ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে বিভিন্ন প্রিন্ট ও চলমান মিডিয়ার সংবাদ শিরোনামের মোড়কে একই খবর চোখে পড়ে যার সারমর্ম হল, “ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক”। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। গত কয়েকদিনের বিভিন্ন সংবাদপত্র ঘেটে যা পেলাম তা হল, সাধারণ কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী মণ প্রতি ধানের উৎপাদন খরচ গড়ে ৬০০ টাকা আর পাইকারী বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৩০ থেকে ৫৮০ টাকা দরে। তবে এলাকাভেদে এই দর কম বা বেশি হলেও ধান বিক্রি করে আমাদের কৃষকদের মণপ্রতি কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। আশংকা করা হচ্ছে যে, ধান কাটা মৌসুম শেষ হলে ধানের সরবরাহ বাড়ার সাথে সাথে ধানের দাম আরও পড়ে যাবে।

উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ও ধানের দাম কমে যাওয়া এ সম্পর্কিত বিষয়ে সম্প্রতি রাজধানীর খামারবাড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে দ্বিতীয় জাতীয় হাওর সম্মেলনে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিত অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সরকার কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সফল হয়নি, তবে তিনি এর সাথে একথা যোগ করতে ভুলে যাননি যে কৃষি উপকরণ দিয়ে সরকার কৃষকদের সহায়তা করেছে। ঠিক আছে বুঝলাম যে সরকার উপকরন দিয়ে সহায়তা করেছে, কিন্তু পত্রপত্রিকাতে কৃষি বাজার ও কৃষকদের মাঝে ঘুরে সরেজমিন প্রতিবেদন মারফত জানা যায় যে, গত বছরের তুলনায় ধানের দাম কমেছে কিন্তু উল্টো সার, কীটনাশকসহ সব জিনিসের দাম বেড়েছে। উত্পাদন খরচ না ওঠায় এই সহায়তা আমাদের কৃষকের জন্য কতখানি সহায়ক হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশ্নসাপেক্ষ।

প্রশ্ন করা যেতেই পারে যে, আমাদের কৃষকেরা কেন প্রতি বছর একই অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন? কেন তারা ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত হচ্ছেন? সমস্যা আসলে কোথায় এবং এর সমাধানই বা কী হতে পারে?

খুব কমন একটা অভিযোগ যা সরকার পর্যন্ত দেশের সকলেই মোটামুটি ভালোভাবে জ্ঞাত তা হল বাজারে পাইকারি ক্রেতা যাদেরকে আমরা ফড়িয়া বলে থাকি তাদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। সরকারের বেধে দেয়া ন্যায্যদাম ফড়িয়ারা মানে না। এদের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক কৃষক সরকারের কাছে ধান বা চাল কখনোই বিক্রি করতে পারেনা। এদের দাপটের কারণে কিংবা যোগসাজোসে সরকারী কর্মকর্তারাও কখনো সেইসব অঞ্চল থেকে ধান সংগ্রহ করার জন্য যায় না। যার ফলে, সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে এই সব মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে অনেকটা পানির দরেই ধান বিক্রি করতে কৃষক বাধ্য হয়।

এছাড়া, আমাদের অধিকাংশ কৃষক বর্গা বা প্রান্তিক চাষী। বেশির ভাগ কৃষকই দাদন/ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। ক্ষেতের ধান উঠলে তাদের সে ঋণ শোধ করতে তাগাদা দেয় ঋণপ্রদানকারীরা। কৃষকের ধান ঘরে উঠতে না উঠতেই পাওনাদারেরা টাকা পরিশোধ করার তাগিদ নিয়ে আসেন। দাদনদাতাদের চাপে অধিকাংশ সময় কৃষকেরা সরকারের ন্যায্য মূল্যের আশায় বসে না থেকে অনেক কম দামে ধান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়ে থাকেন।

অন্যদিকে সরকারি খাদ্যগুদামেগুলোতে ১২ থেকে ১৫ লাখ টনের বেশি ধারণ ক্ষমতা না থাকায় সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া পর্যন্ত সরকার ধান ক্রয় করে থাকে। অতিরিক্ত ধান বা চাল সরকারী পর্যায়ে যেহেতু আর কেনা হয় না, কাজেই অতিরিক্ত সরবরাহ কৃষক বাধ্য হয়েই কম দামে বিক্রি করে দেয় এবং লোকসানের শিকার হয়। তবে আশার কথা এই যে, ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি খাদ্যগুদামেগুলোতে ধারণ ক্ষমতা ৩০ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।এছাড়াও খাদ্য শস্যের বাম্পার ফলনের পরেও শুধুমাত্র রক্ষণের অভাবে আমাদের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয়, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।****

তবে সব থেকে হতাশার কথা হল এই যে, পাইকারী বাজারে ধানের দাম কমে গেলেও খুচরা বাজারে চলের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এর ফলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বাম্পার ফলনের সুফল না কৃষক না ভোক্তা কেউই পাচ্ছে না। চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নিঃসন্দেহে দায়ী করা যায় মধ্যস্বত্বভোগী সেই শক্তিশালী সিন্ডিকেটকেই, যা ওপেন সিক্রেট সবার কাছে। এ কথা তো দেশের আপামর সকলেই স্বীকার করবেন যে, দেশে বাম্পার ধানের ফলন হয়েছে, শুনলে সবাই আমরা খুশি হই। স্বস্তির হাসি থাকে উত্পাদক, ভোক্তা এবং দেশের সরকার সবার মুখে। কিন্তু বাম্পার সেই ফসলের সুবিধা যখন আমরা কেউ ভোগ করতে পারিনা, তখন নিশ্চয় তা উত্পাদক-ভোক্তার কাছে অভিশাপ হয়েই দেখা দেয়।

ধানের দাম তথা খাদ্য নিরাপত্তা এতই সেনসিটিভ একটু ইস্যু যা আমাদের দেশের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। ধানের দাম কম হলে কৃষকের অসন্তোষ, চালের দাম বেশি হলে ভোক্তাদের অসন্তোষ। কাজেই এত নাজুক একটি বিষয় সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবেলা করা দরকার। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমাদের কৃষকরা যাতে ধান উৎপাদন থেকে সরে না আসে সেদিকে সর্বাগ্রে খেয়াল রাখতে হবে সরকারকে। নতুবা খাদ্যে আমদানি নির্ভর দেশ হতে খুব বেশিদিন হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না!!!

****(এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত পূর্ণাঙ্গ একটি পোস্টে আলোচনা করার আশা রাখি। )

তথ্য সুত্র: ইত্তেফাক:২০১২ -১১ -২৮, প্রথম আলো: ১৯- ১১-২০১২ এবং ২২- ১১- ২০১২, খাদ্য অধিদপ্তর এর ওয়েবসাইট