ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে বেরোতেই হয় আমাদের। ঢাকা শহরের বাসিন্দা মাত্রই জানেন, ‘যানজট’ শব্দ টা কি পরিমান ভোগান্তি, আতংক আর অসহায়ত্ত্বের নাম । অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী কিংবা এ্যম্বুল্যান্স এ শায়িত মরণাপন্ন রোগী। সবাই সমান। রাস্তায় নেমে ক্রোধ আর অসহায়ত্ত্বই সবার শেষ সম্বল। হাজার কোটি টাকার জ্বালানী পুড়ে যাচ্ছে কেবল যানজটের কারনে। অনেক কথা হয়েছে। অনেক প্রস্তাব প্রস্তাবনা, জরিপ আর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে যারা এই লেখা পড়বেন তাদের সাথে আমার ভাবনাটা একটু শেয়ার করতে চাই। গণপরিবহন বলতে আমরা যা বুঝি তার একটা অংশের অংশীদার বাংলাদেশ সরকারের বিআরটিসি নামক প্রতিষ্ঠান, আর বাকী অংশের অংশীদার একক ব্যাক্তিমালিকানা ও যৌথমালিকানায় পরিচালিত বেসরকারী বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি।

বেসরকারী খাতে একজন মালিকের একটি থেকে একাধিক এবং কোম্পানি ভেদে পাচঁ থেকে শতাধিক বাস রয়েছে। হিউম্যান হলার, মিনিবাস, বড় বাস, মাঝামাঝি সাইজের কিছু বাসও রাস্তায় চলাচল করতে দেখি যা আমাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনায় উদ্ভাবিত।

কি সরকারি; কি বেসরকারী সবাই যার যার মত করে ভাড়া আদায় থেকে শুরু করে যখন-তখন যেখানে খুশি সেখানে থামানো, যাত্রী উঠানো নামানো সহ তাদের ইচ্ছানুযায়ী গাড়ী না চালানোর সিদ্ধান্ত আমাদের মেনে নিতে হয় বাধ্য হয়েই । নিয়ম নীতির কোন বালাই নেই পরিবহন খাতে।

যেহেতু পরিবহন ব্যবসায়ীরা কেবল ব্যবসা করার জন্যই এই খাতে বিনিয়োগ করেন সেটা মাথায় রেখে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সকল পরিবহন মালিককে একটি নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।

# ঢাকার মধ্য যাত্রী পরিবহনকারী সকল পরিবহনকে একত্রিত করে ৪ টি কোম্পানির আওতায় আনা যেতে পারে।
# কোম্পানির আওতায় আনা সকল পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দিয়ে মূল্যমান নির্ধারণ করে অংশীদারি মূলধন নির্ধারণ করা হবে।
# চলাচলের অনুপযোগী সকল যানবাহন বাতিল করে সেখানে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মালিকগণ পূনরায় বিনিয়োগ করবেন। এবং অর্জিত আয় অংশীদারি মূলধন অনুযায়ী বন্টিত হবে।
# সকল মিনিবাস বাতিল করে অথবা অন্য জেলা শহরে স্থানান্তর করে ঢাকায় একতলা এবং দ্বিতল বড় বাস নামাতে হবে। এতে একসাথে বেশি পরিমান যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। আমাদের এয়ারকন্ডিশন্ড বাসের দরকার নেই একটু বড় আর পরিস্কার সাধারণ বাস হলেই যথেষ্ট ।
# ঢাকার বাইরে উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব, পশ্চিম এই চারটি জোন এ চারটি বাসডিপো স্থাপন করতে হবে। রাতের বেলা সকল বাস সেই ডিপোতে অবস্থান করবে এবং সেখানে স্থাপিত ওয়ার্কসপে সার্ভিসিং এর কাজ করবে।
# একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রন ব্যাবস্থা স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে তার রুট অনুযায়ী রুট নম্বর লাগিয়ে চলাচল করবে। পিক আওয়ারে যে সকল এলাকায় বেশি যাত্রী চলাচল করবে সেখানে অন্যান্য জোন থেকে তাৎক্ষনিক গাড়ি শিফট করা হবে।
# চালকদের উপযুক্ত বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি চালকদের প্রশিক্ষন দেবে এবং বিআরটিএ তা তদারক করবে।
# মূল রাস্তার পাশে একটু ভেতরে যাত্রী উঠানামা করার জন্য বাস-বে তৈরী করতে হবে এবং সেই বাসষ্টপেজ ছাড়া গাড়ী চালক অন্য কোথাও বাস থামাতে পারবে না। চালকের কাজ শুধু নিদৃষ্ট সময়ে নিদৃষ্ট রুট দিয়ে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। যাত্রী কম বা বেশি সেটা চালকের বিবেচ্য হবে না ।
# পরিবহন শ্রমিক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগন অগ্রাধিকার পাবেন। তবে অবশ্য অবশ্যই সকলকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষন গ্রহন করতে হবে।
# সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই করতে পারবে বলে বিশ্বাস করি প্রয়োজন হলে সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মত দেশের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।

ব্যবসায়ীরা যেহেতু তাদের বিনিয়োগের উপর লভ্যাংশের নিশ্চয়তা আশা করেন, উক্ত ব্যবস্থায় তাদের মুনাফা যেমন নিশ্চিত হবে যাত্রীসেবাও তেমন নিশ্চিত হবে। বর্তমানে এই উচ্চ পরিবহন ভাড়া নেয়া সত্বেও কেবল যানজট এর কারনে লোকসানের মুখে একটি পরিবহন কোম্পানিকে বন্ধ হয়ে যেতে দেখেছি আমি। একটি নিয়মতান্ত্রিক গণপরিবহন ব্যাবস্থা গড়ে তুলতে পারলে আমাদের যতটুকু রাস্তা রয়েছে তা দিয়েই আপাত কাজ চালিয়ে নেয়া সম্ভব। দরকার কেবল একটা সিদ্ধান্তের। মনো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ভূ-গর্ভস্থ রেল, অনেক অনেক স্বপ্ন দেখেছি আমরা। বর্তমান মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী আবুলের মত মন্ত্রী নন বলে বিশ্বাস করি । পদ্মা সেতু তো বানাবেনই, আপাতত একটু চেষ্টা করে দেখুন না ঢাকা শহরটাকে অন্তত চলাচলের উপযোগী করা যায় কি না । সবার জন্য শুভকামনা।