ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

বন্ধু মহলে অনেক সময়ই মজা করে বলি আমি যদি দেশের কোনো নামী ধর্মগুরু হতাম, তাহলে নামাজে মুসল্লির সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমতে থাকতো। আমার ওয়াজ-নসিহত শুনে অসংখ্য মানুষ সম্ভবতঃ নামাজ-রোজা ছেড়ে দিতো। জীবনে বহুবার হজ-ওমরা পালন করা দূরেই থাকুক, একবার যেতো কিনা সন্দেহ। লাখ লাখ টাকায় হাতির মতো গরু দূরে থাকুক, মোটামুটি সাইজের গরু কোরবানি করার মানুষ খুঁজে পওয়াই দুস্কর হতো। দেশের অলিতে-গলিতে অতি জৌলুসের মসজিদ বানানো কমে যেতো ‘দানবীর’ এর অভাবে। কেন এমন হতে পারতো, সেই প্রসঙ্গে আবার আসছি পরে।

KALU-MASTAN

পৃথিবীর সব ধর্মের নানা সামাজিক দিক আছে, আবার আছে রিচুয়ালিস্টিক দিকও। বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদেরকে দেখলে দেখা যাবে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ধর্ম মূলত কিছু রিচুয়াল পালনের মধ্যে আটকে থাকে। ওদিকে রিচুয়ালগুলো থাকার পেছনে এক ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক চেতনার কথাও ধর্মীয় বয়ানে থাকে, কিন্তু সেগুলোও শেষ পর্যন্ত প্রায় সব মানুষের মধ্যে আর টিকে থাকে না। সেজন্যই আমরা দেখি সংযম শিক্ষা দেয়ার মাস রমজান পরিণত হয়েছে স্রেফ ভোগের উৎসবে। ত্যাগের চেতনার শিক্ষা দেবার কোরবানি হয়ে পড়েছে নিজের ঐশ্বর্য্য দেখানো আর মাংস খাবার উৎসবে।

যেহেতু আর একদিন বাদেই কোরবানির ঈদ, তাই এটা নিয়ে কয়েকটা কথা। এই দেশের প্রায় সব মুসলিম সুন্নি। আমাদের দেশে সাধারণভাবে ধারণা, কোরবানী করা ওয়াজিব। মজার কথা এদেশের অনেক মুসলমানই জানেন না যে, কোরবানী করা এমনকি সুন্নি মুসলিমদের মধ্যেও সর্বজনীন ওয়াজিব না। শুধুমাত্র হানাফী মাযহাবে এটা ওয়াজিব, সুন্নিদের অন্য তিন মাযহাবে কিন্তু এটা সুন্নত। এটাকে ওয়াজিব ধরে নিয়েও বলা যায়, কোরবানি তার ওপর ওয়াজিব, যার ওপর যাকাত ফরজ। নামাজ কায়েমের সাথে সাথে যাকাত আদায়ের কথা কোরআনে বহু সূরায় বলা আছে; এছাড়াও যাকাত এর উল্লেখ আছে অনেক জায়গায়। সেখানে কি প্রায় সবাই ফাঁকি দিচ্ছে না?

সঠিক হিসাব মতো যাকাত আদায় করেন, এমন মানুষ বাতি দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে একেবারে হাতে গোনা। আর যারা দেন, তাদের অনেকের মধ্যেই আছে প্রচন্ড জাহির করার প্রবণতা। মানুষ আজীবনের জন্য স্বাবলম্বী হতে পারে, যাকাতের টাকায় এমন ব্যবস্থা করার নির্দেশনা থাকলেও যাকাত দেয়া হয় অতি সস্তা শাড়ি-লুঙ্গি। এসব পোশাক অতি সস্তা রাখার জন্য অতি নিম্নমানের করে বানানো জাকাতের জন্য বিশেষ শাড়ি-লুঙ্গি পাওয়া যায় দোকানে। যাকাত দেবার নামে এই জাহির করার মানসিকতার কারণে ভিড় তৈরি করে পদদললিত হয়ে মানুষের মৃত্যুর খবর নিয়মিত বিরতিতেই পাই আমরা।

এবার আসি শুরুর প্রসঙ্গে, আমি ধর্মগুরু হলে কেন ওই ব্যাপারগুলো ঘটার সম্ভাবনা ছিলো। আমি মানুষকে প্রতি মুহূর্তে জানতাম, যে কোনো ইবাদত, সেটা ফরজ/ওয়াজিব/সুন্নত/নফল যাই হোক না কেন, সেটা কার্যকর হবার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এক শর্ত আছে। সেটা হলো সেই মানুষটার উপার্জন হালাল হতে হবে। আসুন দেখে নেই ও সংক্রান্ত দু’টো সহি হাদিস:

১. “এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলি-ধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে প্রভু হে প্রভু’ বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার মুনাজাত কিভাবে কবুল হবে?” হযরত আনাছ বলেনঃ “আমি বললাম, হে রাসূল (স.)! আল্লাহর কাছে আমর জন্য দোয়া করুন যেন তিনি আমার দোয়া কবুল করেন। উত্তরে রাসূল(স.) বললেনঃ হে আনাস তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দোয়া কবুল হবে।” (মুসলিম)

২. রাসূল(স.) বলেন, “যে শরীর হারাম খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, তা জান্নাতে যাবে না।”(তিরমিযি)।

কথাগুলো আমাদের ধর্মগুরুরা একদম বলেন না, তা না। বলেন, তবে এটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ততটা গুরুত্ব দিয়ে বলেন না। আমি ধর্মগুরু হলে এসব কথা প্রতি মুহূর্তে বলতাম একেবারে চাঁছাছোলা ভাষায়, কারণ ধর্মের বিশ্লেষণ তো বলে হালাল উপার্জন সব ফরজেরও আগে। তাই প্রতিদিন নামাজ পড়ানোর আগে বলতাম, আপনাদের যাদের আয়ে হারাম যুক্ত আছে, তারা বাসায় ফিরে যান, এখানে নামাজের নামে যা করবেন সেটা ওঠাবসা করার বেশি কিছু না। বলতাম রোজা-হজ-কোরবানি সব বন্ধ করে দিন। ওতে অন্তত হজ-কোরবানির নামে টাকা জলে ঢালা হবে না।

এই রাষ্ট্রে হারাম নেই গরীব-শ্রমজীবী মানুষের উপার্জনে, কিন্তু যারা হজ-কোরবানি করে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগের উপার্জন কি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম নয়? সরাসরি ঘুষ খাওয়া, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই তো আছেই, আছে নানা রকম নোংরা ধান্দার আয় – রোগীকে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করতে বলা, ওষুধ লিখা অপারেশন করা ডাক্তার, মিথ্যা আশা দিয়ে মক্কেলকে মামলা করানো উকিল, স্কুলে ফাঁকি দিয়ে বাসায় ব্যাচে মোটা তাকে পড়ানো শিক্ষক, অফিসে যোগ্য কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা কূটচাল চেলে তাকে পিছিয়ে নিজে প্রমোশন পাওয়া কর্মকর্তা, জেনেশুনে ঘুষখোরের টাকা নিয়ে মসজিদ উন্নয়ন করানো ইমাম, ঘুষখোরের স্থাপন করা মাদ্রাসার হুজুর, তথ্য গোপন করে ভেজাল জিনিষ বিক্রি করা ব্যবসায়ী, নির্ধারিত মান ঠিক না রেখে পণ্য উৎপাদনকারী, মাদক চোরাচালানি, জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতিকে থোড়াই কেয়ার করা এমপি-মন্ত্রী…ফর্দটা আর লম্বা করছি না।

এমনকি ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপার্জনকারীও যদি একেবারে সঠিক পরিমাণ যাকাত না দেয়, তবে তার উপার্জনও হালাল হবে না। কয়জন দেয় সঠিক নিয়মের যাকাত? এ তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবার পরিস্থিতি!

আজ যখন হজে যাবার জন্য সোয়া এক লাখের বেশি বাংলাদেশির কাফেলা দেখি, ৭০/৭৫ লক্ষ প্রাণীর কোরবানির মহোৎসব (হ্যাঁ, এটা ত্যাগের মহিমা শেখা না) দেখি তখন মনে হয় বেশিরভাগ মানুষ পণ্ডশ্রম করছে, টাকা জলে ফেলছে…..’হুদাই’!

এর মধ্যে কোরবানির অন্তত একটা বড় আর্থিক প্রভাব আছে আমাদের অর্থনীতিতে। মোটামুটি ২৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয় ঈদ উল আজহায়। কিন্তু মূল হজ এর ন্যূনতম খরচ বাবদ কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকার (নানা রকম শপিং আর উমরা হজ সহ হিসাব করলে সেটা আরও অনেক বেশি হবে) অতি সামান্য অংশই এই দেশের অর্থনীতির কাজে লাগে; চলে যায় এক বর্বর দেশ সৌদি আরবের কাছে। ওদের হজ ব্যবসার পরিমাণ দেখুন – হজ থেকে কত টাকা আয় করে সৌদি আরব?

জানি, ইসলামিক অনুশাসনে নামাজ পড়া, রোজা রাখা আর হজে যাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষ এসব না করলেও সমাজ সরাসরি উচ্ছন্নে যায় না। সমাজ উচ্ছন্নে যায় মানুষের হারাম উপার্জনকে কেন্দ্র করে। ভেবে দেখলেই দেখবো আমাদের সমাজের যাবতীয় সমস্যার মূল কারণ মানুষের হারাম উপার্জন। কিন্তু কথাগুলো খুব যতোটা গুরুত্ব দিয়ে বলা উচিৎ, সেভাবে বলেন না বেশিরভাগ ধর্মগুরু।

এটাই অবশ্য হবার কথা, একটা পচে যাওয়া সমাজে কেউ পচন থেকে রক্ষা পায় না; ধর্মগুরুরাও এর বাইরে নয়। তাই রেখে ঢেকে কথা বলে সমাজের শক্তিমানদের বিরাগভাজন না হবার চেষ্টা থাকে প্রায় সব ধর্মগুরুর মধ্যে। এ কারণে হালাল উপার্জনের অপরিহার্যতার চাপ সমাজের মানুষের ওপর জারি থাকে না। ফলে প্রতিদিন সমাজ উচ্ছন্নে যায় আগের দিনের চাইতে বেশি পরিমাণে। আর এই উচ্ছন্নে যাওয়া সমাজের মানুষরা হজে যাবে বিরাট কাফেলায়, কোরবানি দেবে লাখে লাখে….’হুদাই’!