ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

বাংলাদেশের ঔষধশিল্প এখন আন্তর্জাতিক বাজারে স্বনামে প্রতিযোগিতা করছে। মান ও দাম দু’টোতেই রয়েছে আমাদের সুনাম। বিশ্বের ছোট বড় ১২৩টি দেশে আমাদের দেশের ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে। গর্বের বিষয় বটে। কিন্তু কথায় আছে, প্রদীপের নিচে অন্ধকার। তেমনি দশা আমাদের। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার নকল, ভেজাল ও নিম্ন মানের ঔষধে সয়লাব। বর্তমান সরকার গুটিকয়েক পদক্ষেপ নিলেও তা দৃশ্যমান কোন সাফল্য নয়। ফলে বিপুল জনগোষ্ঠী নিত্যদিন হয়রানি, বিড়ম্বনা ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

প্রত্যক্ষভাবে কয়েক লক্ষ লোক এই শিল্পের সাথে জড়িত। পরোক্ষভাবে ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টারর কর্মযজ্ঞ আবর্তিত হচ্ছে ঔষধ শিল্পকে ঘিরে। তবে নিয়ম নীতি ছাড়াই যেন চলছে অনেক কিছু। যেমন- মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে যারা যুক্ত আছেন তাদের চাকরির গ্যারান্টি এক মিনিটও নেই, প্রতি মাসে সেলস্ টার্গেট বাড়ে, টার্গেট পূরণ না হলে স্যালারি আটকে যাওয়া অথবা কম স্যালারি পাওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। কোন ছুটি নেই বললেই চলে। শুক্রবার বেশিরভাগ ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ থাকলেও তাদের কোন বন্ধ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। সরকারের উচিত এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা। যাতে উভয়পক্ষের স্বার্থ অক্ষুন্ন থাকে।

কিন্তু আমার এই নিবন্ধের মূল কথা ভিন্ন। ইদানিং খুব লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে- মেডিকেল রিপ্রেজেন্টটেটিভগণ রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলছেন। এটি হাসপাতাল থেকে শুরু করে ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বার পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রশ্ন হল- তারা যা করছেন সেটি নীতিগত বা আইনত বৈধ কিনা? উত্তর হচ্ছে- না। বরং অত্যন্ত গর্হিত কাজে তারা লিপ্ত। কেননা একটি প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্রে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য থাকে। নাম, ঠিকানা, বয়স, লিঙ্গসহ রোগের ইতিহাস (বিবরণ) লিপিবদ্ধ থাকে। সঠিক চিকিৎসার স্বার্থেই এগুলো করা হয়।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় “গোপণীয়তা” রক্ষা রোগীর অধিকারের মধ্যে পড়ে। আপনি যদি মনে করেন কোন ডাক্তারের কাছে আপনার রোগ ও এর চিকিৎসার গোপণীয়তা থাকবে না আপনি মনের ভুলেও তার দরবারে যাবেন না। তাহলে কেন আপনার প্রেসক্রিপশনের ছবি অপরিচিত একজন তার স্মার্টফোনে ধারণ করবেন? যা কিনা ফেসবুক, ভাইবার, ইমু ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পরিচিত- অপরিচিত জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আপনি সামাজিক মর্যাদা হারানোর পাশাপাশি হীনমন্যতায় ভুগতে পারেন। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

প্রশ্ন হল, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টটেটিভগণ কেন ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলেন? তাদের এহেন গর্হিত কাজের হুকুমদাতা কে? এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা যেতে পারে।

মার্কেটিং -এ 4P একটি শব্দ আছে। Product, Price, Place, Promotion। যখন কোন নির্দিষ্ট এলাকায় কোম্পানীর 4P জরিপ হয় তখন রিপ্রেজেন্টটেটিভগণ প্রায় পাগলের মত ছুটাছুটি শুরু করেন। যেহেতু প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রোডাক্ট বা টার্গেট প্রোডাক্টের ওপর জরিপ চালিত হয়, সুতরাং এরা তখন ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ধরনা ধরেন। ডাক্তারদের সাথে তাদের একটি সদ্ভাব সম্পর্ক রয়েছে। ডাক্তারদের মাসিক হারে নগদ টাকা দেয়া, গিফট দেয়া, কারো কারো ফ্যামিলির প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করা, বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করা, গাড়ি, এসি উপঢৌকন দেয়া ইত্যাদি বিবিধ উপায়ে এ সম্পর্ক তৈরি হয়। আর এ সবের যোগান দিয়ে থাকে কোম্পানিগুলো। বর্তমানে প্রায় নব্বই শতাংশ ডাক্তার এ সম্পর্কের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলোর ঔষধ প্রেসক্রিপশন করে থাকেন। এটি সুচিকিৎসার একটি বড় অন্তরায়। এতে করে অপ্রয়োজনীয় ঔষধও ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায়।

কোম্পানির মানথলি টার্গেট ও ফোরপি-র যাতাকলে পড়ে রিপ্রেজেনটেটিভগণ রোগীর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে যে ঘাটাঘাটি করন তা অনৈতিক, নীতিবিরুদ্ধ ও ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপের শামিল। আসুন আপনি আমি এ ব্যাপারে সচেতন থাকি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ চাই।