ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

আমি ক্ষুদ্ধ, আমি ক্রুদ্ধ । এটিএন বাংলার বার্তা প্রধান জ’ই মামুন বলছিলেন কথাগুলো। মেহেরুন রুনি আর সাগর সারোয়ার এর খুঁন হওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়ায়।

আমরা ক্ষুদ্ধ, আমরা ক্রুদ্ধ, তাতে কি কারোর কিছু আসে যায়……….? যায় না………।

সদ্য স্কুলগামী শিশুর সামনে তার মা-বাবার রক্তাক্ত মৃতদেহ !! কেবল এই ছবিটাই আমরা যারা নিজেদের মানুষ বলে দাবী করি তাদের গালে স্যান্ডেল দিয়ে বাড়ি দিয়ে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট যে, আমরা আসলে মানুষ নই।

আলাদা বিভাগ হলেও একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে মেহেরুন রুনি আমার সহকর্মী। আসা যাওয়ার পথে কেবল হাই-হ্যালো ছাড়া আর কোন সম্পর্ক ছিলো না। অথচ মৃত্যূর পর বুকের ভেতর নিঃশব্দ কান্নাটা কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না। গতকাল বিকেলে জানাজা নামাজ পড়ার সময় কেবল মনে হচ্ছিলো “আমি ক্ষুদ্ধ, আমি ক্রুদ্ধ”

গতকাল সারাদিন প্রতিটা টেলিভিশন চ্যানেলের স্ক্রলের টেক্সট পড়তে পড়তে ক্লান্ত লাগছিলো, আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী থেকে শুরু করে কত কত মানুষ শোক বার্তা পাঠিয়েছেন । আমাদের অথর্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথারীতি তার মন্তব্য জানিয়েছেন, ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটামও দিয়েছেন অপরাধীদের পাকড়াও করার জন্য।

আমার কেবল মনে পড়ছে এর আগেও টেলিভিশন চ্যানেল গুলো ঠিক একিভাবে ব্রেকিং নিউজ, হাই-লাইটেড স্ক্রল আর টক-শো দেখিয়েছিলো যেদিন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ আর এ.টি.এন নিউজ এর সিইও মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। সেদিন কোন চ্যানেল রেখে কোনটা দেখি রিমোর্ট চাপতে-চাপতে পেরেশান । দুর্ঘটনার কারন অনুসন্ধান থেকে শুরু করে বিগত ৫০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় কতজন মারা গেছেন তার হিসেব থেকে শুরু করে কত মানুষ যে কত কথা বললেন টেলিভিশন টক-শো গুলোতে, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। অন্তত ১৫দিন পত্রিকায় অনেক গরম গরম লেখাও লিখেছেন অনেকে। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর দাবীতে শহীদ মিনারে ঈঁদ উদযাপনও করেছেন অনেকে। কতজনের পদত্যাগ দাবী করেছেন কতজন। কাজের কাজ কি হয়েছে কিছু ? সড়ক দুর্ঘটনা কি কমেছে আদৌ ? একজনও কি পদত্যাগ করেছেন ? যে ঘাতক গাড়ী চালক গ্রেফতার হয়েছিলো তার মুক্তির দাবীতে কোন এক মন্ত্রীর প্রত্যক্ষ মদদে পরিবহন শ্রমিকদের মিছিল আর মানববন্ধনও করতে দেখেছি আমরা। যাহা বাহান্ন, তাহাই তেপ্পান্ন। সবকিছু চলছে আগের মতই।
আমি যখন এই লেখাটা লিখি তখন আমার সহকর্মীরা সার্ক ফোয়ারার সামনে মানববন্ধন করছেন। আমকেও যাওয়ার জন্য বলে গেলেন কেউ কেউ । আমি বললাম কি হবে গিয়ে ? এত অসহায় লাগে….। এত অসহায়। এই মাত্র জানলাম পুলিশ বলছে তদন্ত কাজে নাকি অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আসলেই কি হয়েছে কতটা হয়েছে সেটা জানতে আমাদের আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে হয়তো । এত বড় নির্মম ঘটনাটা একটা সময় আমরা সবাই ভুলে যাবো । সব চলবে আগের মতই। আগের মতই আমাদের সম্মানিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্লিপ্তভাবে বলবেন বিগত ২০ বছরের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সর্বোচ্চ ভালো অবস্থানে রয়েছে । নিজের ঘর যেখানে অনিরাপদ সেখানে অসহায়ত্ববোধ করা ছাড়া আমাদের আর কি করার থাকতে পারে। এর আগে কেউ একজন বলেছিলেন “এক্সিডেন্ট ইজ এক্সিডেন্ট” এবার হয়তো বলবেন “খুনঁ ইজ খুঁন” এই এতো টক-শো, এতো মতামত, মন্তব্য কিছুতেই কিছু হবে না হয়তো । আবার একদিন এমন পরিচিত মুখ কেউ একজন খুঁন হবেন, আবার এমনি করেই আমাদের গণমাধ্যম সরব হয়ে উঠবে। মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন করব আমরা। এমন করেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের বিজ্ঞ জনেরা শোকবার্তা পাঠাবেন, আর আমরা যারা তখন পর্যন্ত বেঁচে থাকবো তারা সেই টিভি স্ক্রল পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে যাবো। আবারা ভুলে যাবো । আবার হয়তো এমনি ঘটনা ঘটবে।
কিন্তু যে অসাধারণ মায়াময় মুখের শিশুটির সামনে এই ঘটনাটা ঘটেছে তার জীবন কিভাবে কাটবে। কিভাবে তার মনোজগত তাকে কষ্ট দেবে তার খবর কেউ রাখবো না আমরা। প্রতিদিন এমন অসংখ্য শুভ্র মেঘ আমাদের দৃষ্টির অগোচরে আঁধার কালো মেঘ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আর চলতে পারে না। অনেক হয়েছে। অনেক…..। আমরা ভয়াবহ রকমের ক্ষুদ্ধ এবং ক্রুদ্ধ।