ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কেন জানি না পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, আমরা কিছু মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক তর্ক আর যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে বক্তার গায়ে রং লাগিয়ে দেই। হয় তুমি আমার দলে নয় বিরোধী দলে। সত্যনিষ্ঠ, সত্যানুসন্ধানী একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে মনের মধ্যে যে ভয়াবহ প্রশ্নগুলো খাঁবি খেতে থাকে সেগুলো কাউকে যে বলবো তারও কোন উপায় নেই। মনের গহিনে কেবল শংকা আর ভয়। সংবিধান প্রদত্ত বাক স্বাধীনতার অধিকারবোধ বুকের ভেতর কেবল আকুলি-বিকুলি করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্ম নেয়ার কারনে তৎকালীন সময়ের সেই অসাধারণ বীরত্বগাথা যখন ইতিহাসের লেখনিতে পড়ি তখন আত্মঅহংকারে বাতাসে ভেসে বেড়ায় আমার আপন সত্তা। একই সাথে আফসোস হয় আমি কেন ইতিহাসের অংশ হতে পারলাম না।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৪০ বছর পরেও যখন দেখি- আমি যে ইতিহাস জানি সেটা খণ্ডিত ইতিহাস, যখন দেখি স্বাধীনতার ঘোষনা কে দিয়েছিলেন সেটা আদালতকে নির্ধারণ করে দিতে হয়, তখন বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়। কয়েক বছর আগেও যে শিশুটি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস একরকম পড়েছে,মস্তিস্কে ধারণ করেছে, তার পরীক্ষার খাতায় লিখেছে, আজ সে বড় হয়ে দেখছে তার জানাটা ভুল ছিলো। এখন যে শিশুটি তার পাঠ্য বইয়ে ইতিহাসের পড়াগুলো তার হৃদয়ে ধারণ করছে, আগামী দিনে কোন মাননীয় বিচারপতি যদি বলেন এটা ভুল ইতিহাস, তিনি আবার সেটা সংশোধন করেন, তখন কি হবে ? আমাদের বর্তমান ইতিহাসবেত্তাদের শিক্ষা কি প্রশ্নবিদ্ধ হবে না ? আমরা কি কেউ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি নিকট ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটবে না? আর কতদিন চলবে এভাবে? আরো ৪০ বছর? সার্বজনীন ইতিহাস কি আমরা পেতে পারি না?

যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে আদালতে, যখন শুরু হয় তখন মনে হয়েছিলো এবার একটা কিছু হবে, খুব মনযোগের সাথে পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করার চেষ্টা করলাম, কারন এই বিষয়টির সাথে আমাদের জাতিস্বত্তার ইতিহাসের প্রশ্ন জড়িত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কি করে নির্লিপ্ত থাকি ? আমি তো মূর্খ নই, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীও নই, আমার শিক্ষালব্ধ জ্ঞান, আমার অর্জিত জীবনবোধ কি আমার বিবেক কে আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করাবে না কখনো, যদি আমি আমার ইতিহাসটুকু না জানি ?

প্রিয় পাঠক, নিচের লেখাটুকু পড়ুন। এমন লেখা প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে। মনের মধ্যে খটকা লাগে কেবল, আসলে কোনটা সত্যি ? এই মানুষগুলো, যারা এসব বলছে ? কিন্তু নিজের বিবেচনাবোধকে তো প্রবোধ দিতে পারি না। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন এই খবরগুলো পড়ছেন, জানছেন, যে যার মত করে বুঝে নিচ্ছেন। আমি কেন কনফিউসড্ ? সরকার কি সত্যি সত্যিই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তরিক ? গণমাধ্যমের সংবাদ যদি সত্য হয় তবে প্রসিকিউশনে যারা কাজ করছেন তারা কি সক্ষম ? যর্থাথ ? উপযুক্ত ? রাষ্ট্রশক্তি আর সার্মথ্য সঙ্গে নিয়ে এত বির্তকের সীমানা অতিক্রম করে কি প্রসিকিউশন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারতো না? এমন কোন দিন নেই যেদিন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শব্দটা কোন সভা সেমিনারে উচ্চারিত হয় না। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে এমন হেলাফেলা কেন করা হলো, মাথায় আসে না !! সবার জন্য শুভকামনা।

” যুদ্ধাপরাধ বিচারের ট্রাইব্যুনাল যখন গঠন করা হলো তখন এর নাম দেয়া হয়েছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু বিধিমালা সম্পর্কে সারা পৃথিবীতে যখন সোচ্চারভাবে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকল তখন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলতে শুরু করলেন, এটি কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নয়। এটি অভ্যন্তরীণ (ডোমেস্টিক) ট্রাইব্যুনাল। ভাবখানা এমন যে, বিষয়টি আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। যেহেতু আন্তর্জাতিক নয়, আন্তর্জাতিক মহলে এই নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকারই নেই। এভাবেই বিষয়টির একটি ইতি টানার চেষ্টা করেছে সরকার। তার পরও আন্তর্জাতিক মহল কখনোই চোখ বন্ধ করে থাকেনি। শুধু যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নয়, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ আছে। সরকার হয়তো মনে করছে যে, এগুলো আমলে না নিয়ে দেশ পরিচালনা সহজ হবে। আর তাই এসব বিষয়ের প্রতি সরকার বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে যাচ্ছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইতোমধ্যেই আমাদের মহামান্য বিচারকদের মন্তব্যাদি নিয়ে কঠোর সমালোচনা ও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেগুলো বিচার বিভাগ সম্পর্কে সর্বজন শ্রদ্ধার যে আকাঙা, তারই প্রতিফলন মাত্র। আইনের ছাত্র নন এমন সাধারণ মানুষের মনে এখন বিচার বিভাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। অর্থাৎ আমার ভাই যদি খুন হয়, তাহলে বিচার বিভাগের কাছে আমার স্বাভাবিক আকাঙা হবে, খুনি গ্রেফতার হবে এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন আদালত। কিন্তু যদি কোনো আদালত ওই খুনের মামলা আমলেই নিতে না চান, তাহলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে আমার অনাস্থার সৃষ্টি হতে বাধ্য। এসব অবস্থা রাষ্ট্রের ভেতরে অরাজকতার জন্ম দিতে পারে।

যুদ্ধাপরাধ বিচারের ক্ষেত্র সম্প্রতি আদালত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, সে সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি দিয়ে যৌক্তিক মনে হয় না। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে। এ আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাখেন। যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনে তা থাকার কথা। কিন্তু এ মামলার সাক্ষী হিসেবে কিছু দাগি চোর, নারী নির্যাতনকারী ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে আদালতে হাজির করতে পেরেছিল প্রসিকিউশন বা সরকার পক্ষ। তারা সাক্ষী দিতে এসে বিবাদী পরে আইনজীবীদের জেরার মুখে এমন সব কথা বলে ফেলেছেন যে, এ মামলা সাজানোর ক্ষেত্রে সরকারের মতলব অস্পষ্ট থাকেনি। তাদের কাউকে কাউকে আদালতে আনা হয়েছিল, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু দেখা গেল, মুক্তিযোদ্ধা এরা নন। সে কথা আদালতে এরা আসামি পরে আইনজীবীদের জেরার মুখে অকপটে বলেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তাকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেভাবে তিনি সনদ লাভ করেছেন এবং আওয়ামী লীগ নেতার কল্যাণে তিনি মুক্তিযোদ্ধার ভাতাদি গ্রহণ করে যাচ্ছেন। এই হলো মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষীর নমুনা।

ফলে সরকার পক্ষ বিপদে পড়ে গেছে। এখন এরা আর আদালতে সাক্ষীদের হাজির করতে নারাজ। সরকার পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বাকি সব সাক্ষী অসুস্থ, সম্প্রতি তাদের কারো কারো স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত হয়েছে। কেউ কেউ মারা গেছেন। কেউ বা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। ফলে তাদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। যাদের সম্পর্কে সরকার পক্ষ এ রকম বক্তব্য দিয়েছেন, দৈনিক নয়া দিগন্ত তাদের কারো কারো সাথে কথা বলে যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা উদ্বেগজনক। এসব সাীর কেউ কেউ নিজ গৃহেই আছেন। কেউ কেউ জমিজমা চাষ করেন। কেউ কেউ আছেন নিজ বাড়িতেই। কেউ কেউ বলেছেন, সাক্ষী আদালতে গিয়ে এরা সরকার পক্ষের শেখানো মিথ্যা কথা বলতে পারবেন না। একজন পেশায় উকিল, তিনি নিয়মিত তার নিজ এলাকায় বরাবরের মতো ওকালতি করতে প্রতিদিন আদালতে হাজির হচ্ছেন। এ রিপোর্টের কোনো কিছুই সরকার পক্ষ বা সংশিস্নষ্ট সাক্ষীরা অস্বীকার করেননি।

সরকার পক্ষ দাবি করছিল, এরা পুলিশের কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন বলে যে রেকর্ড রয়েছে সেটাকে তাদের সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক। কিন্তু আদালত তো একটা বিচারিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে সাক্ষী হাজির হবেন। তারা পুলিশের কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন আসামিপক্ষে আইনজীবীরা জেরার মাধ্যমে সেটা যাচাই করবেন। তার মধ্য দিয়েই সত্য উদ্ঘাটিত হয়ে আসবে। কিন্তু মহামান্য যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সরকার পরে আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী গড়হাজির সাীদের জবানবন্দীকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পুলিশের তথাকথিত জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে গ্রহণ করা হবে? হতে পারে পুলিশ কোনো সাক্ষীর কাছে যায়ইনি। সরকারের নির্দেশে নিজেরাই মনগড়া রিপোর্ট লিখে দিয়েছে। আর আদালত সেটাকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করবেন। তাহলে ওই আদালত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কী ধারণা হবে? আইনজীবীরা বলছেন, সাক্ষীকে আইন অনুযায়ী আদালতে শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিতে হয়। কিন্তু শপথ না নিয়ে পুলিশের কাছে কিছু বললে তা সাক্ষ্য হয় না। এভিডেন্স গ্রহণ করে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট হয়; কিন্তু সাক্ষ্য হিসেবে তা গ্রহণ করার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ সাক্ষীকে আদালত শুনবেন। অভিযুক্ত পক্ষ তাকে জেরা করবেন। ডিফেন্স লইয়ার ক্রসচেক করবেন। তারপর তা সাক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু পুলিশের দেয়া এভিডেন্সকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। এটা যদি গ্রহণ করা হয় এবং এর ভিত্তিতে যদি বিচার করা হয়, তাহলে সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকে না। বিচারের সাথে সংশিস্নষ্ট বিচারক-আইনজীবীসহ সবাই সে কথা ভালোভাবেই জানেন। “

সূত্র: নয়াদিগন্ত “বেহাল যুদ্ধাপরাধ বিচার”