ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সম্প্রতি আমার এক কবি বন্ধুর মুখে শুনলাম যে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নতুন ধাঁচে গেয়েছে ব্রিটিশ বেইজড বাংলাদেশী একটি ব্যান্ড “ক্ষ”/”khiyo” এবং গানটি ফেইসবুকের মাধ্যমে ব্যপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। কৌতুহলি হয়ে ইউটিউব এ সার্চ দিয়ে ভিডিওটি দেখলাম ও গানটি শুনলাম। বিভিন্ন দেশের সদস্যদের নিয়ে গড়া এই ব্যান্ডটির ভোকাল মূলত প্রবাসী বাঙালি সোহিনী আলম।যুক্তরাজ্যে জন্ম নেয়া সোহিনী বেড়ে উঠেছেন লণ্ডন ও বাংলাদেশে। তিনি শুদ্ধ সঙ্গীতের ধারক বাংলাদেশের প্রখ্যাত নজরুল শিল্পী ফেরদৌস আরার ভাগিনী (সুত্র: উইকিপিডিয়া)।

গানটি যারা ইতোমধ্যে শুনেছেন ও ভিডিওটি দেখেছেন, প্রথমেই লক্ষণীয় যে, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” এই লাইন দিয়ে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সূচনা হবার কথা থাকলেও গানটি শুরু হয়েছে “কি শোভা কি ছায়াগো” দিয়ে। গায়িকার গায়কী দেখে মনে হবে অনেক দরদ দিয়ে গাইছে যেন দু চোখে আবেগ ঝরে পড়ছে আর পার্শ্ববর্তী সব বাজিয়েরা বসে বসে বাদ্য যন্ত্র বাজাচ্ছে!! আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মূল সুর থেকে গানটি অনেক দূরে। সত্যি বলতে কী সোহিনীর গানের সুরের সাথে মূল সুরের মিল খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।সেক্ষেত্রে অবশ্যই তিনি জাতীয় সঙ্গীতের সুর বিকৃতকরনের অভিযোগে দুষ্ট।

ক্ষীয় ব্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত বিকৃতির সম্মিলিত প্রয়াসে সামিল হয়েছেন একজন পাকিস্তানী।যিনি মূলত এই ব্যান্ডের একজন সদস্য এবং এই ভিডিওচিত্রের একজন এডিটর। পাঠক ভিডিওটি যারা দেখেছেন, খেয়াল করে দেখবেন বসে বসে যিনি তবলা বাজাচ্ছেন, তিনি আর কেউ নয় লণ্ডন প্রবাসী পাকিস্তানী তবলা বাদক হাসান মহীয়েদ্দিন।

Khiyo – Amar Shonar Bangla, Words and Melody: Rabindranath Tagore
Vocals: Sohini Alam, Acoustic Guitar: Oliver Weeks, Double Bass: Ben Hillyard
Tabla: Hassan Mohyeddin, Viola: Danyal Dhondy, Drums: Derek Scurll
Khiyo Video – Amar Shonar Bangla
Editors – Hassan Ameen Mohyeddin & Shahriyar Rahman
Director – Shahriyar Rahman

পাকিস্তানী বাজিয়ের কথা আমি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করলাম, কারণ সঙ্গীতটি হল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আর বলাবাহুল্য পাকিস্তানের সাথেই ছিল আমাদের দুঃসহ ইতিহাস। সেখানে জাতীয় সঙ্গীতের এই বিকৃতি আর অবমাননায একজন পাকিস্তানীর সংশ্লিষ্টতা উদ্বেগ জাগায় বৈ কী।

ফিরে যাই অতীত ইতিহাসে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি এ দেশে ব্যাপকভাবে গাওয়া হয়েছে ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনের সময়। স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় আপামর জনগণের মনে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল গানটি।গানের প্রতিটি লাইনে রয়েছে বাংলা মাযের প্রতি অভূত ভালোবাসা। ১৯৭১ সালে এই গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রচার হতো। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে গানটির প্রথম ১০টি লাইন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃত হয় (সুত্র: উইকিপিডিয়া)। এ গান আমাদের সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে যেমন গাঁথা হয়ে গেছে তেমনি জড়িয়ে আছে আপামর জনগণের অসীম ভালোবাসায়।

একাত্তরের রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি স্বাধীন একটি দেশ, একটি মানচিত্র। আমরা পেয়েছি আমাদের দেশপ্রেমের চেতনায় আবৃত একটি জাতীয় সঙ্গীত। মনে রাখা দরকার যে জাতীয় সঙ্গীত এখন শুধু রবীন্দ্র সঙ্গীত নয়। জাতীয় সঙ্গীতের সাথে যুক্ত আছে আমাদের ইতিহাস, আমাদের স্বাধিকার চেতনা। যখন একটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে কোনও সঙ্গীত স্বীকৃত হয় তখন তা নিয়ে অবশ্যই সুর বিকৃতি করা সেই সঙ্গীতের অবমাননা করার শামিল এবং তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতীয় সঙ্গীত সুর বিকৃতি বর্জনীয় ও নিন্দনিয়। যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজেই তার গানের স্বরলিপি বিকৃত হোক তা কখনোই পছন্দ করতেন না, সেখানে একটা দেশের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট কত খানি গ্রহণযোগ্য সে প্রশ্ন থেকে যায়।

সস্তা জনপ্রিয়তা পাবার নোংরা খেলা থেকে জাতীয় সঙ্গীতকে দূরে রাখা হোক। জাতীয় সঙ্গীতের বিকৃতি ও অবমাননা রোধে কঠোর আইন ও তার বাস্তবায়ন অতীব জরুরী। সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করা হোক জাতীয় সঙ্গীতের বিকৃতি, বন্ধ হোক জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননা, জাগ্রত হোক বিবেক।

*********
তথ্য সুত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া এবং ক্ষীয় ব্যান্ডের ওয়েবসাইট।