ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

পাঠক মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে চলুন দেশের জনসংখ্যা নিয়ে কিছু মূল্যবান তথ্য জেনে নেই।

২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৭ লক্ষ। দেশের বাইরে প্রায় এক কোটি লোক বাস করছে। তার মানে সব মিলিয়ে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১.৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬৭.২। এর মধ্যে পুরুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬৬.১ এবং মহিলাদের ৬৮.৭ বছর। গড় আয়ু বাড়ার পাশাপাশি শিশু মৃত্যু ও প্রসুতি মাতৃ মৃত্যু হার ও কমেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩৯ জন ও মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লক্ষে ১৯৪ জন।

তথ্য উপাত্ত তো জানলাম, জেনে গেলাম উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে জনসংখ্যা বৃদ্ধিহার। তাহলে যেখানে যাই এত মানুষ দেখি কেন? যেন চারিদিকে গিজগিজ করছে মানুষ। এর প্রকৃত কারণ কী? গড় আয়ু বৃদ্ধি কিংবা শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়া, নাকি পরিবার পরিকল্পনা নামক প্রকল্পের ব্যর্থতা, নাকি জনগণের সচেতনতার অভাব?

জনসংখ্যা নিয়ে কথা উঠলেই অবশ্যম্ভাবীভাবে চলে আসে পরিবার পরিকল্পনার কথা। কেউ হয়তো বলবেন দেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি জোরদার হচ্ছে না, কিংবা উন্নয়নকর্মীরা তাদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করছেন না, কিংবা সব দোষ বরাবরের মতই প্রশাসনের উপর চাপিয়ে দিয়ে বলতে পারি যে সরকার জনসংখ্যা কমানোর জন্য সঠিক নির্দেশনা প্রদান করছেন না। কিন্তু আসলেই কী তাই?

পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির কারণে অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতায় ও ভাবনায় “ছোট পরিবার সুখী পরিবার ” এরকম একটি ভাবধারার বিকাশ হয়েছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের মাঝে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের জন্য কিছুটা হলেও সচেতনতা তৈরি হয়েছে। আর এর প্রমাণ আমরা জন্ম বৃদ্ধিহার হ্রাস পাওয়ার উপাত্ত থেকেই অনুধাবন করতে পারছি। মহিলাদের সন্তান জন্ম দানের চিন্তা ভাবনয়ে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আজকের বিডিনিউজ24 অনলাইন সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী দেশের বিবাহিত নারীদের দুই তৃতীয়াংশই আর সন্তান নিতে চান না। সরকারী জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ শতাংশ বিবাহিত নারীই আর সন্তান না নেওয়ার ইচ্ছার কথা বলেছেন। এর মধ্যে দুই সন্তানের জননীদের মধ্যে এই হার ৮২ শতাংশ, আর তিন বা তার বেশি সন্তানের মায়েদের মধ্যে ৯০ শতাংশ। কিন্তু দেখা গেছে যে অসাবধানতার কারণে অনেক নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারন করে থাকেন।এর জন্য বৃদ্ধি পায় পরিবারের সদস্য সংখ্যা। বৃদ্ধি পায় দেশের জনসংখ্যা। কাজেই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণজনিত সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য আবার আমাদের ফিরে যেতে হয় সেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে।

এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল দেশ বলে বিশ্বে পরিচিত হলেও আমাদের দেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি কখনোই বাধ্যতামূলক ভাবে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া কোনও আইন নয়। যা আমরা গণচীনে “এক সন্তান নীতি ” কর্মসূচীতে দেখতে পাই। জোর জবরদস্তি করে সেখানে পরিবার পরিকল্পনা নীতি জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং আইন ভঙ্গ করলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা আছে। যা অনেক সময়ই অমানবিক এবং হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দেয় বলে আমরা পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি।

অন্যদিকে আমাদের দেশে পরিবার পরিকল্পনা হল জনগণের স্বাধীন ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আমি কয়টি সন্তান নেব, তা সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর করছে আমার উপর। রাষ্ট্রের কোনও ভূমিকা এতে নাই।এক্ষেত্রে আমরা অন্যান্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতই পূর্ণ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ভোগ করছি। তাই আমাদের জনগণকেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশে জন্মহার কমেছে এ নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনও কারণ নেই। জন্মহার কমে গেলেও বর্তমানে যে হার আছে সেভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ধারনা করা হচ্ছে যে আগামী ৫০ বছরেই জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে। এক্ষত্রে ক্ষুদ্র এই দরিদ্র দেশটার খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ সরবরাহসহ সব ধরনের সেবা ও অবকাঠামোয় যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

কাজেই সরকারের যেমন দায়িত্ব জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করে তোলা, ছোট পরিবারের সুযোগ সুবিধাগুলি জনগণের কাছে তুলে ধরা, সেই সাথে জন্ম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সমূহকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলা, ঠিক তেমনি আমাদের জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ছোট পরিবার গঠন ও সন্তান সংখ্যা নির্ধারণে। দেশের স্বার্থেই হোক আর নিজের স্বার্থেই হোক জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শুধুই সচেতনতা বৃদ্ধি।

তথ্য সুত্র: বিডি নিউজ 24 এবং বিবিএস।