ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

২৬ জুন ২০০০, দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের । ১০ নভেম্বর ২০০০, প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ।এরপর হাটি হাটি পা পা করে টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে ২০১২তে এসে এক যুগ পূরণ করে বাংলাদেশ। আমাদের সীমিত ওভারের খেলাগুলোতে কিছুটা উন্নতির ছোয়া দেখা দিলেও টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আমাদের দৈন্যতা চোখে পড়ার মত। সম্প্রতি টেস্ট খেলার এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ক্রিকেট বোর্ডের নব নির্বাচিত সভাপতিসহ প্রধান নির্বাচক ও সাবেক ক্রিকেটাররাও নিঃসঙ্কোচে সে দুর্বলতার কথা স্বীকার করে গেছেন।এই এক যুগে প্রিয় দলটি ৭৪টি টেস্ট খেলে মাত্র ৩টি ম্যাচে জয় পেয়েছে, ৭টি ম্যাচে ড্র করেছে আর ৬৪টি ম্যাচেই বিশাল ব্যবধানে হেরেছে। আমরা হারিয়েছি শুধু ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ে ও ২০০৯ সালে তথাকথিত ভাঙাচোরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে।

কিন্তু প্রশ্ন হল এক যুগেও আমাদের টেস্ট ইতিহাসের এই দৈন্যদশার কারণ কী? কেন টেস্ট খেলায় উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নতি হয়নি? নাইমুর রহমান দুর্জয়ের মতে, “বর্তমানে বাংলাদেশে যে ফ্যাসালিটিজ আছে তা থেকে টেস্টে বহুদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।” এখানে ফ্যাসালিটিজ বলতে তিনি কী কী ফ্যাসিলিটিজ এর কথা বলতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার নয়। এমন নয় যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পিছনে সরকার কম টাকা ঢেলেছে। বরং একটা গরীব দেশের পক্ষে ক্রিকেটের পেছনে যে খরচ করা হয় এবং সার্বিক সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়, সেটাকে অপ্রতুল বলা যাবে না কোনো বিচারেই। তবে ধারনা করে নিতে পারি যে টেস্ট ক্রিকেটের ঊনয়ন না হবার পিছনে অন্যতম কারণ হতে পারে দীর্ঘদিন পর দীর্ঘ পরিসরে ক্রিকেট খেলার অভাব এবং কম টেস্ট খেলা।

এছাড়াও আমাদের সার্বিক ক্রিকেটের ঊনয়নের পশ্চাতে বাঁধা হিসেবে অন্যতম যে সমস্যাটি চিহ্নিত করা হয়, সেটা হল অযাচিত সরকারী হস্তক্ষেপ। অতীতেও আমাদের কোচেরা এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি সাবেক ক্রিকেট কোচ রিচার্ড পাইবাস তার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অযাচিত সরকারী হস্তক্ষেপ এবং বোর্ডে রাজনৈতিক চাপ এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।পাইবাস বলেন যে, “আমার কাজে এমন সব লোকজন বাধা দিয়েছে, যারা ক্রিকেট সম্পর্কে কিছুই জানে না। ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির আচরণ দেখলে মনে হয় জাতীয় দলের কোচের চেয়ে ক্রিকেটটা তারাই বেশি বোঝেন।”

বুঝলাম আমাদের ক্রিকেট কাঠামো পরিবর্তন দরকার, বুঝলাম আমাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে হবে, বুঝলাম আমাদের আর্থিক বরাদ্দ বাড়াতে হবে, বিসিবিতে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সবই বুঝলাম। কিন্তু খেলার মাঠে আমরা কী দেখতে পাই? পটাপট উইকেট এর পতন। এটা তো আর সরকারী হস্তক্ষেপে হয় না কিংবা টাকার অভাবে। এক জন আউট হলেই বাকিরাও কেবল যাওয়া আসার মিছিলে সামিল হন। বলা হয় তাদের মানসিক সামর্থের অভাব। কিন্তু আর কতকাল ক্রিকেটপ্রেমীরা আমাদের ক্রিকেটারদের মানসিক শক্তির এই দৈন্যদশা করুন মুখে চেয়ে চেয়ে দেখবে?

আর সমস্যা নেই কোন ক্রিকেটিয় বোর্ডে? সব দেশেই কম বেশি ঝামেলা থাকে ম্যানেজমেন্ট কিংবা খেলোয়াড়দের মধ্যে। তারপরও তো তারা এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা কেন পারছি না? দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে একি কাহিনী..হেরে গেলেই বলে সম্মানজনক পরাজয়, পরাজয়ের মধ্যেও ভাল কিছু খুজে পাওয়ার মানসিকতা যেন এক পা এগিয়ে দুই পা পেছনে হাঁটারই নামান্তর।

আজ ২১ নভেম্বর ২০১২, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের সাথে আবারও মুখোমুখি। ক্রিকেটপ্রেমী কোটি কোটি বাংলাদেশী আবারও আশায় চেয়ে থাকবে হালকা পাতলা গড়নের চিরচেনা ১১টি মুখের দিকে তাকিয়ে। পারবে কি অভিজ্ঞ ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ভাল খেলে জয় জিনিয়ে আনতে? কিংবা নিদেনপক্ষে ড্র করতে? আর কতদিন আমরা শুধু সান্ত্বনার বাণী শুনে আসব যে, হার থেকেও আমাদের প্রাপ্তি অনেক। সময় এসেছে আমাদের নিজেদেরকে জয়ী ভাবার। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনের। হারার আগেই হেরে যাবার মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আমরা আমাদের ব্যাটিং এর উপর কেন ভরসা করতে পারি না? আমরা জনগণ তো ক্রিকেটারদের পাশেই থাকি সব সময়। ওদের মাথায় তুলে রেখেছি আমরা। অফুরন্ত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় ভরিয়ে দিয়েছি ওদের। বিনিময়ে আমরা আর সম্মানজনক পরাজয় নামক এই শব্দটি আর শুনতে চাই না। আমরা চাই জয়, শুধুই জয়।