ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
Ratnodip

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩২) জন্ম বাংলায়, কিন্তু লেখাপড়া মূলত বিহারে। পাটনা কলেজ থেকে বি এ পাশ করে (১৮৯৫) ভারত সরকারের নানা ধরনের কর্মেও বাংলার বাইরে অনেককাল কাটান। লেখালিখির শুরুও ১৮৯৫ সালের দিকে প্রথমে কবিতা, পরে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে গদ্য রচনা। রাধামণি দেবী ছদ্মনামে ছোটোগল্প লিখে প্রথমবারের কুন্তলীন পুরস্কার তিনিই লাভ করেন (১৮৯৭)।
সাহিত্যচর্চার সূত্রে ভারতী-সম্পাদিকা সরলা দেবীর সঙ্গে পরিচয় ও অন্তরঙ্গতা হয়। তার ফলেই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অর্থানুকূল্যে দুই পুত্রের এই বিপত্নীক পিতার পক্ষে বিলেত যাওয়া (১৯০১) এবং ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফেরা (১৯০৩) সম্ভবপর হয়। তবে মায়ের অনুমতির অভাবে ঈপ্সিত বিয়ে হতে পারেনি। প্রভাতকুমার কিছুকাল দার্জিলিং, রংপুর ও গয়ায় আইনব্যবসা করেন। তারপর নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের উৎসাহে মানসী ও মর্মবাণী পত্রিকা-সম্পাদনার সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত থাকেন (১৯১৬-২৯)।

মহারাজারই চেষ্টায় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-কলেজে শিক্ষকতার কর্ম লাভ করেন (১৯১৬-৩২)।

প্রভাতকুমার বিশেষ সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন ছোটোগল্প-রচনায়। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের পরেই তাঁর স্থান স্বীকৃত হয়েছিল। তিনি বাস্তব পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, কিন্তু তার গভীরে প্রবেশ করেননি, এমন কথা বলা হয়ে থাকে। তবে দেশ ও বিদেশের পটভূমিকায় তিনি বহু ঘটনা ও চরিত্র এমনভাবে স্থাপিত করেছেন যাতে তারা প্রাণের স্পর্শ লাভ করেছে। তাঁর গল্পের সরসতা অনেক সময়ে প্রকাশলাভ করেছে রঙ্গ ও ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে, তাই বলে গুরুতর ও বেদনাবহ গল্প যে তাঁর নেই, তা নয়। তাঁর গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ১২, উপন্যাসের ১৪।

প্রভাতকুমারের উপন্যাস সম্পর্কে সমালোচকেরা সাধারণত একমত যে, তাঁর ছোটোগল্পের শিল্পচাতুর্য তাঁর উপন্যাসে নেই। তিনি জীবনকে দেখেছেন উপর থেকে, জীবনের গভীরতায় প্রবেশ করেননি। তাই এতে যত ঘটনা আছে বা চরিত্র আছে, তুলনায় তার তাৎপর্য বিশ্লেষণ নেই, অনেক সময়ে ধারাবাহিকতা নেই। তাঁর উপন্যাসে নাটকের গুণ আছে, উপন্যাসের সমগ্রতা অনুপস্থিত। ‘তিনি প্রথম শ্রেণীর ঔপন্যাসিক নহেন’ একথা বলেও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বাংলা উপন্যাসে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

তাঁর উপন্যাসের বিরূপ সমালোচনা-প্রসঙ্গে প্রভাতকুমার নিজেই বলেছেন যে,

যে-ধরনের ঐক্য (Unity of action) সমালোচকেরা তাঁর রচনায় সন্ধান করেছেন, তা বস্তুত নাটকে প্রত্যাশিত, উপন্যাসে নয়। তিনি ডিকেন্সের উপন্যাসের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, খণ্ড খণ্ড চিত্র সেখানে উপন্যাসের সমগ্রতা লাভ করেছে। বড়োর সঙ্গে ছোটোর এমন তুলনা করায় প্রভাতকুমার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু আমরা লক্ষ করি যে, একই সমালোচকেরা তাঁর কোনো উপন্যাসে চরিত্রসৃষ্টির প্রশংসা, কোথাও-বা ঘটনাবিন্যাসের গুণকীর্তন করেছেন। প্রভাতকুমারের যে-দুটি উপন্যাসকে সমালোচকেরা তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনার মর্যাদা দিয়েছেন, তার মধ্যে একটি রত্নদীপ, অপরটি সিন্দুরকৌটা।

রত্নদীপের কাহিনির বাস্তব ভিত্তি থাকা সম্ভবপর। কোনো প্রতারক কোথাও নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির স্থান অধিকার করার চেষ্টা করেছে, এমন ঘটনা বিরল নয়। তবু সে-ধরনের ঘটনা কী পরিণতি লাভ করে, তা জানতে আমরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করি। ঘটনাসংস্থানে প্রভাতকুমার এখানে যেমন বৈচিত্র সৃষ্টি করেছেন, দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, চরিত্রসৃষ্টিতেও তাঁর নৈপুণ্য তেমনি স্বতঃ প্রকাশিত। রাখাল প্রতারণা করতেই এসেছিল বটে, কিন্তু বৌরাণীর পাতিব্রত্য তাকে শেষ পর্যন্ত অন্যপথে চালিত করে। তার সংযম উচ্চ আদর্শের দ্বারা প্রণোদিত নয়, নিষ্পাপ বৌরাণী প্রতি আন্তরিক প্রণয়সঞ্চারই তার কারণ। এই মানবিকতাই রাখাল চরিত্রকে বাস্তবের সীমারেখার মধ্যে মহত্ত্বদান করেছে। বৌরাণীর পাতিব্রত্যের মূল তার সংস্কারে, এ-কথা যেমন সত্য, তেমনি তার স্বাভাবিক কোমলতা এবং সংসারের মাধুর্যবঞ্চনাজনিত দুঃখবোধ একসঙ্গে মিলে সে-পতিপ্রেমকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। রাখালকে স্বামী বলে জানার পর তার প্রতি ধাবমান প্রেমকে বৌরাণী যেভাবে ভুল-ভাঙার পর ফিরিয়ে এনেছে, তা তার চরিত্রের ট্রাজিক পরিণামকেই প্রকাশ করেছে। খগেনকেও লেখক অবিমিশ্র পাষণ্ড করে আঁকেননি এজন্যও তিনি সমালোচকদের প্রশংসা লাভ করেছেন।
রত্নদীপ উপন্যাসে পাপ-পুণ্যের তৌল বিচার প্রভাতকুমার করেননি। পাপের প্রতি নাহলেও দুষ্টের প্রতি তিনি সহানুভূতি বোধ করেছেন। মানুষের প্রবৃত্তির নিন্দা তিনি করেননি, প্রবৃত্তির আকর্ষণের মাধুর্য সত্ত্বেও প্রয়োজনে তা যে মানুষ জয় করতে পারে, ঔপন্যাসিক তা-ই দেখিয়েছেন। রতœদীপের পরিণামে ঠিক পুণ্যের জয় দেখানো হয়নি, মানুষের মনেই বিরুদ্ধভাবের সমাবেশ তাকে কখন কোন দিকে নিয়ে যায়, তা-ই এতে দেখানো হয়েছে। রাখাল ও বৌরাণী উভয়ের চরিত্রে যে বিজন মনুষ্যত্ব আছে, পাঠক তাকেই সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে এবং উপভোগ করেছে।
সাহিত্যকীর্তি গ্রন্থমালা আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের একটি সিরিজ প্রকাশনা।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাত ধরেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আখ্যায়িকার শুরু, এ-কথা বলা যায়। ১৮৫৪ সালে তিনি কবি কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকের উপাখ্যানভাগ বাংলায় পরিবেশন করেন। এরপর প্রায় শতবর্ষ ধরে বাংলা কথাসাহিত্যের যে-বিকাশ তার শীর্ষস্থানীয় গ্রন্থগুলোকে পাঠকের কাছে একত্রে তুলে দেওয়ার আকাংখায় সিরিজটি পরিকল্পিত হয়েছে।সারা বিশ্বের বাংলাভাষীদের কাছে সাহিত্যকীর্তি গ্রন্থমালার প্রথম সম্ভারে ১২টি বই এবং এর ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় সম্ভারে আরো ১২টি বই দুই সেটে মোট ২৪টি বই পাওয়া অত্যন্ত খুশির বিষয় হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সম্পাদিত সাহিত্যকীর্তি গ্রন্থমালা শিরোনামে আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের গ্রন্থমালায় যে গ্রন্থগুলো রয়েছে তার অধিকাংশই বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু হয়ে প্রায় শতবর্ষ ধরে বাংলা কথাসাহিত্যের যে-বিকাশ তার শীর্ষস্থানীয় ২৪টি গ্রন্থকে সম্পাদক এখানে একটি মালায় গেঁথেছেন। মালা থেকে যেকোনো একটি গ্রন্থ আলাদা করে নিলেও পাঠক বাকিগুলোর সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না—তিনি পূর্ববর্তী বা পরবর্তী গ্রন্থের সন্ধান করতে পারবেন। উপরন্তু গ্রন্থমালায় কয়েকটি গ্রন্থকেসম্পাদক নতুন করে পাঠকের সামনে এনেছেন বলা যায়।

 

বইগুলো তো পড়ার মতো, বারবার পড়ার মতো।

 

সাহিত্যকীর্তি গ্রন্থমালা—আনিসুজ্জামান সম্পাদিত \ প্রচ্ছদ: সাইম রানা
রত্নদীপ : প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১২
প্রকাশক : অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ২২ সেগুন বাগিচা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
ফোন : ৯৩৪৭৫৭৭, ৮৩১৪৬২৯
প্রচ্ছদ: সাইম রানা
মূল্য : ৩০০/-
আইএসবিএন : ৯৭৮-৯৮৪-২০-০১২০-৪