাচনে।

আমরা অনেকেই বলার চেষ্টা করি এসব স্থানীয় নির্বাচন এর ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনীতি আর স্থানীয় নানা ফ্যাক্টর কাজ করে। আমি সেটা মনে করি না। আসলে এই দেশে একটা জাতীয় নির্বাচনের পর জয়ী একটা দল একেবারে ব্ল্যাঙ্ক চেক পেয়ে গেছে বলে মনে করে যাচ্ছেতাই করে বেড়ায়, আর মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাই এর মধ্যে যদি মানুষ কোন অপশন পায়, অনেক ক্ষেত্রেই সেটাকে তারা নেয় ক্ষোভ উগরে দিয়ে ক্ষমতাসীনদের একহাত দেখিয়ে দেবার সুযোগ হিসাবে। এজন্যই বরিশালবাসীর জন্য অনেক কাজ করা হিরণ হেরে যান। এই কারণেই ‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’ হিসাবে পরিচিতি পাওয়া গাজীপুরে আওয়ামী প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়ী হন এমন বিএনপি প্রার্থী যিনি তাঁর দলের আমলেই প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদচ্যুত হয়েছিলেন দুর্নীতির অভিযোগে।

২০১৩ সালের মেয়র নির্বাচন হচ্ছিলো এমন এক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেটা ছিল সত্যিকারভাবে মানুষের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত, তবুও সেই সময়ই মানুষ এমন আচরণ করেছিলো। আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পরের সরকারটি তো এই দেশের মানুষের ঘাড়ের ওপর স্রেফ সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসে থেকে আগের তুলনায় অনেক বেশি লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে, শুধু ক্ষমতায় থাকার গ্যারান্টির বিনিময়ে দেশকে ভারতসহ একাধিক রাষ্ট্রের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। এসব কারণে এবার মানুষের মনে অনেক ক্ষুব্ধতা জমে আছে। সেটার একটা বহিঃপ্রকাশ নাসিক নির্বাচনে হতেই পারে।

ওদিকে গতবার যে শামীম ওসমানের ভয়ঙ্কর ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে মানুষ আইভীর পেছনে এককাট্টা হয়েছিলো, এবার সেই শামীম ওসমান তাঁর পক্ষে। এটাকে শামীম ওসমানের এক ধরণের নৈতিক পরাজয় বলা যেতেই পারে, কিন্তু এই মানুষ আইভী’র পক্ষে ভোট চাওয়া আইভী’র জন্য হিতে বিপরীত হবে। আর ওপরে ওপরে শামীম ওসমান যা ই দেখাক না কেন, তলে তলে তিনি আইভীকে হারানোর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন, এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা অনুমান করেই হয়তো আইভী কিছুদিন আগে বলেছিলেন – শামীম ওসমান থাকলে ভালো, না থাকলে আরও ভালো।

এসব বিবেচনায় বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ এর জনগণ যদি অন্য প্রার্থীকে ভোট দেবার সিদ্ধান্ত নিতে চান সেটা তাদের জন্য খুব কঠিন সিদ্ধান্ত হবে না। বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত এর উল্লেখযোগ্য কোন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কিন্তু নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার আইনজীবী এই মানুষটির পরিচ্ছন্ন ইমেইজ আছে, এটা নানা পত্রিকায় এসেছে।

এই পর্যায়ে এসে পাঠকদের কাছে আসা করি এটা অনেকটাই স্পষ্ট, আইভী হেরে গেলেও কেন আমি আনন্দিত হবো। হ্যাঁ এই পরাজয় আওয়ামী লীগকে এটা আবার মনে করিয়ে দেবে দীর্ঘকাল এই দেশে এমন ভয়ঙ্কর অপশাসন চালাচ্ছে তারা যে মানুষের অসন্তোষের আগুনে আইভীর মতো একজন অসাধারণ মানুষও পুড়ে যায়, যেমন পুড়ে গিয়েছিলেন বরিশালের হিরণ। এটা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায়কে এটাও আবার স্মরণ করিয়ে দেবে যে, শামীম ওসমানের মতো ‘দানব’কে রাজনীতির মাঠে ছেড়ে দাপিয়ে বেড়াতে দিতে হয় না; দিলে সেটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে ওঠে স্রষ্টাকেই শেষ করে ফেলে।

ভোটের আর বেশি সময় বাঁকি নেই। এই নির্বাচনে এমন পরিস্থিতি যে আমি আনন্দিত হবোই – অপেক্ষাটা এটা দেখার জন্য যে, আনন্দটা কোন কারণে হয়।
Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77