ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

গতকাল শেষ হল দেশের প্রধান প্রধান সংবাদ পত্রের সম্পাদকদের সাথে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির শেষ বৈঠকটি।
কমিটি রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক সহ সমাজের গন্যমান্য ব্যাক্তিদের মতামত শুনেছেন। এখন উনারা সিদ্ধান্ত নিবেন পরবর্তী করনীয় নিয়ে। এখন এখানে একটি সমস্যা হল বিরোধীদল । তারা ইতিমধ্যে এটাকে সরকারের ষড়যন্ত্র বলেছে, যার কারনে প্রধান বিরোধী দলের নেতাকে আমন্ত্রন জানানো হলেও তিনি আসেন নাই, উল্টো এটাকে একটি দুরভিসন্ধি বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কমিটি গঠনের সময় ১ বা ২ জন সদস্য দেয়ার জন্য অনুরোধও তারা রাখেন নাই। এ অবস্থায় বুঝাই যায় দেশ একটা অনাকাঙ্খিত সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এটা কি দেশ বাসী আশা করে ? না।

বিগত সরকার গুলো এ পর্যন্ত যতবার সংবিধানকে কাটাছেড়া করেছে, তার কোন বাড়ই এভাবে সংলাপ বা মতামতের ব্যবস্থা না করে ইচ্ছেমত সংশোধন, সংযোজন বা কর্তন করেছেন। বর্তমান সরকার দুই -তৃতীয়াংশের বেশী আসন নিয়া এখন একক ভাবে সরকার চালনা করছে, তারা ইচ্ছা করলে হয়ত এভাবে সংলাপ না করেও সেই ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যেতে পারত, কিন্ত সম্ভবত সংঘাত ও দাঙ্গা-ফ্যাসাদ এড়াতেই সম্ভবত তারা ঐ সংলাপের ব্যবস্থা করেছিল। এখানে বিরোধীদল তাদের দাবিগুলো কমিটিতে গিয়ে বললে কি তেমন কোন সম্মানের হানি হত ? আমার তো তা মনে হয়না, বরং তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যেত। তাই বিরোধী দলের কাছে অনুরোধ এভাবে অহেতুক অনাকাঙ্খিত ইস্যু না বানিয়ে জনগনের যাতে ভাল হয়, যাতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় তার জন্য সরকারকে সহোযোগিতা করুন। আর সরকারের নিকট অনুরোধ আপনারা ক্ষমতায় এর মানে এ নয় যে আপনার যা ইচ্ছা বা যেভাবে ইচ্ছা আচরন করতে পারেন, এটা বর্জন আপনাদের জন্যই বেশী মঙ্গল ও লাভ জনক।

সংবিধান সংশোধনের জন্য অনেক দাবিই উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু গত কাল মাহমুদুর রহমান এক অদ্ভুদ পরামর্শ দিলেন, আর সেই পরামর্শ বিএনপির মুখে আজ শোনা গেল। এটা বড়ই হতাশার । যেখানে ৯৯% সম্পাদক বলেছেন ঐক্যমতের কথা, সেখানে মাহমুদুর রহমান একটা অমূলক ও সম্পূর্ন অযৌক্তিক প্রস্তাব দিয়া বিরোধীদল ও সরকারী দলের সাথে বিভাজন তৈরী করলেন। এ যেন কাটা ঘায়ে লবনের ছিটা। তার মানে আমরা অনেক আগে থেকেই জানি বিএনপির মুখপত্র “দৈনিক আমার দেশ”। তাই উনি বৈঠকে আসার আগে এরকম একটা হঠকারী প্রস্তাব উনার নেত্রীর সাথে বসেই নিয়ে এসেছেন, যার ফলে আজ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব একই সুরে কথা বলেছেন। জনাব মাহমুদর ও ফখরুল সাহেবরা নিশ্চয়ই জানেন সংবিধান সংশোধনে সাংবিধানিক পরিষদ প্রয়োজন নয়, এটা কেবল নতুন কোন সংবিধান প্রনয়ন করার জন্য প্রয়োজন হয়। আর আজ যদি এ পরিষদ গঠন করার দরকার হয়, তাহলে আপনারা যখন সংবিধান কাটা-ছেড়া, সংযোজন বা বিয়োজন করেছিলেন, তখন কেন এ পরিষদ গঠন করেন নাই ? তাই অনুরোধ দেশকে সংঘাত বা ক্ষতির মধ্যে না ফেলে যদি দেশকে ভালই বাসেন দয়া করে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করুন। তাতে আপনাদের মর্যাদা বাড়বে, কমবে না। জনাব মাহমুদুর সাহেবকে বলি, মানুষ পাবলিসিটি পায় দুই উপায়ে, এক- কোন জঘন্য কাজ করে; আর দুই – কোন ভাল কাজ করে। দয়া করে দেশের সংঘাত তৈরী আর না করে এবার ভাল কিছু করুন।

সংবিধান সংশোধনে নাগরিক মতামত সরকার নিতে পারত, কিন্তু কেন নিলো না জানিনা। কারন আজকাল আধুনিক যুগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভোট নিতে পারতেন। সেখানে তারা বিশেষ কিছু বিষয় নিয়া জাতীর মতামত বা ভোট নিতে পারতেন এটা তাদের স্বচ্ছতা আরো বাড়িয়ে দিত। তাই সরকারকে আমি দেশবাসীর পক্ষথেকে অনুরোধ করব, দয়া করে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে ইলেক্ট্রনিকস পদ্ধতিতে ইন্টারনেট ভোট বা ই-ভোট নিয়া জাতীর একট মতামত নিন। এজন্যে ভোটার আইডি কার্ড নম্বর ব্যবহার করতে পারেন, একটি আইডি একটি ভোট দিতে পারেবে। আশা করি সরকার একটু ভেবে দেখবেন।

বিশেষ করে ১। রাষ্ট্র ধর্ম ২। বিসমিল্লাহ ৩। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিক দল ৪। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, ৫। তত্ববাধায়ক সরকার ও ও এ নির্বাচন পদ্ধতি এবং ৬। সংসদ সদস্যদের দলের বাইরে এসে ভোটাধিকার ।

উপরোক্ত বিষয় গুলোর মধ্যে আমার কিছু মতামত তুলে ধরলামঃ

১। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম রাখা উচিত ২। বিসমিল্লাহ বাদ দেয়া ঠিক হবেনা। ৩। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, কারন এরাই আমাদের দেশে সাম্প্রদায়ীক বিভাজন বা দাঙ্গার জন্মদাতা। এটা এক ধরনের ধর্ম ব্যবসাও বটে, যা আমাদের পবিত্র কোরআন সম্পূর্ন নিষেধ করেছেন। কিন্তু সংবিধানের আইন কানুন সংশোধন করে, আধুনিক ও ন্যায় সংগত করা যেতে পারে। যেহেতু দেশের ৯০% মুসলিম, তাই আইনগুলো কোরআনের আলোকে করলে কারই তেমন ক্ষতি হবার কথা নয়। তবে পারিবারিক আইন গুলো যার যার ধর্মানুসারে থাকতে হবে।

রাস্ট্রপতি নির্বাচন বর্তমান পদ্ধতিতে করা উচিত নয়। এটার জন্য নিরপেক্ষ ব্যাক্তি নির্বাচনে দাড়াবেন এবং সংসদ নির্বাচনের সময় জনগণ দুটি ভোট দিবেন। এতে রাস্ট্রপতি গ্রহন যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাও বাড়বে, আবার নির্বাচনের জন্য আলাদা ব্যয়ও হবেনা। এ একই পদ্ধতিতে সংসদের দুইজন স্পিকারও নির্বাচন করা যেতে পারে এতে সংসদের বিতর্কিত অবস্থার অবসান হত।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা আরো বাড়ানো এবং প্রধান মন্ত্রীর আজ্ঞাবহ হতে আলাদা রাখা উচিত। তাতে প্রধান মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাজের একটা ভারসাম্যও তৈরী হবে।

সংসদ সদস্যরা তোতা পাখির মত দলের নেতার কথায় সর্বদা সুর মেলান। কারন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তার সদস্যপদ বাতিল, শো-কজ সহ ইত্যাদি অনাকাঙ্খিত অবস্থা আমরা পূর্বে অনেক দেখেছি, তাই এ ধারা বাদ দেয়া উচিত।

আর একটি বিষয় হল, সংসদে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতির ক্ষেত্রে ৯০ কর্ম দিবস নয়, আমরা চাই ৬০ দিন অনুপস্থিত থাকলে শোকজ, এবং ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলে আপনা-আপনি সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাওয়া, তাহলে আর ঘরে বসে বা রাস্তায় বসে বসে উনারা জনগনের টাকা-পয়সা ভোগ করতে পারবেন না, এবং নিজ এলাকায়ও দায়বদ্ধ থাকবেন।

আমাদের এই আধুনিক যুগে অবশ্যই সংসদ সদস্যদের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিগ্রী করা বাঞ্ছনীয়।

পরিশেষে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত একটা সংবিধানের প্রত্যাশায় রইলাম। তবে দয়া করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে কোন মতেই স্থান না দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারন আমরা বাংলাদেশকে আর একটি ইরাক বা লিবিয়া বা আফগানিস্তান বা পাকিস্তান হিসাবে দেখতে চাইনা। আমরা সারা বিশ্বে সম্মানের সাথে বাঁচতে চাই, সন্দেহের চোখে নয়।

ধন্যবাদ সবাইকে।
***
মেইল : truetalk@journalist.com