ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

ভাষার বিবর্তনের একটি অদ্ভুত মজার বিষয় হচ্ছে শব্দ কখনো কখনো নিজেই নিজের মানে হয়ে দাড়ায়। এই মানে কোনো অভিধানে সাধারনত পাওয়া যায় না। এই মানে খুজে পেতে হয় ইতিহাসের টাইমলাইনে কিংবা জনতার মুখে মুখে। যেমন রাজাকার মানে হলো রাজাকার (উর্দু মানেটা শুধু পাকিদের জন্য)। রাজাকার এর মানে আমরা রাজাকারই বুঝি। রাজাকার এর সমার্থক শব্দ খুজলে কেউ বলবে খুনি, কেউ বলবে বিশ্বাসঘাতক, ধর্ষনকারি, নরখাদক কিংবা লুটেরা বা সবগুলোই। শব্দ কিভাবে শব্দের মানে হয় সেটা নিয়ে গবেষকরা গবেষনা করুক। এইভাবে শাহবাগ ও হয়তো নিজেই নিজের মানে হয়ে যাবে। শাহবাগ আমার আর আমার মতো মানুষগুলোর জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। শাহবাগ একটি আকাঙ্খিতো চাওয়ার বেদনাহত না পাওয়ার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। শাহবাগ তারুণ্যের দ্রোহের আগুন, হিংস্র বুড়ো হায়েনাগুলোর ভয়ার্ত চোখ। শাহবাগ কৃষ্ণচূড়ার লালে রাঙিয়ে যাওয়া আগুন লাগা ফাগুন আর কিছু বেজন্মার জীবনের শেষমুহুর্তের সাইরেন। শাহবাগ একটি সময়, নববর্ষের পুর্বমুহুর্ত, নতুন আশার আলো। শাহবাগ শহীদের রক্তরঙা গোধূলি। শাহবাগ ভাষার মাস, ভাষাশহীদদের মাস। এই শাহবাগেই করব শুরু বেজন্মাগুলোর প্রান নাশ।

শাহবাগ হলো এক প্রজন্মের হারানো পথকে পরবর্তী প্রজন্মের খুঁজে পাওয়া। মুছে যাওয়া পথের শেষ রেখাটিকে নতুন করে আবিষ্কার করা। অন্ধকারে যখন আমরা পথ হাতরাচ্ছি নতুন কোনও আলোর সন্ধানে, অন্ধকারের গহীনে যখন হিংস্র সাপের বিষাক্ত নিঃশ্বাস ঘাড়ের উপর এসে পড়ছিল, যখন ভাবছিলাম অতলের পতন বুঝি আর ঠেকানো গেলনা, অভাবিত আলোর দেখা মিলল তখনই । এ আলোর রেখা আর মিলিয়ে যাবে না। আমরা পথটিকে দেখে নিয়েছি, শত সহস্র জনতা পথটিকে চিনে নিয়েছে। কবিতা, গান আর মুহুর মুহুর শ্লোগানে শত সহস্র জনতার শপথ পিষে ফেলবে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপের ফণা।

শাহবাগ একটি সমষ্টিগত চেতনার উন্মেষ, শত সহস্র জনতার মুষ্টিবদ্ধ উর্ধমুখী হাত, যে হাতের ভীড়ে আছে কোনও এক মুক্তিযোদ্ধার মুক্তিচেতনা আর তার খন্ডিত হাত। শাহবাগের সূচনায় অবদান আছে কোনও এক জাফর মুন্সীর রক্ত, তার বিধবা স্ত্রীর হাহাকার, আর তার সন্তানদের পিতৃবিয়োগের বেদনা। শাহবাগ চলমান আছে রাজীব হায়দারের (থাবা বাবা) নির্মম, নিষ্ঠুর খুনের বিনিময়ে, শাহবাগ চলমান আছে লাকী আক্তারের শ্লোগানে। আজ শাহবাগের প্রতিটি মানুষই হয় জাফর মুন্সী, নয়তো রাজীব হায়দার কিংবা লাকী আক্তার। মানুষ আজ জেগে উঠেছে ওইসব মুনাফিক এর বিরুদ্ধে যার হাসি হাসি মাখা পৈশাচিক মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে শায়তানের অন্তরাত্মা, মরে গেলেও যার প্রেতাত্মার হাত থেকে মুক্তি মেলে না সহজে। কাদের মোল্লাদের ভী চিহ্নিত বিজয় আঙ্গুল উপরে ফেলার প্রত্যাশা আছে জনগণের; কাদের মোল্লারা মরবেই, মরতে তাদের হবেই, হয়ত শীঘ্রই, কিন্তু শাহবাগ দিবে তার প্রেতাত্মার হাত হতে মুক্তি। শাহবাগের জন্য রইল আমার সবটুকু ভালবাসা।

যে সমস্ত মানবতাবাদী আছেন বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের বিরদ্ধে, তাদের বলছি আপনারা কেন মাংস খাবার নাম করে পশু হত্যা করেন। আমরা কোনও মানুষ হত্যার প্রত্যাশা করছি না, আমরা কিছু পশু বধ করতে চাচ্ছি, তবে আমরা তাদের মাংস খাব না। আমরা শুধু নিশ্চিত করতে চাই আর যেন কোনও মানুষ এইসব নরপশুদের নৃশংতার বলী না হয়। আজ আমাদের একটাই প্রত্যাশা বাংলার জনগণ সত্যিকারের মুক্তি পাক। আর আমাদের প্রত্যাশা পূরণের প্রথম ধাপ হোক রাজাকারের বধ। এই বাংলার সব রাজাকার নিপাত যাক, নিপাত যাক । এরপর আমরা আমাদের সন্তানদের গল্প বলতে চাই একদা বাংলাদেশে রাজাকার নামের এক ধরণের প্রাণী বাস করত …

শাহবাগের জনগণ আজ যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না জয় আসছে। এই যুদ্ধ ছিনতাই হয়ে যেতে পারে, হাজারো রকমের ষড়যন্ত্র চলছে যুদ্ধফ্রন্ট দখলে নেবার জন্য। এই ষড়যন্ত্রের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে তারাই যারা আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে আছে, যাদের পায়ের নিচের মাটি আজ প্রকম্পিত। আমি আজ সতর্ক করে দিয়ে বলতে চাই একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল অবশ্যই আছে যারা এই যুদ্ধের সুবিধাভোগী হতে চায়। ইতিহাসের অজস্র ঘটনার ভিড়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বনাম মীরজাফার এর ঘটনা ইতিহাসের তেমনি এক সাক্ষী। শাহবাগের জনগণ সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আজ সদাজাগ্রত অতন্দ্র প্রহরী। শাহবাগ আজ সমগ্র বাংলাদেশেরই নামান্তর। তারপরও যারা শাহবাগের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও শঙ্কিত, তাদের জন্য বলছি শাহবাগই শাহবাগের শেষ কথা নয়, শাহবাগ শুধু একটি সূচনা মাত্র ।