ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২ জানুয়ারি ২০১৩, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও বাংলাদেশ-ভারত সর্ম্পক’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার শ্রী সন্দীপ চক্রবর্তী মন্তব্য করেন যে, পূর্বের তুলনায় বর্তমানে সীমান্ত হত্যা অনেক কমেছে। তিনি স্বীকার করেন যে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড দুঃখজনক বিষয় (সুত্র: নিউজ মিডিয়া বিডি.কম)। ভারতীয় হাইকমিশনার যখন সীমান্তে হত্যাযজ্ঞ কমেছে বলে দাবি করছিলেন, ঠিক সেদিনই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বিভীষণ সীমান্তে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় গরু ব্যবসায়ী দুই বাংলাদেশিকে (সুত্র: প্রথম আলো, ৩ জানুয়ারি ২০১৩)। এই হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগের দিন নতুন বছরের প্রথম দিন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রটির কাছে আমরা পেয়েছিলাম হ্যাপি নিউ ইয়ারের উপহার, ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যা করা আরও দুই গরু ব্যবসায়ীর ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত লাশ।

এই সব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ আর পাশবিক অত্যাচারের সময় বাংলাদেশের জনগণের টাকায় পালিত বিজিবি কী করে তা জিজ্ঞেস করে তাদের মানহানি আমরা নাই বা করলাম!!কিন্তু আমাদের ঠোট কাঁটা সাংবাদিকেরা সীমান্তে হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। বরাবরের মতই গত বাঁধা উত্তর, তদন্ত হবে, তদন্ত রিপোর্টের উপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “ভারতের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী কেবল আত্মরক্ষার জন্যই গুলি চালানো যেতে পারে।’ খুব ভাল কথা, আত্মরক্ষার খাতিরে হত্যা করা অবশ্য প্রয়োজনীয়। তাইতো যখন খামাখা বন্দুক কাঁধে বর্দি পড়া বিএসএফের নির্জীব শরীরে আক্রমণ চালায় আমাদের পুষ্টিকর খাওয়া খেয়ে মাসল বানান তাগড়া লুঙ্গিপরা গরু পাচারকারীগণ, তখন তাদের অতর্কিত হামলায় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে নাকি ঐতিহাসিক সেই সমঝোতা আইনের উপর ভিত্তি করে গুলি করতে বাধ্য হয় নিরীহ গোবেচারা বিএসএফ এর বন্দুকধারী রক্ষিদের, এমনটাই দাবি করে আলাভোলা বিএসএফ। গুলি করে হত্যা করার পর ময়না তদন্তের নামে সেইসব লাশ নিয়ে যায় বিএসএফ। পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) আর বিএসএফ এর মধ্য নাকি পতাকা বৈঠক করে লাশ ফেরত আনা নিয়ে দেনদরবার চলে। আশ্চর্য, অন্যায় করে বিএসএফ, অন্যায় কেন করল সেই প্রতিবাদ তো দূরের কথা, তাদেরকে হুজুর হুজুর করে হাত কচলেও বিজিবি পায়না সে হতভাগা বাংলাদেশীর রক্তাক্ত লাশ!!!

পত্রিকা মারফত জানা যায় যে, সীমান্তে বিএসএফকে আক্রমণ করা তো দূরে থাক অনেক সময় বিএসএফের সদস্যরা বাংলাদেশে ঢুকে নিরীহ ব্যক্তিদের বিএসএফ ক্যাম্পে আটক করে প্রকাশ্যে মারপিটসহ নানাভাবে নির্যাতন করে। আর সেইসব নারকীয় দৃশ্য দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখেন বাংলাদেশ সীমান্তসহ ভারতের আশপাশের গ্রামবাসী। অনেক সময় অনেকের কোনও খোঁজ আর পাওয়া যায় না। মিডিয়ার কল্যাণে এসব ঘটনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। খুব বেশি লেখালেখি হলে সরকার মাথা ঘামায়, নতুবা নীরবেই সম্মতি দেয় বিএসএফ কর্তৃক এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের।

বিএসএফের দাবি অনুযায়ী যাদের হত্যা করা হয় তারা সবাই নাকি চোরাকারবারী (সুত্র: বিবিসি বাংলা.কম) ।

মানলাম। কিন্তু চোরাকারবার এর সাথে কী একা বাংলাদেশী জড়িত? ভারতের নাগরিক যদি গরু না দিত, তবে কাটাতার কেটে বাংলাদেশী চোর কী ভারতীয়দের বাড়ি থেকে গরুর দড়ি খুলে এনে এপারে পাচার করছিল? এ তো সহজেই অনুমেয় যে, উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিতভাবে বিএসএফ এ হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে থাকে। ঘুষের টাকার বনিবনা না হওয়া কিংবা বাংলাদেশীদের প্রতি চরম ঘৃণাও হতে পারে এর অন্যতম কারণ। বিএসএফ যতই বলুক না কেন, একজন/ দুজন গরু চোর ওদের উপর হামলা চালিয়েছে আর ওরা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে, এই মিথ্যা গালগল্পে অন্তত কেউই এখন আর বিশ্বাস করে না।

কিন্তু কথা হল যে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী দ্বারা এ হত্যাযজ্ঞ তো নতুন নয়,ফালানি হত্যাকাণ্ড এখনো সবার মনে উজ্জ্বল। অনেক বিতর্কিত হত্যার অনেক তদন্ত হয়েছে, আলোচনা, সমালোচনা হয়েছে, ভারতীয় বাহিনীর পাশবিক অত্যাচারের অনেক প্রমাণ পত্র পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে, তারপরও কেন বন্ধ হয়ে যায়নি তথাকথিত বন্ধু দেশ কর্তৃক এই সীমান্ত হত্যাযজ্ঞ?

তাই আমাদের প্রশাসনের কাছে আমাদের জোরালো দাবি, সীমান্তে বিএসএফের হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিন। দাদাদের কাছে হাত কচলে কোনও কাজ হবে না। দরকার সঠিক কূটনৈতিক কৌশল, চোরাচালানি বন্ধের জন্য নেয়া হোক কার্যকরী আইন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ । নতুন বছরে সীমান্তে আর কোনও লাশ নয়, আর কখনোই নয়।