ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

অনশনে খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখছেন

গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আট ঘণ্টার গণঅনশন শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে। অনুষ্ঠানে বেগত জিয়া আসেন বেলা ১২টায়। অনুষ্ঠানের সমাপনী ভাষন দেন খালেদা। সেখানে তিনি বিকেল ৫.১০ মিনিট হতে ৬.১০ পর্যন্ত এক ঘন্টার বক্তব্যে যে সকল বক্তব্য প্রদান করেন, তারই আলোকে আমার মত আম জনতার কিছু প্রশ্ন তৈরী হয়েছে। আর তা আপনাদের সাথে শেয়ার না করে পারলাম না। যদি আপনাদের বিরক্ত করে থাকি তবে মার্জনা করবেন।

১। তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন যদি তারা ক্ষমতায় যান তাহলে সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিবেন।

তিনি বলেছেন সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে। কিন্তু কেন ? ধরে নিলাম এখানে জিয়ার শাসনকে অবৈধ করা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য পথ তৈরী করা হয়েছে, ইসলাম ধর্মের সাথে সাথে অন্য ধর্মকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে, তত্ত্বাবধায়কের মত একটি অ-গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে বাতিল করা হয়েছে ইত্যাদি আপনি মানতে পারেন নাই। তাই বলে সংবিধান “ছুড়ে” ফেলে দেবেন কেন ? এটা কি কোন ছেলে খেলার জিনিস বলে আপনারা প্রমান করতে চান ? তাহলে বলে দিন সংবিধানের প্রয়োজন নেই। আমাদের এই সংবিধান, সংবিধান করে আপনাদের গলাবাজী ও দোহাই আর শুনতে হবেনা, আর কোন ঝামেলাও থাকবেনা। নেত্রীকে আমার প্রশ্ন, “আজ যদি আপনি ক্ষমতায় থাকতেন, আর আপনি আপনার মত সংবিধান কাটাছেড়া করতেন (যেমন জিয়া তার ইচ্ছামতো করে গোছেন, এবং তার নিজের ক্ষমতা বৈধ করে গেছেন, এরশাদ করেছেন, আপনি আগের টার্ম করেছেন), এর পর হাসিনা যদি এভাবে বলত তাহলে আপনি বা আপনার মওদুদরা কি এটাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলতেন না ?” তাই আজ যদি কেউ আপনার বক্তব্যের আলোকে এটাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলেন বা সে অভিযোগে অভিযুক্ত করেন তা কি খুব ভুল বা অন্যায় হবে ? জাতি কি আপনাদের মত দায়িত্ববান ব্যাক্তিদের কাছ থেকে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আশা করেছিল বা আশা করতে পারে ? আপনার এ বক্তব্য জাতিকে আজ আবার ভাবতে বাধ্য করছে সংবিধান বিষয়টি কি আসলে আপনারা বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তাদের মেনিফেস্টো এবং আওয়ামিলীগ হলে তাদের মেনিফেস্টো বা অন্য দল এলে তারা তাদের মেনিফেস্টো ধরে নিবে ? এটাই কি আপনার বক্তব্য প্রমান করে না ? খুবই বিতর্কিত ও প্রশ্নবোধক একটি বক্তব্য নয় কি !

সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটিতে আপনার লোক চাওয়া হল, তা দিলেন না। কমিটি আপনাকে দুই দুই বার আপনার মতামত জানানোর জন্য আমন্ত্রন করল, আসলেন না, এমন কি কোন লিখিত প্রস্তাবও দেন নাই। বললেন কমিটি অবৈধ। সবই অবৈধ! শুধু বৈধ আপনি ও জে: জিয়ার শাসল আমল ? আবার যখন সংবিধানের সংশোধনী বিল সংসদে উঠানো হলো সেখানেও যান নাই। সংসদের ইতিহাসে সবচেয়ে কম উপস্থিতির বিরোধী নেত্রীর রেকর্ডটিও আপনার হাতে। আজ আপনার মুখে কি সংবিধানের জন্য মায়া কান্না মানায় ? জনগনকে আর কত ঠকাবেন আপনারা ? আর কত কষ্ট দেবেন ? আর কত ভাওতাবাজি খেলবেন জনগনের সাথে ?

২। প্রশাসনকে বলেছেন, কেউ রেহাই পাবেনা। চাকরি তো থাকবেইনা, ধরে এনে শাস্তি দেয়া হবে।

আপনি প্রায়ই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে থাকেন। এর আগেও পল্টন ময়দানে দিয়েছেন। এটা কিসের আলামত ? তার মানে তারা আপনাদের কোন সত্য প্রকাশ করতে পারবেনা ? দেশের উন্নয়নে কোন প্রকল্প আসলে তা তারা স্বাক্ষর করবে না ? আপনার ছেলের দুর্নীতির কোন তদন্ত হোক তা আপনি করতে দেবেন না ? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের তদন্ত যাতে বন্ধ হয় তাই আপনি চান, আপনার হুমকির কারনে হয়ত কোন কোন অফিসার আজকে থেকে অ-ঘোষিত বনবাসে যাবেন, তবে তা কি দেশের মঙ্গল না আপনার ব্যাক্তিগত মঙ্গল, একটু বলবেন কি ? এভাবে হুমকি দিয়ে যেমন ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভাই, বন্ধু, ছেলে, ভাগিনা সহ আত্মীয় স্বজনদের দিয়েছেন অঢেল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার মহা সুযোগ, ঠিক আজ তা তদন্ত যাতে না হয়, তার জন্য আবার একই হুমকি। কেন ? দেশটাকে কি মনে করেন ? আপনাদের কাছে কি আমরা বন্ধক বসেছি, না বিক্রি হয়ে গেছি ? আজ আপনার সৎ সাহস থাকলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বলতেন যে, “আমার ছেলে যদি কোন অন্যায় বা দুর্নীতি করে থাকে, তার নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত করুন, কেউ মিথ্যা কোন অভিযোগ দিবেন না, আমি আপনাদের সহোযোগিতা করব”। আমরা জনগন আশা পেতাম। আপনাকে স্বাগত জানাতে পারতাম। এখন কি হবে, সব বন্ধ করে আপনার হুমকিকে তামিল করতে হবে না সরকারের হুকুম তামিল করবে ? দয়া করে একটু নির্দেশনা দিন। তাদের মধ্যে আবার অনেকের আপনাদের মত বিদেশী প্রভু নাই, নেই দেশী প্রভুও।

৩। বাগের হাটে কযলাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট করতে দেয়া হবেনা।
পাওয়ার প্লান্ট করতে দেয়া হবে না। পাওয়ার প্লান্ট হলে পানি লবনাক্ত হয়ে যাবে, সুন্দর বন নষ্ট হয়ে যাবে। বুঝলাম না মাননীয় নেত্রী। দেশে আজ বিদ্যুৎ এর চরম ঘাটতি। সেখানে যদি কয়লা দিয়ে কোন পাওয়ার প্লান্ট হয়, তা তো অন্য যেকোন প্রক্রিয়ার চেয়ে বেশী পরিবেশবান্ধব। তাহলে উন্নয়নে সর্বদা আপনার বিরোধীতা কেন ? তার মানে এ সরকার কোন উন্নয়ন করুক তা আপনি চাননা ? তারা উন্নয়ন করলে আপনার হিংসা লাগে, এটাই কি ধরো নেব ? জনগনের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হোক তাকি আপনি চান না ? পানি লবনাক্ত হবে কেন ? সুন্দর বনের পানি তো এমনিতেই লবনাক্ত। আমরা তো আজীবন তাই জানি। কবে আবার সুন্দর বনের পানি মিঠা ছিল ? একটু নিজে পড়াশুনা করে বললে বেশী ভাল নয় কি ?

৪। মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর করতে ব্যর্থ হয়ে এখন মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে বিমানবন্দর নির্মাণের চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা সরকারকে তা করতে দেব না।
৫। সিলেটে ইকোপার্ক করতে দেয়া হবেনা।

মুন্সীগঞ্জে বিমান বন্দর হতে পারবেনা, সিলেটি ইকো পার্ক হতে দিবেন না, কারন কৃষি জমি নষ্ট হয়ে যাবে। মাননীয় বিরোধী নেত্রী হাসালেন আপনার লঘু চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ করে। ধরলাম এতে কৃষি জমি কমে যাবে, তো এখান থেকে কতটি পরিবার তাদের জীবিকার পথ পাবে তাকি আপনি ক্যালকুলেশন করেছেন ? দেশের অর্থনীতির কতটুক অগ্রগতি হবে তাকি ভেবে দেখেছেন? বিদেশী বিনিয়োগ কত বৃদ্ধি পাবে তাকি আপনি হিসাব করেছেন? দেখেছেন কি বর্তমানের চেয়ে তা বেশী লাভ জনক না কম ? করলে একটু আমাদের হিসাবটা দিন। আমরা দেখি। আর আপনার কাছে কৃষি জমির এত মায়া, তাহলে গত ১৫-২০ বছর ধরে গড়ে উঠা ব্যাঙের ছাতার মত “রিয়েল স্টেট” কোম্পানী ও ভুমি দস্যুরা যে কোটি কোটি একর কৃষি জমি দখল করে আজ সেখান মার্কেট, অ্যাপার্টমেন্ট সহ বিভিন্ন স্থাপনা তুলে জমিগুলো গ্রাস করেছেন তখন এ মায়া কোথায় ছিল। সেখানে কেন কোন প্রতিরোধ করছেন না ? কেন এই কৃষি জমি রক্ষার জন্য আপনার আমলে কোন কঠোর আইন করেন নাই। রাজনীতিতে ভোট ও ডোনার হারাবেন বলে ? আজ যখন আপনি এ বক্ত্রতা দিলেন, সেদিন দেশের কত হাজার একর কৃষি জমি এ ভুমিদস্যুরা দখল করেছে বা করে আছে তার খবর কি আপনার জানা আছে ? নাকি জেনেও না জানার ভান করছেন, কারন ওদের সাথে আপনার রাজনীতি নয়, ওরা তো আপনাদের ফান্ড সোর্স তাই না ? ভালই বলেন আর আমরা ভোদাই জনগন কেউ বিরোধীতা করি আবার কেউ ধেই ধেই করি খুশিতে গদ গদ হয়ে নেচে বেড়াই। এটাই আপনাদের ক্যাপিটাল।

৬। নির্বাচন কমিশন “অখাদ্য” ।
নির্বাচন কমিশন অখাদ্য। কমিশন আবার খাওয়া যায় নাকি ? কি সব নোংরা ও নীচু মানের ভাষা! আপনারা যদি এসব ভাষা ব্যবহার করেন তো সাধারন জনগন কি শিখবে ? কি বলবে ? আর সে জন্যই জয়নালের মত সাংসদরা অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে, শাম্মীর মত সাংসদরা বঙ্গবন্ধুকে সম্মান না দিয়ে উল্টো কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেয়। দেবেই না কেন, আপনিই তো বঙ্গবন্ধুকে সম্মান দেন না। উপকার তো আপনার করেছিল, যার কারনে আজ আপনি বিরোধী নেত্রী, সাবেক প্রধান মন্ত্রী। ওরা আর শিখবে কোথা থেকে !

আমার জানা মতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন হল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও বেশী নিরপেক্ষ কমিশন। আমি বলিনা তারা শতভাগ নিরপেক্ষ কিন্তু অন্য যে কোন কমিশন থেকে নিরপেক্ষ। আপনার সেই আজিজ, রউফ মার্কা কমিশনের কথা দেশবাসী ভুলে নাই ম্যাডাম ! এই কমিশনের আওতায় চট্রগ্রামে আপনাদের মেয়র জয়লাভ করেছে, পৌর সহ বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে আপনাদের প্রার্থী জয়লাভ করেছে। লোকজন আপনাদের চায়না, সেই দোষ কি কমিশনের?

এছাড়া তিনি বলেছেন , “চোরের দল ও চাটার দল দেশ পরিচালনা করছে। এদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। এদের কারণে দেশের মানুষকে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। এরা দেশের সমস্যা সমাধান না করে কেবল ভারতকে খুশি করার কাজে ব্যস্ত।”

এবার আপনিও হাসিনার সমকক্ষ হলেন ! তিনি যেমন ব্যালেন্স ছাড়া পাগলের মত মাঝে মধ্যে বকেন। এবার আপনি্ও। তবে পাগলের মত নয়, কোন এক নীচু শ্রেণীর নাগরিকের মত ভাষা ব্যবহার করলেন। এই না হলে আপোষ হীন নেত্রী। আপনি কি আসলে আপোসহীন না প্রতিহিংসাপরায়ণ ? ভাবতে খুবই কষ্ট হয় এরকম নেতা-নেত্রীরা আমাদের প্রধান মন্ত্রী বা বিরোধী নেত্রী হয়। আর সেই জাতী বা দেশ কতটুক পাবে তাদের কাছ থেকে ? কতটুক উন্নয়ন আশা করবে তাদের কাছ থেকে দেশের এই অভাগা জনগন !!!

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে খালেদা জিয়া ও নেতৃবৃন্দ

***
সূত্র: প্রথম আলো, জনকন্ঠ, আমার দেশ, কালের কন্ঠ, ইত্তেফাক