ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

আমরা কিছুদিন পূর্বে গোপন খবরের ভিত্তিতে একটি মোবাইল কোর্টে গিয়েছিলাম। অভিযোগ ছিল খাবার লবণে সোডিয়াম ক্লোরাইড এর পরিবর্তে সোডিয়াম সালফেট ব্যবহার করে। তখন গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম, সোডিয়াম সালফেট অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি কেমিক্যাল, এটি মূলত টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক প্রভৃতি কারখানায় ব্যবহৃত হয়। এটি কখনই খাবার হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। কারণে এটি দীর্ঘদিন সেবনে কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা থাকে।

তখন অভিযোগটি ভিত্তিহীন মনে হচ্ছিল। কারণ কোন মানুষ এক প্রকারের বিষ অন্য আরেকজন মানুষকে খাওয়াতে পারে এটি আমার ধারণারও বাহিরে ছিল। ইতিপূর্বে বিভিন্ন ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্টে গেছি। সেখানে দেখতাম, নারিকেল বা সয়াবিন তেলে পাম অয়েল মিশাতে অথবা কোন সুনামধন্য কোম্পানীর প্যাকেট নকল করে ভেজাল পণ্য প্যাকেট করতে; দেখেছিলাম কুমারিকা তেলকে নকল করে রুমারিকা, কুমারিনকা… প্রভৃতি বানাতে, দেখেছিলাম রিন ডিটারজেন্টকে নকল করে বিন, কিন… প্রভৃতি বানাতে; আবার বনফুল এর লাচ্ছা সেমাই এর প্যাকেট বানিয়ে নিয়ে তার ভেজাল লাচ্ছা সেমাই প্যাকেট করতে। আরও অনেক।

যাই হোক, এবারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সোর্স পাঠালাম কারখানায়। সে একটি লবণের প্যাকেট নিয়ে আসলো, যাতে বিএসটিআই এর লোগো, আয়োডিন লোগো এমনকি সহযোগিতায় ইউনিসেফ ও বিসিক লেখা ছিল। কিন্তু তাতে কারখানার পুরো ঠিকানা নাই, শুধু বাংলাদেশ (অথবা ঢাকা, বাংলাদেশ) লেখা ছিল। আমরা আগেই জানতাম সে এলাকায় লবণের বিএসটিআই লাইসেন্স কারও নাই। ফলে পরদিন সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সাথে নিয়ে মোবাইল কোর্টে যাই। গিয়ে তো পুরোই হতবম্ভ হয়ে গেলাম। বস্তার গায়ে লেখা Sodium Sulphate Anhydrous 99%, (Textile and Dyeing usage only)। অবাক হয়ে গেলাম, যেখানে লেখা আছে শুধুমাত্র টেক্সটাইল, ডাইং -এ  ব্যবহারের জন্য। সেই জিনিস প্যাকেট করে লবণ বলে মানুষ খাওয়ানো হচ্ছে।

কারখানার মালিককে বললাম, এই লবণ কখনও খেয়েছেন? বললেন, না। যে জিনিস নিজে খান না, সেটি অন্যকে খাওয়াচ্ছেন কেন? মানুষের মূল্যবোধের কতটা অবক্ষয় হলে এমন ভেজাল দেওয়া সম্ভব?

লবণটি পুরো উত্তরাঞ্চলে বেশ ভালই মার্কেট পেয়েছিল। আমি লবণটির নাম, মালিকের বা কোম্পানির নাম প্রকাশ করছি না। কারণ মালিক বা কোম্পানীটিকে অপদস্ত করতে চাচ্ছি না। জনগণকে সচেতন করা উদ্দেশ্যেই লিখাটা। শুধুমাত্র প্রশাসন কিংবা বিএসটিআই -এর পক্ষে এসব ভেজাল প্রতিরোধ করা অসম্ভব ব্যাপার। জনগণকেই সচেতন হতে হবে। যে কোনো পণ্য কেনার সময় কারখানার পূর্ণ ঠিকানা, উৎপাদনের তারিখ প্রভৃতি দেখে কিনুন।

যারা ভেজাল পণ্য তৈরি করেন, তাদের কারখানার চারপাশে বসবাসকারী জনসাধারণ বিষয়টি জানার কথা। তাদের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো। আর যারা ভেজাল পণ্য তৈরি করেন তারা জেনে রাখুন, আজ হোক অথবা কাল হোক আপনি ধরা পড়বেন অবশ্যই। আর ধরা না পড়লেও আপনি যদি আজকে ভেজাল খাইয়ে কাউকে মেরে থাকেন, কাল আপনার সন্তানেরা অন্য কোম্পানির ভেজাল পণ্য খেয়ে মরবে। আর মৃত্যুর পরের জীবনের শাস্তির কথা তো বাদ-ই দিলাম। সর্বোপরি আমাদের মনুষ্যত্বের তথা নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন প্রয়োজন।