ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

 

কাল সারাদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়াগুলো মুখর ছিল গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন নিয়ে। কট্টর ক্যাথলিক দেশ আয়ারল্যান্ডে গর্ভপাত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ..কিন্তু ৩১ বছর বয়সী ভারতীয় ডেন্টিস্ট সাভিতা যখন নিজের শারীরিক সমস্যার কারণে গর্ভপাতের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন, আইনের দোহাই দিয়ে সেখানে তার গর্ভপাত করায়নি ডাক্তার। সাভিতার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, গর্ভধারণের পর থেকে সাভিতা অসহনীয় ব্যাক পেইন অনুভব করতে থাকেন এবং তার প্রেগন্যান্সি টার্মিনেট করার জন্য ডাক্তারদের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু যেহেতু আয়ারল্যান্ডে ভ্রূণ হত্যা নিষিদ্ধ কাজেই তারা সাভিতার আবেদনে সাড়া দেন নি। সাভিতা ক্যাথলিক ছিলেন না কিংবা আইরিশও ছিলেন না.. যেহেতু আয়ারল্যান্ডে সাময়িকভাবে তিনি বাস করছিলেন কাজেই সেদেশের আইন মানতে তিনি বাধ্য। পরিণতিতে প্রেগন্যান্সি সংক্রান্ত জটিলতায় ১৭ সপ্তাহের গর্ভবতী সাভিতাকে প্রাণ দিতে হয়। এখন প্রশ্ন হল যখন কারও জীবন সংশয় দেখা দেয়, তখনও কী আইন বড় হবে নাকি জীবন?

উল্লেখ্য, বিশ্বের অনেক দেশেই গর্ভপাত নিষিদ্ধ। মুসলিম দেশগুলোতে যেমন গর্ভপাত নিষিদ্ধ, ঠিক তেমনি খ্রিষ্টান ক্যাথলিকরা গর্ভপাতকে জঘন্য কাজ হিসেবে দেখেন, এমনকি যে চিকিত্সক গর্ভপাত করান তাঁকে অনেক সময় তারা হত্যা করতেও উদ্যত হয়। আবার রক্ষণশীল ও উন্নয়নশীল কিছু দেশে গর্ভপাতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এমেরিকাতে গর্ভপাত প্রশ্নে ডেমোক্রেটরা উদার হলেও এ ব্যাপারে রক্ষণশীলরা খুবই স্পর্শকাতর। ইসলামপন্থী অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও গর্ভপাত বিরোধী আইন আছে। বাংলাদেশ দন্ডবিধি আইনের ৩১২ থেকে ৩১৬ ধারা পর্যন্ত গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন ও সাজার কথা বলা হয়েছে। এরমধ্যে ৩১২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নারী গর্ভপাত ঘটালে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড বা জরিমানা বা উভয় প্রকার শাস্তি পেতে পারে।

ধর্মীয় অনুশাসনে গর্ভপাত বা ভ্রূণ হত্যা মহাপাপ..ঠিক আছে মানলাম, কিন্তু কেন তা আইনত নিষিদ্ধ হবে? ধরুন কোনও নারী অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভধারণ করল, কিংবা ধর্ষণের স্বীকার হল, পরিণতিতে প্রেগন্যাণ্ট হল, সে ক্ষেত্রেও কেন তার জন্য গর্ভপাত আইনত নিষিদ্ধ হবে? কেন সে অনিচ্ছাকৃত ঘটে যাওয়া ঘটনার মাশুল সারাজীবন বয়ে বেড়াবে? তাছাড়া শুধু অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ তো গর্ভপাতের মূল কারণ নয়। সাভিতার গর্ভধারণ অবৈধ ও অবাঞ্ছিত ছিল না..সাভিতা পুত্র সন্তান হবে না বা কন্যা সন্তান হত্যা এই জাতীয় বিষয় সেখানে ছিল না..সম্পূর্ণ শারীরিক অসুবিধাজনিত কারণে গর্ভপাত করানোর জন্য সে আবেদন করেছিল..যা ধর্ম ও আইনের দোহাই দিয়ে নাকচ করে দেয় সে দেশের কট্টরপন্থীরা।গর্ভপাত বন্ধে আইন আছে খুব ভাল কথা। কিন্তু গর্ভধারণজনিত শারীরিক সমস্যায় কেন গর্ভপাত করানো যাবে না?

গর্ভধারণের পর একজন নারী যদি ক্যান্সার কিংবা এইডস এর মত ঘাতকব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হন, তবে কেন তিনি গর্ভপাত করাতে পারবেন না? কেন তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে?কিংবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে? তাছাড়া পুরুষেরা অনেক সময় নারীর সাথে বিয়ের প্রলোভন বা প্রেম জাতীয় সম্পর্ক তৈরি করে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে..বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ আগত সন্তানের দায়ভার নেয় না বা অস্বীকার করে..সেক্ষেত্রে নারী কেন সারাজীবন একা সন্তান জন্মদান ও তার লালনপালনের ভার নেবে? অবৈধ সন্তানের জন্য নতুন করে সংসার পাতা তো দূরে থাক, সামাজিকভাবে তাকে হেয় ও হেনস্থা হতে হয় প্রতি পদে পদে.. এছাড়াও মুহূর্তের ভুলে জন্ম নেয়া শিশুটির জন্য ভয়াবহ বাস্তব কী অপেক্ষা করছে না? যে সন্তান মায়ের পেটে থাকার সময়ই কাঙ্খিত নয়, কেউ তার জন্ম হোক চাইছে না..তার ভবিষ্যত কী হতে পারে তা সহজে অনুমেয়। এর দায়ভার আসলে কার? নারীর একার নয় নিশ্চয়!! বলাবাহুল্য, নারী বা পুরুষ উভয়কেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যেন ভ্রূণ হত্যার মত জঘন্য অপরাধ না ঘটে।কিন্তু অসাবধানতা বসে যদি ঘটনা ঘটেও যায় এবং তার ফলে নারী গর্ভধারণ করে, তাহলে উপায় কী?

আবার অনেক সময় বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে অনিচ্ছা সত্বেও তৃতীয় বা চতুর্থ সন্তান লাভের জন্য স্বামীরা গর্ভধারণে বাধ্য করেন। নারীদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনও মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পায় না। উন্নত গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও গর্ভপাত রোধ করা সম্ভব হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভনিরোধক পদ্ধতির মাধ্যমে গর্ভধারণ রোধ করা সত্যিই দু:সাধ্য। কেননা নারীরা অনেক সময় গর্ভধারণ করছে কিনা তা চিহ্নিত করতে পারেনা কিংবা তাদের জীবনের সকল পরিস্থিতিতে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।ফলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ করা মেয়েদের অবৈধ পথে গর্ভপাত করা ছাড়া আর উপায় থাকেনা৷ যা অনেক ক্ষেত্রেই তার জীবননাশক হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বজুড়ে তাই দাবি উঠছে ধর্মীয় বিধি নিষেধ থেকে গর্ভপাত আইনকে আলাদা করা হোক। অনিচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্কে বা ধর্ষণের কারণে গর্ভধারণ করলে বা গর্ভধারণের ফলে নারীর শারীরিক ও অর্থনৈতিক কারণে জীবন সংশয় দেখা দিলে, সেক্ষেত্রে কোনরকম সামাজিক চাপ ও আইনসংক্রান্ত জটিলতা ছাড়াই যেন একজন নারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কোনো সন্তান তারা চান কি না। যেহেতু অবৈধ সন্তানের দায়ভার পুরুষরুপি পশুটি নিচ্ছে না, অথবা একজন নারী সন্তান জন্মদানের মত বিশাল একটি দায়িত্বে নিজেকে সেই মুহূর্তে শারীরিক বা মানসিকভাবে যথাযথ মনে করছে না, কাজেই গর্ভধারণের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার সম্পূর্ণ অধিকার একজন নারীর হওয়া বাঞ্ছনীয়। আইনের মার প্যাচ নয়, নিরাপদ গর্ভধারণ ও গর্ভপাত হোক একজন নারীর সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন একটি অধিকার।

তথ্য ও ছবি সুত্র: ইন্টারনেট।