ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

’৭১-এ যে বেতার সাধারণ মানুষকে জাগরণের গাণ শুনিয়েছল, আমজনতার রক্ত কণিকায় স্পন্দন যুগিয়েছিল, সেই বেতার আজ আশ্চর্য রকম নীরব! কেন? তখন টেলিভিশন ছিল পাকি সরকারের হাতের মুঠোয়, আজ বিটিভি’র নিয়ন্ত্রন তো স্বাধীনতার পক্ষের হাতে। আজও বেঁচে আছেন আপেল মাহমুদ, স্বপ্না রায়, সাবিনা ইয়াসমিন, আব্দুল জব্বার-রা। তাদের ডাকলে কী আজ গলা ছেড়ে গাঁইতে পারেন না, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি/ মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি কিবাং আমরা তোমার ‘শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে/… তোমার ভয় নেই নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি…’। স্বপ্না রায়-কে অনুরোধ করলে কি তিনি গাইবেন না, ‘জয় বাংলার জয়’? এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’ গেয়ে জাতীকে শহীদের রক্তঋণের দায়বদ্ধতার কথা স্বরণ করিয়ে দেবেন না? প্রজন্ম চত্বরের খুব কাছেই যে বেতার কেন্দ্রটা সেটা কি প্রজন্ম-বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়ে সবকটা জানালা খুলে দিতে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না?

যে ভূমিকা অনলাইন অ্যাক্টিভেটররা নিয়েছেন, তাদের সাথে বেতার টেলিভিশন যোগ হলে কী অজপাড়াগাঁয়েও পৌঁছে দেয়া যেত জাগরণের স্পন্দন। জামাতের মহিলা কর্মিরা তালিমের লেবাস ধরে, ধর্মশিক্ষার নাম করে সহজ-সরলা মা বোনদের সহানুভূতি আদায় করে নিচ্ছে, একমাত্র গণমাধ্যমই পারে তাদের সেই ভুল সহনুভূতিকে রুখতে।

মোস্তফা মনোয়ার, বেলাল মোহম্মদরা বেঁচে আছেন। তাঁদেরকে নিয়ে বেতার-টেলিভিশনে জাগরণের ডাক দিলে তাঁর ফল ইতিবাচক হতো নিশ্চয়ই।বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলো প্রজন্ম চত্বরের খবর শুনিয়ে দায় সারছে ঠিকই। কিন্তু গভীর রাতে টকশো’র নাম করে জাগরণ বিরোধীদের হাজির করছে জাগেরণের পক্ষের বুদ্ধিজীবিদের সামনে। এতে বিরোধী পক্ষের যুক্তিও শুনতে পাচ্ছে জনতা। যারা দোনোমনো ভাব ধরে আছে তাঁরা দোনোমনো থেকে বেরিয়ে আসতে পাচ্ছে না।

আমরা যারা ফেসবুক, অনলাইন, ব্লগে সক্রিয় তারাও কি পারিছি যথাযোগ্য ভূমিকা রাখেতে? ফেসবুকে রাজাকার বিরোধী শ্লোগাণ হয়তো দিনে একবার দিচ্ছি, কিন্তু দশবার নিজের জন্মদিনের উৎসবের, বিয়ের খবর-ছবি, ছেলেমেয়ের ছবি পোস্ট করছি নির্লজ্জভাবে। কেউ কেউ ন্যাকা ন্যাকা ভাব করে বলছি ‘আমার মনটা আজ খুব খারাপ, কারণ আমার পোষা বিড়ালটা আজ খায়নি’! আমাদের, বিশেষ করে মেয়েদের অতিতুচ্ছ একটি ফেসবুকীয় ন্যাকামিতে লাইক-কমেন্ট পড়ছে শত শত। অথচ নিজেকে জাগরণের পক্ষের লোক বলে জাহির করলেও, কেউ আমাদের টাইমলাইনে কোনো জাগরেণর ছবি ট্যাগ করলে ফেসবুক কতৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করছি। অথবা ট্যাগকারীকে মেসেজ করছি, ‘আপনার ছবি আমাকে বিরক্ত করছে, এটা রিমুভ করে নিন প্লিজ!’

বইমেলা চলছে। আমাদের অনেকের বই হয়তো এসেছে বইমেলায়।বইয়ের বিজ্ঞাপনে ভরে ফেলছি ফেসবুকের ওয়াল। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, দেশ-জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে যখন আমাদেরেই কোনো বন্ধু নাওয়া-খাওয়া ভুলে পজন্ম চত্বরে রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে গলা ফাটিয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, অনলাইনে রাজাকার বিরোধী আন্দোলনে ক্ষুরধার কলম চালিয়ে শহীদ হচ্ছেন, তখন আমরা ‘অমুক টেলিভিশনে আজ আমার অমুক বইয়ের জন্য সাক্ষাতকার প্রচারিত হচ্ছে, সবাই দেখুন’ জাতীয় স্ট্যাটাস দিচ্ছি– তখন কী এতটুকু লজ্জাবোধ জন্মাচ্ছে না মনে? ধিক নিজেকে! ধিক এই আত্মপ্রচারকে!