ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

হতভাগ্য শিশুটি, যার ভাগ্যে আসল বাবা-মায়ের কোন আদর স্নেহ জুটলনা

শিশুটির নাম “তানজিদ”। না এটা ওদের বাবা-মায়ের দেয়া নাম নয়। এ নাম দিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনি এক হতভাগা শিশু যে দুনিয়াতে এসেই যেন অপরাধ করেছে। তাই তার জন্মদাতারা তাকে সহ্য করতে না পেরে ফেলে দিয়েছিল ডাষ্টবিনে। কুকুর-ইদুর তার নরম মাংস ভক্ষন করেছে। তার পায়ের আঙ্গুল ইতি মধ্যে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু অবুঝ, অক্ষম ও অসহায় শিশুটি বাঁধা দিতে পারেনি। কারন সেই ক্ষমতা ও শক্তি তখনও ওর জন্মায়নি। অথচ এই শক্তিহীনের অসীম শক্তিকে ভয় পেয়েই ওর জন্ম দাতারা ওকে ডাষ্টবিনে ফেলে দিল ! কিন্তু রাখে আ্ল্লাহ মারে কে ? তাই দীর্ঘ ৪০ দিন পর ও ফিরে পেল ওর বাবা-মাকে। না ওর জন্ম দাতা বাবা-মা নয়। একটি চাকুরীজীবি দম্পতিই হলো ওর বর্তমান ও সারাজীবনের পরিচয়ের প্রতিক। ওর বাবা-মা ! আমি তাদের মঙ্গল কামনা করছি।

হ্যা একটি সত্যি ঘটনা। আর এ ঘটনাটা ঘটেছে আমাদের দেশেই। আজ পত্রিকা মারফত এমনই দেখলাম। দৈনিক ইত্তেফাক থেকে জানা যায়-

“আবর্জনায় পাওয়া শিশু ৪০ দিনের চেষ্টায় সুস্থ” শিরোনামে খবরটি প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি লিখেছে,”মানুষ মানুষের জন্য। রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপে কাঁচা বাজারের ব্যাগ থেকে উদ্ধারকৃত শিশুকে চিকিত্সক ও নার্সরা চিকিত্-সার পাশাপাশি মাতৃস্নেহ দিয়ে বাঁচিয়ে তুলেছেন। শিশুটির পায়ের আঙ্গুল ইঁদুরে কিংবা কুকুরে খেয়ে ফেলেছে। শিশুটির প্লাসেন্টা কাটা হয়নি। তা দিয়ে শরীরটি পেঁচানো ছিল। এ শিশু বেঁচে যাওয়ার ঘটনা যেন অলৌকিক। হূদয়বান ব্যক্তি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিত্সা সেবা ও যত্ন দিয়ে শিশুটিকে যেভাবে চিকিত্সকরা বাঁচিয়ে তোলেন, তাতে আবার প্রমাণিত হলো মানুষ মানুষের জন্য।”

পত্রিকাটিতে আরোও লিখেছে,

“সম্প্রতি সেন্ট্রাল রোডে ময়লা আবর্জনার পাশে ভোরে পথচারীরা একটি কাঁচা বাজার ব্যাগের মধ্যে একটি রক্তমাখা শিশুকে দেখতে পান। শিশুটির মাথা ব্যাগের ভেতরে এবং পা দুইটি ব্যাগের বাইরে। পায়ের আঙ্গুল নেই এবং কুকুর ও ইঁদুরে খেয়ে ফেলার স্থান থেকে রক্ত ঝরছে। এ অবস্থা দেখে সেখানে ভিড় জমে যায়। পাশেই মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খানের বাসা। তিনি বাসা থেকে নারী-পুরুষের জড়ো হওয়ার দৃশ্য দেখতে পান। এরপর শিশুটিকে দেখে উদ্ধার করেন। তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে দ্রুত নিয়ে যান ল্যাবএইড হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত শিশুটিকে ভর্তি করেন। শিশুটির বিস্তারিত জেনে ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম শিশুটির চিকিত্সা সেবার যাবতীয় খরচ বহন করার দায়িত্ব নেন। পাশাপাশি একটি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক টীমকে শিশুটির চিকিত্সা সেবার দায়িত্ব নেয়ার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক নির্দেশ দেন। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নওশাদুন নবী, ডা. কাজী কামরুল ও অর্থোপেডিক সার্জন ডা. জিয়া উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে শিশুটির চিকিত্সা সেবা শুরু হয়। পরে একজন প্লাস্টিক সার্জন শিশুটির চিকিত্সাসেবায় যুক্ত হন। অর্থোপেডিক সার্জন শিশুটির দুই পায়ের হাড়ের অপারেশন করেন। সুস্থ হওয়ার পর প্লাস্টিক সার্জন ঐ স্থানে অপারেশন করেন। ৪০ দিনের মাথায় শিশুটির দুই পায়ে স্বাভাবিক আঙ্গুল হয়ে যায়। শিশুটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক। ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার, নার্স শিশুটিকে চিকিত্সাসেবা দিয়েছিলেন। স্নেহ আদরের কোন কমতি ছিল না। চিকিত্সাসেবা বাবদ তিন লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হলেও এর পুরাটাই ল্যাবএইড ব্যবস্থাপনা পরিচালক বহন করেন।”

এজন্য ল্যাব-এইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। খবরে প্রকাশ,

“আদর করে শিশুটির নাম রাখা হয় তানজীদ। তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ এবং মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান যৌথভাবে কোন হূদয়বান দম্পতির কাছে দত্তক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইতিমধ্যে এক চাকরিজীবী দম্পতি শিশু তানজীদকে দত্তক নেন। ফুটফুটে শিশুটি বর্তমানে সুস্থ। নিঃসন্তান দম্পতির সংসারকে শিশুটি আলোকিত করেছে।”

উক্ত ঘটনার আলোকে এটা ধারনা করায় যায় যে, এ হতভাগ্য শিশুটি যার গর্ভে এসেছিল সে হয় কোন দুঃচরিত্রা বা অসহায় মা বা কোন লম্ফট বাবার অবৈধ সম্পর্কের ফসল। আর তাই হয়ত ওর স্থান পিতা-মাতার কোলে বা নরম তুলতুলে বিছানায় না হয়ে হয়েছিল ডাষ্টবিনে। কুকুর-ইদুরের খাবার হয়েছিল ওর নরম তুল-তুলে শরীরটি।

আজকাল দেশ বড় এডভান্স হয়েছে। অনেক আধুনিক হযেছে। তাই ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশায় কোন সমস্যা হচ্ছেনা। এখানে বাইরের লোকজনের কথা বাদই দিলাম, অনেক বাবা-মায়েরাইতো ওদের ঐসব অনৈতিক কাজে কোন বাধা দিচ্ছেন না। আর যারা বাঁধা দিচ্ছেন তাদেরকে ঐ সব আধুনিক নামধারী ছেলে-মেয়েরা খুব সহজ ও ছোট ছোট কিছু গালি দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। বলে “সেকেলে” বা “ক্ষেত” বা “গাওয়া” বা “ওল্ড মডেল”। এদেরকে নীতি বাক্য শোনানোতো যায়ইনা বরং উল্টো ওদের কাছ থেকেই শুনতে হয়। আমি ধানমন্ডির একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী করতাম। সে সুবাধে ঐ সকল আধুনিক ছেলে-মেয়েদের খুব কাছ থকে দেখার সৌভাগ্য হযেছিল। ওদেরকে দেখে, ওদের চাল-চলন, কথা বলার ধরন ও ষ্টাইল, ফ্রি ও খোলা-মেলা মেলামেশা যেন স্বামী-স্ত্রীকেও হার মানায় ইত্যাদি দেখে দেখে ভাবতাম, আমরা এ কোন জগতে আছি !!! আমরা এ বয়সে বা আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয় লাইফে এর চিন্তাও করিনাই, আর ওরা কত এডভান্স, কত আধুনিক !!!

এটা শুধু ঐ ধানমন্ডির চিত্রই নয়, সারা বাংলাদেশের বিশেষ করে জেলা শহর গুলোতে এখন এটাই স্বাভাবিক চিত্র। তবে এ ক্ষেত্রে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, বসুন্ধরা সিটি সহ বিভিন্ন আধুনিক ও হেভিওয়েট জোনের কথাই আলাদা।

আমরা আধুনিকতার নামে কোথায় যাচ্ছি ? একে কি আধুনিকতা বলে, না অসভ্যতা বলে ? এটা কি বর্বরতা নয় ? এই অবৈধ মেলা-মেশার দায় কি এভাবে নবজাতককেই দিতে হবে ? কি ওদের অপরাধ ? জাতীর বিবেক কি নাড়া দেয়না ? নাকি সারা দেশে যেদিন যত্র-তত্র এভাবে নবজাতকদের পরে থাকতে দেখব, সেদিনই বিবেক নামক ক্রিয়াটি জাগ্রত হবে ?

আ্ল্লাহ আমাদের জাতিকে সত্যিকার সভ্য জাতিতে পরিনত করুন, সবার মাঝে বিবেক জাগ্রত হোক, সমাজ থেকে এ জাতীয় অপরাধ দুর হোক, এটাই আজ আমার প্রার্থনা।

তথ্য সূত্র: ইত্তেফাক ০৬/১০/২০১১