ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

আজ ১৮ জুলাই। ১৯১৮ সালের এই দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশের ট্রান্সকেই এর রাজধানী উমতাতার নিকটবর্তী ম্‌ভেজো গ্রামে থেম্বু রাজবংশের ক্যাডেট শাখায় রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা জন্ম গ্রহন করেন। আমি তার নাম রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা লেখার কারন হল তার জন্মগত নাম হল এটি। এর পর স্কুলে পড়ার সময়ে তাঁর শিক্ষিকা ম্‌দিঙ্গানে তাঁর ইংরেজি নাম রাখেন “নেলসন”। ফলে তার পুরো নাম হল নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। তার পিতার নাম গাদলা হেনরি ম্‌পাকানইসা। তিনি ম্‌ভেজো গ্রামের মোড়ল ছিলেন। তার বাবার চার বিয়ে ছিল। তারা ছিলেন ১৩ ভাই-বোন। ম্যান্ডেলার মা ছিলেন ম্‌পাকানইসার ৩য় স্ত্রী নোসেকেনি ফ্যানি। ফ্যানি ছিলেন ম্‌পেম্ভু হোসা গোত্রের ন্‌কেদামার কন্যা। নানার বাড়িতেই ম্যান্ডেলার শৈশব কাটে। তাঁর ডাক নাম “রোলিহ্লাহ্লা”র অর্থ হলো “গাছের ডাল ভাঙে যে”, অর্থাৎ দুষ্ট ছেলে। ম্যান্ডেলার বাল্যকাল খুব সুখকর ছিলনা। মাত্র ৯ বছর বয়সে তার বাবা যক্ষা রোগে মারা যান।

পড়াশুনা :
ম্যান্ডেলার বাবা মারা যাওয়ার পর শাসক জোঙ্গিন্তাবা তখন তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন। ম্যান্ডেলা রাজপ্রাসাদের কাছের একটি মিশনারী স্কুলে পড়াশোনা করেন। থেম্বু রীতি অনুযায়ী ১৬ বছর বয়সে ম্যান্ডেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর গোত্রে বরণ করে নেয়া হয়। এর পর তিনি ক্লার্কবারি বোর্ডিং ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা করেন। সেখানে ম্যান্ডেলা ৩ বছরের জায়গায় মাত্র ২ বছরেই জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাস করেন। ১৯৩৭ সালে ম্যান্ডেলা প্রিভি কাউন্সিলে তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। এরপর তিনি ফোর্ট বোফোর্ট শহরের মিশনারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হেল্ডটাউন স্কুলে ভর্তি হন। এখানেই থেম্বু রাজবংশের ছাত্ররা পড়াশোনা করতো।
স্কুল থেকে পাস করার পর ম্যান্ডেলা ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অফ আর্টস কোর্সে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষের শেষে ম্যান্ডেলা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্র সংসদের ডাকা আন্দোলনে জড়িত হয়ে পড়েন। এর ফলে তাঁকে ফোর্ট হেয়ার থেকে চলে যেতে বলা হয়। শর্ত দেয়া হয়, কেবল ছাত্র সংসদে নির্বাচিত সদস্য হতে পারলেই তিনি সেখানে ফেরত আসতে পারবেন। জীবনের পরবর্তী সময়ে কারাগারে বন্দী থাকার সময়ে ম্যান্ডেলা লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের অধীনে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবন:
দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯৪৮ এর নির্বাচনে আফ্রিকানারদের দল ন্যাশনাল পার্টি জয়লাভ করে। এই দলটি বর্ণবাদে বিশ্বাসী ছিলো, এবং বিভিন্ন জাতিকে আলাদা করে রাখার পক্ষপাতি ছিলো। ন্যাশনাল পার্টির ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে ম্যান্ডেলা সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ১৯৫২ সালের অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৫ সালের জনগণের সম্মেলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই সম্মেলনে মুক্তি সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের মূল ভিত্তি। এই সময় ম্যান্ডেলা ও তাঁর বন্ধু আইনজীবী অলিভার টাম্বো মিলে ম্যান্ডেলা অ্যান্ড টাম্বো নামের আইনী প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন। এই প্রতিষ্ঠানটি উকিল নিয়োগ করার মতো টাকা নেই, এমন দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের স্বল্প মূল্যে আইনগত সাহায্য প্রদান করতো।

ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক জীবনের প্রথমভাগে তিনি মহাত্মা গান্ধীর দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী কর্মীরা আন্দোলনের প্রথম দিকে গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের নীতিকে গ্রহণ করে বর্ণবাদের বিরোধিতা করেছিলো। ম্যান্ডেলাও প্রথম থেকেই অহিংস আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার ১৯৫৬ সালের ৫ই ডিসেম্বর তারিখে ম্যান্ডেলা সহ ১৫০ জন বর্ণবাদ বিরোধী কর্মীকে দেশদ্রোহিতার মামলায় গ্রেপ্তার করে। এই মামলাটি সুদীর্ঘ ৫ বছর ধরে (১৯৫৬-১৯৬১) চলে, কিন্তু মামলার শেষে সব আসামী নির্দোষ প্রমাণিত হন।

১৯৫২ হতে ১৯৫৯ এর মধ্যে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) এর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে উগ্রপন্থী আফ্রিকানিস্ট উপদলের কৃষ্ণাঙ্গ কর্মীরা বাধা দিতে শুরু করে। আফ্রিকানিস্টরা বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে চরমপন্থী আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলো। এএনসির নেতা অ্যালবার্ট লুথুলি, অলিভার ট্যাম্বো, ও ওয়াল্টার সিসুলু অনুভব করেন, আফ্রিকানিস্টরা এই আন্দোলনে খুব তাড়াহুড়া করছে, আর তাঁদের নেতৃত্বকে অস্বীকার করছে।

বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন:
১৯৬১ সালে ম্যান্ডেলা এএনসির সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন উমখোন্তো উই সিযওয়ে (অর্থাৎ “দেশের বল্লম”, সংক্ষিপ্ত নাম MK) এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮০র দশকে এমকে বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এতে অনেক বেসামরিক লোক হতাহত হন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ২০০৮ এর জুলাই পর্যন্ত ম্যান্ডেলা ও এএনসি কর্মীদের সন্ত্রাসবাদী হিসাবে তাদের দেশে নিষিদ্ধ করে। ২০০৮ এর জুলাইতে এসেই কেবল ম্যান্ডেলাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রণীত সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা হতে সরিয়ে নেয়া হয়।
ম্যান্ডেলাকে ১৯৬২ সালের ৫ আগষ্ট গ্রেফতার করা হয়। এর তিন দিন পরে তাঁকে ১৯৬১ সালে শ্রমিক ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেয়া এবং বেআইনীভাবে দেশের বাইরে যাবার অভিযোগে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৬২ সালের ২৫শে অক্টোবর ম্যান্ডেলাকে এই দুই অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর দুই বছর পর ১৯৬৪ সালের ১১ই জুন ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে এএনসির সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্বদানের অভিযোগ আনা হয় ও শাস্তি দেয়া হয়।

প্রিটোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ম্যান্ডেলা ১৯৬৪ সালের ২০শে এপ্রিল তারিখে তাঁর জবানবন্দি দেন। ম্যান্ডেলা ব্যাখ্যা করেন, কেনো এএনসি সশস্ত্র আন্দোলন বেছে নিয়েছে। ম্যান্ডেলা বলেন যে, বহু বছর ধরে এএনসি অহিংস আন্দোলন চালিয়ে এসেছিলো। কিন্তু শার্পভিলের গণহত্যার পর তাঁরা অহিংস আন্দোলনের পথ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই গণহত্যা, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারকে অবজ্ঞা করে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেয়া, জরুরি অবস্থার ঘোষণা এবং এএনসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পরে ম্যান্ডেলা ও তাঁর সহযোদ্ধারা অন্তর্ঘাতমূলক সশস্ত্র সংগ্রামকেই বেছে নেন। ম্যান্ডেলার পক্ষে ব্র্যাম ফিশার, ভার্নন বেরাঞ্জ, হ্যারি শোয়ার্জ, জোয়েল জফ, আর্থার চাসকালসন, এবং জর্জ বিজোস ওকালতি করেন। মামলার শেষভাগে হ্যারল্ড হ্যানসন আইনী সহায়তার জন্য যোগ দেন। কিন্তু মামলায় রাস্টি বার্নস্টেইন ছাড়া অন্য সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে ১৯৬৪ সালের ১২ই জুন দেয়া রায়ে ফাঁসীর বদলে তাঁদের সবাইকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

কারাবাস ও মুক্তি:
ম্যান্ডেলার কারাবাস শুরু হয় রবেন দ্বীপের কারাগারে। এখানে তিনি তাঁর ২৭ বছরের কারাবাসের প্রথম ১৮ বছর কাটান।[৪৪] জেলে থাকার সময়ে বিশ্বজুড়ে তাঁর খ্যাতি বাড়তে থাকে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ নেতা হিসাবে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। সশ্রম কারাদণ্ডের অংশ হিসাবে রবেন দ্বীপের কারাগারে ম্যান্ডেলা ও তাঁর সহবন্দীরা একটি চুনাপাথরের খনিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হন। কারাগারের অবস্থা ছিলো বেশ শোচনীয়। কারাগারেও বর্ণভেদ প্রথা চালু ছিলো। কৃষ্ণাঙ্গ বন্দীদের সবচেয়ে কম খাবার দেয়া হতো। সাধারণ অপরাধীদের থেকে রাজনৈতিক বন্দীদের আলাদা রাখা হতো। রাজনৈতিক বন্দীরা সাধারণ অপরাধীদের চাইতেও কম সুযোগ সুবিধা পেতো। ম্যান্ডেলা তাঁর জীবনীতে লিখেছেন, তাঁকে ডি-গ্রুপের বন্দী হিসাবে গণ্য করা হতো, অর্থাৎ সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত বন্দীদের তালিকায় তাঁকে রাখা হয়েছিলো। তাঁকে প্রতি ৬ মাসে একটিমাত্র চিঠি দেয়া হতো এবং একজনমাত্র দর্শনার্থীর সাথে দেখা করার অনুমতি দেয়া হতো। ম্যান্ডেলাকে লেখা চিঠি কারাগারের সেন্সরকর্মীরা অনেকদিন ধরে আটকে রাখতো। চিঠি ম্যান্ডেলার হাতে দেয়ার আগে তার অনেক জায়গাই কালি দিয়ে অপাঠযোগ্য করে দেয়া হতো।

১৯৯০ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকার তদানিন্তন রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সহ অন্যান্য বর্ণবাদ বিরোধী সংগঠনের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। একই সাথে তিনি ঘোষণা দেন, ম্যান্ডেলাকে অচিরেই মুক্তি দেয়া হবে। ভিক্টর ভার্সটার কারাগার থেকে ম্যান্ডেলাকে ১৯৯০ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মুক্তি দেয়া হয়। ম্যান্ডেলার কারামুক্তির ঘটনাটি সারাবিশ্বে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

মুক্তির দিনে ম্যান্ডেলা জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি শান্তি রক্ষা করা ও দেশের শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য আহবান জানান। একই সাথে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ” ১৯৬০ সালে আমরা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে বাধ্য হই। বর্ণবাদের হিংস্রতার হাত থেকে আত্মরক্ষার খাতিরেই আমরা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন উমখান্তো উই সিযওয়ে গঠন করেছিলাম। সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার পেছনের কারণগুলো এখনো রয়ে গেছে। তাই এ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো পথ নেই। আমরা আশা করি, শান্তি আলোচনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ অচিরেই সৃষ্টি হবে এবং আমাদের আর সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাবার দরকার থাকবে না।” তিনি আরও বলেন, “আমার মূল লক্ষ্য হলো সংখ্যাগুরু কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য শান্তি নিয়ে আসা, আর স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা।”

শান্তি আলোচনা ও নোবেল শান্তি পুরুস্কার:
কারামুক্তির পর ম্যান্ডেলা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯০ হতে ১৯৯৪ পর্যন্ত তিনি এই দলের নেতা ছিলেন। এই সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের লক্ষ্যে সরকারের সাথে আলোচনায় বসেন। এই শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হবার পর ১৯৯৪ সালে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস দলটির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে ১৯৯১ সালে এই দলের প্রথম জাতীয় সম্মেলন হয়। এই সম্মেলনে ম্যান্ডেলাকে দলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। ম্যান্ডেলার পুরানো বন্ধু ও সহকর্মী অলিভার টাম্বো ম্যান্ডেলার বন্দীত্বের সময়ে প্রবাসে এই দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনে টাম্বোকে দলের জাতীয় সভাপতি নির্বাচন করা হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সাথে শান্তি আলোচনায় অবদান রাখার জন্য ম্যান্ডেলা এবং রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লু ডি ক্লার্ককে ১৯৯৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি এবং বর্তমান জীবন:
এই শান্তিও বেশীদিন স্থায়ী হয়নাই। ১৯৯১ সালে একবার মতানৈক্য হলে ম্যান্ডেলা রেগে গিয়ে ডি ক্লার্ককে অবৈধ সরকারের নেতা বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৯২ সালের জুন মাসে বৈপাটোং এর গণহত্যার ঘটনা ঘটলে আলোচনা ভেস্তে যায়। ম্যান্ডেলা সেসময় ডি ক্লার্কের সরকারকে এই গণহত্যায় জড়িত থাকার জন্য অভিযোগ করেন। তবে এর ৩ মাস পরে ১৯৯২ এর সেপ্টেম্বর মাসে বিসো গণহত্যা ঘটলে আবার আলোচনা শুরু হয়। দুই পক্ষই উপলব্ধি করেন যে, শান্তি আলোচনাই হলো শান্তি ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।
১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতা ক্রিস হানিকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে সারা দেশে সহিংশতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।ম্যান্ডেলা এসময় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ জানান। সেসময় ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন না। তা সত্ত্বেও ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতিসুলভ এই ভাষণে বলেন, “tonight I am reaching out to every single South African, black and white, from the very depths of my being. A white man, full of prejudice and hate, came to our country and committed a deed so foul that our whole nation now teeters on the brink of disaster. A white woman, of Afrikaner origin, risked her life so that we may know, and bring to justice, this assassin. The cold-blooded murder of Chris Hani has sent shock waves throughout the country and the world. …Now is the time for all South Africans to stand together against those who, from any quarter, wish to destroy what Chris Hani gave his life for – the freedom of all of us”. ম্যান্ডেলার এই আহবানে কাজ হয়। দেশের কিছু অংশে দাঙ্গা হলেও মোটের উপর শান্তি বজায় থাকে। শান্তি আলোচনা আবার জোরেসোরে শুরু হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ১৯৯৪ সালের ২৭শে এপ্রিল তারিখে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তারপর বিভিন্ন ঘটনা ও অঘটনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের ২৭শে এপ্রিল তারিখে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ৬২% ভোট পেয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) দলের মনোনিত প্রার্থী হিসাবে ম্যান্ডেলা দক্ষিন আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ড নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দক্ষিন আফ্রিকার রাস্ট্রপতি ছিলেন।
বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক অবসরে থাকলেও লড়াই করছেন এখন বিশ্বব্যাপি মহামারী ঘাতক ব্যাধি “এইডস” এর বিরুদ্ধে। ২০০৫ সালে এই ঘাতক ব্যাধি “এইডস”-এ তাঁর পুত্র মাকাগাথ ম্যান্ডেলা ৫৪ বছার মারা যান। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ম্যান্ডেলাকে তাঁর পুত্রের অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে দেয়নি।

একনজরে নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা :
জন্ম : ১৮ জুলাই ১৯১৮ (বয়স ৯২)
বাসস্থান : Houghton Estate, South Africa
পিতার নাম : গাদলা হেনরি মপাকানইসা
মাতার নাম : নোসেকেনি ফ্যানি
ভাই-বোন সংখ্যা : ৪ ভাই ৯ বোন।
বিবাহিত জীবন : ৩টি বিয়ে ১। ইভিলিন ন্‌তকো মাসে (১৯৪৪-১৯৫৭)
২। উইনি মাদিকিজেলা-ম্যান্ডেলা (১৯৫৭-১৯৯৬)
৩। গ্রাসা মাচেল (১৯৯৮–বর্তমান)
ধর্ম : Methodism
পড়াশুনা : স্নাকত্তোর ডিগ্রি
রাজনৈতিক দল : আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস
দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি : ১০ মে ১৯৯৪ – ১৪ জুন ১৯৯৯

আজ তার জন্মদিনে আমার সকল ব্লগারদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। ২০০৯ সাল থেকে জাতিসংঘ এই দিনটিকে “ম্যান্ডেলা দিবস” হিসাবে পালন করে আসছে।

***
সূত্র:উইকি এবং Nelson Mandela Facts