ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

উপজাতি বনাম আদিবাসী আকাশ-পাতাল ব্যবধান

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ । ৫০৯৩ বর্গমাইল আয়তনের পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ও বান্দরবান এই তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত । ৫২ ভাগ বাঙ্গালী ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ১৩টি উপজাতির সমন্বয়ে ৪৮ ভাগ উপজাতি জনসংখ্যা অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অপার সম্ভবনার এক ভূমি। দীর্ঘ দিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশী বিদেশী ষড়যণ্ত্র চলছে,যার মাত্রা বর্তমানে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে ।বর্তমানে উপজাতিরা জাতিসংঘ থেকে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার জন্য নিজেদেরকে আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জোর প্রচেষ্ঠা চালাচ্ছে । উপজাতিরা ভাল করেই জানে তারা আদিবাসী নয় তারা উপজাতি,শান্তিচুক্তিতে ও তারা নিজেদেরকে উপজাতি হিসেবে পরিচয দিয়েছে, কিন্তু আজ তারা দেশী বিদেশী ষড়যন্দ্রে লিপ্ত হয়ে নতুন করে নিজেদেরকে আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, যেমনটি হচ্ছে শিয়ালের গায়ে বাঘের চামড়া লাগিয়ে মিথ্যা বাঘ হওয়ার চেষ্টা । আমরা বাঙ্গালী আমাদের জন্মলগ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় একটি আমরা বাঙ্গালী, সুবিধা আদায়ের জন্য আমরা আমাদের এই পরিচয়কে য়েমন যখন তখন পরিবর্তন করার চেষ্টা করাটা নিন্দনীয়, অসাংবিধানিক ও অপরাধযোগ্য ঠিক উপজাতিদের আদিবাসী করার চেষ্টাও নিন্দনীয়, অসাংবিধানিক ও অপরাধযোগ্য, শান্তিচুক্তির ধারা ভঙ্গকারী হিসেবে তা রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল । উপজাতি ও আদিবাসীর মধ্যকার বিতর্কের কারণ জানতে হলে আগে উপজাতি ও আদিবাসী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারানা দরকার । উপজাতি শব্দটির আভিধানিক অর্থ কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী । আর আদিবাসী শব্দের অর্থ হল আদি থেকে যে জাতি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে আসছে অথবা ভূমি সন্তান ইংরেজিতে যাকে বলে Aborigine or aboriginal people । ড.জিল্লুর রহমান সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ইংরেজী বাংলা অভিধানে aboriginal বলতে ওই মানুষ ও প্রাণীকে বুঝিয়েছেন,যারা আদিকাল থেকে একই স্থানে বসবাস করছেন ও পরিচিতি পেয়েছেন । অন্য দিকে Oxford advanced Learner’s Dictionary Aboriginal means a member of race of people who are the original people living in a country, especially in Australia/Canada (Sixty Edition :Edited by Salley Wehmeir: Oxford university press :2001-2003). Webster new world dictionary- তেও একই বিষয়ে আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে- The first people known to have lived in a certain place or region which was not under anybody’s control/possession are to be termed as aborigines of adivashis. উপজাতিয় নেতৃবৃন্দ, কিছু বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, উপজাতিদের কিছু দালাল, বিদেশী মদতপুষ্ট কিছু বাঙ্গালী রূপী শয়তান সহ অনেক উপজাতি দাবি করছে তিন পার্বত্য জেলার উপজাতিরা হচ্ছে আদিবাসী ।কিভাবে তারা নিজেদেরকে আদিবাসী দাবি করছে? তা আজ প্রশ্ন পার্বত্যবাসীর, সুশীল সমাজের, দেশপ্রেমিকদের, ছাত্র সমাজের, সকল স্তরের জনগন সহ সরকারের ।কারণ উপজাতিরা এই এলাকায় পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মা, চীন, ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা থেকে সেই দেশের সরকার কর্তৃক তাড়িত হয়ে আমাদের বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে ঠাই নিয়েছে। উড়ে এসে জুড়ে বসে তারা দাবি করছে আমরা এই এলাকার আদিবাসী আর বাকীরা সবাই বহিরাগত, অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পার্বত্য এলাকার আসল আদিবাসী বাঙ্গালীরা। অন্যদিকে তিন পার্বত্য জেলার ইতিহাস ও সমগ্র বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তিন জেলার ১৩টি উপজাতি চাকমা, মগ, মুরং, কুকি, খুমি, বনজোগী, পাংখো, লুসাই, তংচঙ্গা, বোমাং, রাখাইন, খিয়াং, ত্রিপুরা মূলত ১৬০০-১৯০০সালের মধ্যে বিভিন্ন জায়গা/দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে অত্র অঞ্চলে বসবাস শুরু করে।

চাকমারা কোথা থেকে এসেছে তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে আমরা পাই। লেখক কর্ণেল ফেইরি “The History of Barma” নামক গ্রন্থের ৩৯ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন চাকমারা এক সময় ব্রম্ম দেশে ছিল। ব্রম্ম দেশটি বর্তমানে মায়ানমার নামে পরিচিত। এছাড়া ১৭৮৭ সালের ২৪ জুন ব্রম্ম রাজ কর্তৃক চট্টগ্রামের শাসনকর্তাকে লিখিত এক চিঠি থেকে একটি সঠিক ইতিহাস বের হয়ে আসে। তা হল – চাকমারা ব্রম্ম দেশে শান্তি ভঙ্গ করে, রাজশক্তি অবমাননা করে পার্বত্য চট্টগাম অঞ্চলে পালিয়ে আসে এবং সেখানে বসবাস শুরু করে এবং তারা ডাকাতি বৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। আর এই জন্য ব্রম্ম রাজা তৎকালীন চট্টগ্রামের শাসনকর্তাকে লিখিত চিঠির মাধ্যমে তার দেশের বিতাড়িত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর জন্য আবেদন করেন । এই ঐতিহাসিক চিঠির মাধ্যমে প্রতিয়মান হয় যে চাকমারা এই অঞ্চলে আদিবাসী নয় বহিরাগত। তাছাড়া ইতিহাস থেকে আরো জানা যায় যে, চাকমারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত যারা মূলত: দক্ষিণ চীনের ইউনান প্রদেশের আদি অধিবাসী। তাদের উগ্রবাদী আচারণ, স্বেচ্চাচারীতায় অতিষ্ঠ হয়ে তৎকালীন চীন সরকার তাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে দেয়।সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে চাকমারা থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু থাইল্যান্ডের রাজাও তাদেরকে বিতাড়িত করলে তারা মায়ানমারে আশ্রয় নেয়। ১৭৮৪ সালে বার্মা যুদ্ধে মগদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে ইংরেজদের পরোক্ষ সহযোগিতা নিয়ে চাকমারা পার্বত্য চট্টগামে বসবাস শুরু করে। কুকী গোত্রের উপজাতিরা যেমন:বোমাং, লুসাই, পাংখো, বনজোগী, মুরং, খুমিরা মায়ানমার, চীনের বিভিন্ন প্রদেশ, ও উত্তর ভারত হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। এরপরে বসতি স্থাপন করে ত্রিপুরা গোষ্ঠীর বিভিন্ন উপজাতি যেমন: রাখাইন, খিয়াং. ত্রিপুরা, তংচঙ্গারা।

উপরের আলোচনা এটি সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিয়মান হয় যে,বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের বসবাস, আদিবাসীদের নয়, শুধুমাত্র জাতিসংঘ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা রাষ্ট্র বানানোর জন্য তারা নিজেদেরকে আদিবাসী দাবি করছে । কাকের গায়ে ময়ূরের পেখম লাগালে যেমন কাককে ময়ূর বলা যাবে না তদ্রুপ উপজাতিরা যাই কিছু করুক, বলুক না কেন তাদেরকে আদিবাসী বলা যায় না, যাবে না। সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে যে সব ব্যক্তি, পত্র পত্রিকা, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া উপজাতিদের আদিবাসী করার অপপ্রচেষ্ঠা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করে তাদের অচিরেই বিচার করা দরকার।

আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা একটি রাষ্ট্র বানানোর জন্য ভারত অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে উপজাতিদের সহযোগিতা করছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে একশটির (১০০টির) বেশি খ্রিস্টান মিশনারি চাকামা সহ সকল উপজতিদের খ্রিস্টান বানানোর কাজে ব্যস্ত, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন- সি.এইচ.টি কমিশন, ইউ.এন.ডি.পি ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থার মাধ্যমে চাকমাদেরকে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে মধ্যপ্রাচ্যের ঈসরাইল রাষ্ট্রের মত পার্বত্য চট্টাগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করছে, যা পার্বত্য চট্টাগ্রামে কর্মরত এনজিও সংস্থাগুলোর প্রতিদিনের কর্মকান্ড থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়।

পার্বত্য চট্টগাম নিয়ে যে ধুম্রুজালের সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনের জন্য আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে-
১)উপজাতিদের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত শিক্ষা-দীক্ষায় অর্থনৈতিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে, সামাজিক ভাবে সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে বাঙ্গালীদের সকল ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
২)অতিদ্রুত চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্ত্র মুক্ত করা। সন্তু বাহিনীর কাছে কেন অস্ত্র আছে?সেই অপরাধে, শান্তিচুক্তির শর্ত ভঙ্গকারী হিসেবে তার উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অতিদ্রুত এর বিচার করা।
৩)শিক্ষা, চাকুরী সকল ক্ষেত্রে উপজাতি কৌটা বাতিল করে বৈষম্যহীন পার্বত্য কৌটা চালু করা।
৪)পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ডকে একটি সরকারী ফ্রেমে নিয়ে আসা।
৫)পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশীদের আনাগোনার প্রতি গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করা।
৬)পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সীমান্ত এলাকাগুলো সুরক্ষার জন্য কাটা তারের বেড়া নির্মাণ করা, সীমান্ত এলাকাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা।
৭)বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি করা।
৮)যে সকল উপজাতি প্রশাসনের উচ্চ পদে থেকে নিচু স্তরের উপজাতিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কিয়ে দিচ্ছে এবং প্রশাসনে বসে তাদেরকে আশ্র্রয় দিচ্ছে তাদেরকে সনাক্ত করে অতিদ্রুত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সকল পজেটিভ পদক্ষেপ অতিদ্রুত নিতে হবে না হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের অখন্ডতা বজায় রাখা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে।