ঢাকা, সেপ্টেম্বর ০৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- শেষ মুহূর্তে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার শ্লোগান কণ্ঠে মঙ্গলবার ঢাকা আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। প্রতিবেশী দেশের এই নেতাকে বরণ করতে সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে ঢাকা।

এই সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সহযোগিতার ‘রূপরেখা চুক্তি’ সই হবে। এ ছাড়া অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনাসহ কয়েকটি বিষয়ে চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক এবং ট্রানজিট বাস্তবায়নের লক্ষে সম্মতিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বেলা ১১ টা ৫৫ মিনিটে একটি বিশেষ বিমানে ঢাকা পৌঁছাবেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার ও লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হবে।

সোমবার এক বিবৃতিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে আমি দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে যাচ্ছি। এটাই হবে বাংলাদেশে আমার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর।”

মনমোহনের সঙ্গে তার স্ত্রী গুরশরণ কাউর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা ও পানিসম্পদমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল আসছেন এই সফরে। এছাড়া আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ড. মুকুল সাংমা, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এবং মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী পু লালথানহাওলাও মনমোহনের সফরসঙ্গী হচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়েরও এই সফরে আসার কথা ছিল। কিন্তু তিস্তার পানি ভাগাভাগির প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি তুলে শেষ মুহূর্তে তিনি তা বাতিল করেন। তার এই সিদ্ধান্তে বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে চিস্তা চুক্তিও হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।

এই অনিশ্চয়তা আর নানা গুজবের মধ্যেই বিবৃতি দিয়ে নিজের আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মনমোহন সিং।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উন্নয়ন এবং একে আরো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এই সম্পর্কের শিকড় প্রেথিত রেয়েছে দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের মাঝে। উভয় দেশ একই ধরনের গণতান্ত্রিক চেতনা এবং উন্নয়নের স্বপ্ন লালন করে।”

বাংলাদেশ ও ভারত বর্তমানে ‘সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের’ এক অনন্যসাধারণ সময় অতিবাহিত করছে উল্লেখ করে মনমোহন বলেন, “২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়া দিল্লি সফরের সময় যে সিদ্ধান্তগুলো হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার একটি সুযোগ এই সফরে আমরা পাচ্ছি। নিরাপত্তা, সীমানা বিরোধ, পানি সম্পদ, বিদ্যুৎ, সীমান্ত অবকাঠামো, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছি তা সন্তোষজনক। আমাদের এই অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে।”

বিবৃতিতে মনমোহন আশা প্রকাশ করেন, এই সফরের পর বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা সকল ক্ষেত্রে বি¯তৃত হবে।

“এসব বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব বলেও আমাদের বিশ্বাস।”

সফরসূচি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঢাকা পৌঁছানোর পরপরই বেলা ১টায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি পৌঁছাবেন সোনারগাঁও হোটেলে।

বিকেল ৪টার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করবেন মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে।

বিকেল পাঁচটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসবেন মনমোহন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাদের নেতৃত্বে শুরু হবে দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক বৈঠক। সেখানেই চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারকে সই করবেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।

রাতে শেখ হাসিনার দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন মনমোহন সিং।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ‘বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক বক্তৃতা দেবেন। পরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বুধবার মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করবেন বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দুই দিনের সফর শেষে বিকেল পাঁচটা ২৫ মিনিটে ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি।

আলোচনায় তিস্তা চুক্তি

মনমোহনের সফর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিগুলোর খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন দুই পক্ষের কর্মকর্তারা। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন এবং বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, মনমোহনের সফরেই তিস্তার পনি বণ্টন নিয়ে চুক্তি হচ্ছে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতে শেষ মুহূর্তে এ চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

ভারতের বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের অসম গণ পরিষদ (এজিপি) শুরু থেকেই তিস্তা চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ নদীর পানি বণ্টন নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন মমতাও। তিনি চাইছিলেন চুক্তির ফলে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ যেন কোনোভাবেই বিঘিœত না হয়।

এই পরিস্থিতিতে শিব শংকর মেনন গত বুধবার কলকাতা গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং চুক্তির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। ওই বৈঠকের পর ৩০ অগাস্ট কলকাতার পত্রিকা আনন্দবাজার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মমতা খসড়া চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন।

কিন্তু পানি ভাগাভাগি নিয়ে আপত্তি তুলে মমতা বুধবার মনমোহনকে জানিয়ে দেন, তিনি ঢাকা সফরে আসছেন না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি উপেক্ষা করে এগোবে না নয়া দিল্লি।

অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সোমবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মনমোহন সিংয়ের সফরে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তিস্তার পনি বণ্টন নিয়েও চুক্তি হবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সরকার।

গণভাবনে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা সংক্রান্ত এক মত বিনিময় সভা শেষে ওই সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন দীপু মনি।

তিনি বলেন, “আমরা (ভারতের সঙ্গে) যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নই। আগে যা ছিল সে অবস্থানেই আছি।”

রঞ্জন মাথাইয়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে দীপু মনি বলেন, “আমি এখনো জানি, বিশ্বাস করি, আগামীকাল এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের প্রেস ব্রিফিংয়ের ভিডিও ফুটেজ আমি দেখেছি। তিনি কোথাও বলেননি যে, চুক্তি হচ্ছে না। তিনি সব পক্ষের সম্মতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।”

“আমি আশা করি, আশা না করার কোনো কারণ দেখছি না যে, অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে আগামীকাল এই (তিস্তা) চুক্তিও স্বাক্ষরিত হবে,” যোগ করেন তিনি।

সাংবাদিকদের মঙ্গলবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, “আমরা ভারতের পক্ষ থেকে ভিন্ন কোনো মত পাইনি। আমাদের কাছে এমন কোনো কমিউনিকেশন নেই যে- চুক্তিটি হচ্ছে না। আমরা জানি, চুক্তিটি হচ্ছে।”

কঠোর নিরাপত্তা ও মিডিয়া সেন্টার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন।

স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুস সোবহান শিকদার বলেছেন, মনমোহন সিংসহ ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নিরাপত্তায় সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

রোববার এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ জানান, অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।

এ সময় র‌্যাবের প্রায় আড়াই হাজার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান র‌্যাবের মহাপারিচালক মোখলেছুর রহমান।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে তথ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে হোটেল রূপসী বাংলার মার্বেল রুমে একটি মিডিয়া সেন্টার খোলা হয়েছে।

৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চালু থাকবে এই মিডিয়া সেন্টার।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/এসএসজেড/জেকে/০৪৫৫ ঘ.