ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

বিএনপি-জামাত জোট আগামী রবিবার-সোমবার টানা ৩৬ ঘন্টার হরতাল ডেকেছে। কেন ডেকেছে তা বিএনপির ভাষায় নিম্ম রুপ :

মির্জা আলমগীর জানান, একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্কের ধারা বিলুপ্তির অপচেষ্টা, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সঙ্কট, পুঁজিবাজার ধ্বংস রোধে সীমাহীন ব্যর্থতা ও ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর অর্থ লুণ্ঠনের প্রতিবাদে এই হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রায় একই ইস্যু জামাতেরও। তারা অবশ্য তাদের নেতাদের যুদ্ধাপরাধ ইস্যুও যুক্ত করেছে।

আমার প্রশ্ন হল;

** তারা যদি এসবের জন্য বিশেষ করে (তাদের ভাষায়) “একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্কের ধারা বিলুপ্তির অপচেষ্টা” এর দাবিতে রাজপথে হরতাল ডাকে তাহলে জনগন কেন তাদের ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছিল ?

** তারা এর জন্য সংসদে গিয়ে তাদের আপত্তি একবারও তুলেছিল?

** কেন তারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে ০২ জন লোক চাওয়ার পরও দিল না?

** কেন খালেদা জিয়াকে কমিটি বার বার ডাকার পরও সেখানে গিয়ে তার মতামত দিল না ?

** সংসদে না যেতে চাইলে কেন তারা সংসদ থেকে পদত্যাগ করে নাই, বরং নিয়মিত সকল সুবিধাদি (নিরাপত্তা, বাড়ী, বেতন-ভাতা সকল সুবিধাদি)

** বর্তমানে কেন তারা এই দাবী সংসদে গিয়ে না তুলে বাইরে জনগনের জীবন অতিষ্ঠ করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে ?

** বিএনপি দেশে সবচেয়ে বেশী সময় ধরে শাসন করেছে ০৪ বার। তার মধ্যে খালেদা প্রধান মন্ত্রী হয়েছে ০৩ বার। তাদের দাবীর জাতীয় সমস্যাগুলো একের পর এক সরকার ঘুরপাক খাচ্ছে, কই তার আমলেও তো কোন সমাধান পাই নাই। তাহলে সেই একই সমস্যা নিয়ে কেন আজ জাতির ভোগান্তির নামে নৈরাজ্য তৈরীর নীল নকশা তৈরী করা হল ?

** প্রশ্ন আসতে পারে আওয়ামী লীগ্‌ও তো হরতাল করেছিল, তাহলে বিএনপির দোষ কোথায় ? দোষ অবশ্যই, আওয়ামি লীগের হরতাল, মানুষ পছন্দ করে নাই, এটাও করেনা বা করবে না। আর “তুমি অধম তাই বলে আমি উত্তম হইব না কেন ?”

** আজ দেশে যুদ্ধাপরাধীরা তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে কারন কি ? আমরা কি এটা ধরে নিতে পারিনা যে, “যেহেতু বিএনপি এ বিচারের গোড়া থেকেই বিরুদ্ধে, তাই তারা যদি কোন রকম ক্ষমতায় যেতে পারে তাহলে এ বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হবে,আর একটা নতুন অধ্যাদেশ জারী করে চিরতরে সব রাজাকার-স্বাধীনতা বিরোধীদের নির্দোষ ও নিরাপরাধ প্রমান করে দিবে? সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মত।

** যুদ্ধাপরাধীর বিচার এদেশের সকলের প্রাণের দাবী। এর সাথে বর্তমান সরকারই কানামাছি খেলছে, আর বিএনপি ক্ষমতায় না থেকেই এর বিরোধীতা করছে, আর ক্ষমতায় গেলে তো একেবারেই বাতিল হয়ে যাবেনা তার নিশ্চয়তা কি ? আর বাতিল করার জন্য ক্ষমতায় যেতে হবে, তাই এটাও হরতালের একটি কারন নয় কি ?

তাই আমার বক্তব্য স্পষ্ট,

বিএনপি মূলত যে কারনে আজ সরকার বিরোধী প্রচারণা করছে, হরতাল দিচ্ছে তা হল নিম্নরূপ:

** যদি আওয়ামি লীগকে হটিয়ে তারা ক্ষমতায় যায় তাহলে প্রথমেই যুদ্ধাপরাধ ইস্যু ও তাদের বিচার প্রক্রিয়ার সকল কার্যক্রম পরিবর্তন করে জামায়াতের অনুকূলে নিয়ে যাবে, এবং একটা লোক দেখানো প্রক্রিয়ায় তাদের নির্দেশ প্রমানিত করে সম্মানিত করবে।

** তারেক-কোকোর মামলাগুলো চলমান। যে মামলার সকল তথ্য সাধারণ জনগন পর্যন্ত জানে, সেটাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তার মামলাগুলো থেকে তাকে পুরো-পুরি খালাস করা হবে।

** খালেদার বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা চলমান সেগুলোও বর্তমান সরকারের ন্যায় নির্লজ্জভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।

** যে সব সম্পদ ও টাকা হাত ছাড়া হয়েছে তা কিভাবে ফেরত আনা যায় তা সম্ভব সবই করবে।

ঐ সব কাজগুলো সম্পাদন করতে হলে এ সরকারকে যত দ্রুত হটানো যাবে ততই মঙ্গল। কারন সরকার ক্ষমতার পুরো মেয়াদ থাকলে হয়ত তাদের আশা পুরুন নাও হতে পারে। কারন সরকার হয়ত এরই মধ্যে অনেক মামলা মীমাংসা করে ফেলবে এবং তার রায় কার্যকরও করতে পারে। তাই বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল ও তারেকের ইমেজ যাতে নষ্ট না হয় তার জন্যই এ সরকারে বিদায় অতি জরুরী। তা না হলে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটতেও পারে।
আর এটাই হরতালের মূল কারন।

আমরা জনগন হলাম বলির পাঠা। সবাই (সরকার ও বিরোধী দল) সব কিছুই করে জনগনের জন্য (???!!!) আর আখের গোছান তাদের নিজেদের । এই হলাম তাদের ভাষায় আমরা জনগন।

তাই সরকার ও বিরোধী দলকে অতি বিনয়ের সাথে বলতে চাই

” দেশটা আপনাদের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি নয়, দেশের জনগন দেশটা আপনাদের কাছে বেচে দেয় নাই, বা আমরা সাধারণ জনতা আপনাদের গোলাম বা বাদী নই যে, যখন তখন আমাদেরকে আপনারা পণ্য হিসাবে চালিয়ে দিবেন।” দয়াকরে আমাদের ক্ষমা করুন। আমরা আপনাদের কাছে হাতজোড় করে বলছি, “আমরা আপনাদের হাত হতে পরিত্রাণ চাই।”

অন্যদিকে বিএনপি আমাদের জাতিকে কি এই হলফনামা দিতে পারবে যে,

** তারা ক্ষমতায় গেলে তারা আজ যে সকল জাতীয় সমস্যার কথা বলছে, তা থাকবেনা ?

** বিদ্যুৎ সমস্যা, দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সমস্যা, পরিবহন সমস্যা, আইন-শৃঙ্খলার দুরাবস্থা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, চাঁদাবাজী, হল দখল, সাধারন মানুষের উপর স্থানীয় নেতাদের দমন-নিপীড়ন ও অবৈধ দখল বানিজ্য, টেন্ডারবাজি, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, শেয়ার মার্কেট স্থিতি করা, আবাসন সমস্যা, স্থানীয় দলীয় ক্যাডার বাহিনী দিয়ে অন্যদের ঘায়েল করা ও নিয়মিত মাসোহারা আদায় ইত্যাদি আর থাকবে না?

** তারা ক্ষমতায় গেলে প্রকৃত ও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে কোন প্রহসনের বিচার করবে না। আর এজন্য তাকে বিশ্বাস করার এমন কী মানদণ্ড আছে যা আমরা বিশ্বাস করতে পারি?

** যদি আপনারা উপরোক্ত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে না পারেন; আর জনগন যদি এর প্রতিবাদ করে বা আপনাদের ব্যর্থতা যদি জনগন তুলে ধরে, তবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে নির্বাচন দিবেন, এবং সেখানে প্রশাসনকে দলীয় কাজে ব্যবহৃত হতে বাধ্য করবেন না ? আর জনগস যেভাবে নির্বাচন চাইবে সেভা্‌বেই দিবেন ?

পারবেন কি উপরোক্ত বিষয়গুলো জাতীর সামনে প্রকাশ্যে কোন জনসভায় দলিল আকারে প্রকাশ করতে?

আর যদি তা না পারেন, তবে কোন অধিকারে আপনারা বার বার আমাদের জীবনকে অনিষ্ঠ করে হরতাল, হামলা, দাঙ্গাবাজি, ভণ্ডামী ইত্যাদি কেন করছেন? আমরা কি আপনাদের কেনা গোলাম?

***
ফিচার গ্রাফিক্স: দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সমকাল, দ্য ডেইলি স্টার এবং দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ