ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক


আরবি: رمضان রামাদ্বান্‌; ফার্সি: رمضان র‍্যাম্‌জ্‌ন হতে রমজান বা রামাদান। আরবিতে বলা হয় সিয়াম। যা বাংলাদেশ সহ ভারত উপমহাদেশের বেশীর ভাগ দেশে “রোজা” বলে বেশী পরিচত। হিজরি বছরের ৯বম মাস হল পবিত্র রমজান বা মাহে রমজান। সারা পৃথিবীর মুসলিম সম্প্রদায় এ মাসকে পেয়ে বেশ আনন্দিত ও আশান্বিত হয়। কারন এ মাসের ফজিলতের মাধ্যমে তামাম পৃথিবীর মুসলিম সম্প্রদায় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকেন। এর প্রথম অংশ রহমতের, দ্বিতীয় অংশ মাগফিরাত ও তিৃতীয় অংশ হল নাজাতের। রমজানের আনন্দ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
“বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। [সূরা ইউনুস : ৫৮]”
যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন :
“তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে।“
এ মাসের কিছু ফজিলত সম্পর্কে তিনি আরও বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। বর্ণনায় : নাসায়ী”
রাসূল (সঃ) বলেছেন “প্রত্যেকটি জিনিসেরই জাকাত আছে, শরীরের জাকাত হল রোজা রাখা।“

রমজান মাস ও এর ফজিলত সমুহ:
১। এ মাসের সাথে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকনের সম্পর্ক রয়েছে; আর তা হলো সিয়াম পালন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
“হে মোমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর-যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। [সূরা বাকারা : ১৮৩]”
প্রিয় নবী (সঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন:
“যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়েম করল, জাকাত আদায় করল, সিয়াম পালন করল রমজান মাসে, আল্লাহ তাআলার কর্তব্য হল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো…। বোখারি”

২। রমজান হল কুরআন নাযিলের মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন:
“রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ্ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। (সূরা বাকারা: ১৮৫)”
রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কোরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কোরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য । শুধু আল-কোরআনই নয় বরং ইবরাহিম আ.-এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। (সহি আল-জামে)

৩। রমজান মাসে জান্নাতের সকল দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর এ মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলা হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সঃ) বলেছেন :
“যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে-শয়তানের শিকল পড়ানো হয়। (মুসলিম)”
এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে রমজান মাসে কেন আবার মানুষ খারাপ কাজ করে, ঘুষ-দুর্নীতি, মিথ্যা বলা, মারামারি ইত্যাদি পাপাচারে লিপ্ত হয় কিভাবে ? যারা এ ধরনের কাজের সাথে যুক্ত তাদের উপড় আসলে আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছে, তারা কোন হেদায়েদ প্রাপ্ত নয়। অতএব তারা সর্বদাই ঐ সব কাজের সাথে ছিল এবং থাকবে। আল্লাহ আসলে ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

৪। রমজান মাসেই আছে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী “লাইলাতুল কদর”। এ উপলক্ষে আল্লাহ বলেন: মাসের মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন,
“আমি একে (পবিত্র কুরআন) নাযিল করেছি শবে-কদরে। শবে-কদর সমন্ধে আপনি কি জানেন ? শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেন্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা কদর)”

৫। রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস।
এ প্রসঙ্গে রাসুল (সঃ) বলেছেন : “রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়। (মুসনাদ আহমদ)”
অন্য আর এক হাদিসে আছে: “আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। (সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব)”

৬। রমজান মাস হল পাপ হতে ক্ষমা বা মুক্তি লাভের মাস। এ প্রসঙ্গে নবী (সঃ) বলেছেন :
“ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি। (তিরমিজি)”

৭। এ মাস জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভের মাস।
প্রিয় নবী (সঃ) বলেছেন: “রমজান মাসের প্রথম রজনির যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এ মাসে আর তা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও ! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও ! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। (তিরমিজি)”

৮। এ মাসের প্রতিটি সৎ কাজের নেক বা প্রতিদান বহু গুনে বাড়িয়ে দেয়া হয়। তাই এ মাসে যে যত বেশী নেক আমল করেবন, আল্লাহ তার আমলকে আরোও বহুগুনে বাড়িয়ে তার আমল নামায় লিপিবদ্ধ করবেন।

৯। রমজান হল ধৈর্য্য ও সবরের মাস। এ মাসেই ঈমানদার মুসলমানগণ তাদের দৈনন্দিন কাজে সবচেয়ে বেশী ধৈর্য্য ধারন করে থাকেন, যা অন্য কোন মাসে করেন না। ফলে এ মাসের শিক্ষাই বাকী মাসগুলোতে ঈমানদারদের জন্য অনুকরনীয় ।
উপরের আলোচনা হতে আল্লাহ আমাদেরকে উত্তম ও সর্বোচ্চ শিক্ষা নেয়ার তৈফিক দান করুন। আমীন।

রোজার ফজিলত ও শিক্ষা:

রোজা হল এক মাত্র আল্লাহর জন্য। এর প্রতিদান বান্দা আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি বিনা হিসাবে লাভ করবে। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে প্রিয়। রোজ জাহান্নাম হতে বাঁচায় এবং জান্নাতের দরজা খুলে দেয়। সকল প্রকার খারাপ কাজ হতে রোজা আমাদেরকে রক্ষা করে। এই রোজা কেয়ামতের দিন সুপারিশকারী হিসাবে হাজির হবে। রোজা গুনাহ মাফের কারণ ও গুনাহের কাফফারা।

যাদরে উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে:

“কাফের বা অমুসলিম, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়ে, পাগল, অশীতিপর বৃদ্ধ যে ভাল-মন্দের পার্থক্য করতে পারে না, যে ব্যক্তি সিয়াম পালনের সামর্থ্য রাখে না, মুসাফির, যে রোগী সুস্থ হওয়ার আশা রাখে না, ঋতু-স্রাবগ্রস্ত নারী, গর্ভবতী ও দুগ্ধ দান কারী নারী বা মা, যে অন্যকে বাঁচাতে যেয়ে সিয়াম ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়।“
উপরের ব্যাক্তিবর্গ ছাড়া প্রায় সকল মুসলিম নর-নারীর জন্য রোযা বা সিয়াম ফরজ।

সিয়াম হল সংযমের মাস। তাই এ মাসে সকল প্রকার অপচয় ও বেহুদা কথা-বার্তা হতে নিজেকে মুক্ত রাখা একান্ত কাম্য।

আমাদের বাংলাদেশে ইফতার ও সেহ্‌রী নিয়ে অ-প্রয়োজনীয় খরচ করতে দেখা যায়। যেমন: ইফতারে সাধারনত যে সকল গুরুপাক খাবার খাওয়া হয়, এটা বর্জন করা উচিত। সাধারন সবাই আলুর চপ, পিয়াজু, বেগুনী, ছোলার ভর্তা ইত্যাদি নিত্যদিনের মেনুতে রাখেন। যা আসলেই স্বাস্থ্যকরতো নয়ই, বরং স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর পরিবর্তে সবজীর খেচুরী, সরবত, সুপ, চিরা, খেজুর ও অন্যান্য পুস্টিকর ফল মেনুতে রাখতে পারেন। এতে স্বাস্থ্যের যেমন উপকার, তেমনি প্রতি বছর রোজা এলে পিঁয়াজ, ছোলা, চিনি, আটা-ময়দা, তৈল ইত্যাদি নিয়ে যেসব ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা আয় করে তাদেরকেও একটা জবাব দেয়া যায়। তাই আশা করি এবার আমরা আমাদের মেনু একটু পরিবর্তন করলে স্বাস্থ্যও ভাল রাখতে পারব অপর দিকে অতি মুনাফাকারীরাও শিক্ষা পাবে।

আমি সিঙ্গাপুরে কোথাও একমাত্র বাংলাদেশীদের ছাড়া কাউকে ঐ সকল গুরুপাক খাবার দিয়ে ইফতার করতে দেখিনাই। এদেশে সাধারনত খিচুরী যাকে এরা বাবুর বলে থাকেন, তা দিয়েই প্রত্যেকটি মসজিদে ইফতার করানো হয়। বেশীর ভাগ মানুষই মসজিদে ইফতার করে। মহিলারাই ঘরে ইফতার করে বেশী। তবে সবার মেনুই ঐ বাবুর, সরবত, ফল, চা ও বিরিয়ানী। একমাত্র কতিপয় বাংলাদেশী রেস্ট্রুরেন্ট ঐ সকল গুরুপাক ও অ-স্বাস্থ্যকর খাবার ইফতারের মেনুতে রাখে।

তাই আমার মনে হয়, পুরোদিন রোজা রাখার পর, ইফতারে কোন তৈলাক্ত জাতীয় খাবার বা অতি ঝাল জাতীয় খাবার যেমন: হালিম, না রাখাই ভাল। এছাড়াতো পুরান ঢাকায় আছে একটা বাজে প্রতিযোগীতা যেমন: আস্ত মুরগীর রোষ্ট, আস্ত খাসী ইত্যাদি । এগুলোও পরিহার করা উচিত। এতে অর্থও বাচবে, আবার মাহে রমজানের যে শিক্ষা মিতব্যায়িতা তাও প্রতিষ্ঠিত হবে।

[আজ ০১ আগষ্ট । সৌদি আরব সহ বিশ্বের বেশীর ভাগ দেশেই আজ পবিত্র মাহে রমজান। সৌদি আরব ও তাদের অনুসারী বিভিন্ন দেশ ইসলামে চাঁদ দেখার বিধান থাকলেও তা মানেনা বা সে অনুযায়ী তারা আরবি বা হিজরি সন গননা করেনা। সেই জন্য আজ আমাদের সিঙ্গাপুরে প্রথম রোজা। এছাড়া মালায়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ এ অঞ্চলের প্রায় সব দেশই রোজা পালন করছে। এবার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজা ২৯টি। তাই এ অঞ্চলে ঈদ-উল-ফিতর হল আগামী ৩০ আগষ্ট।]

আল্লাহ আমাদের সকলকে পবিত্র মাহে রমজানের হক আদায় করার তওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহ হাফেজ।
-আমিন আহম্মদ।
সিঙ্গাপুর, ০১ আগষ্ট ২০১১।