ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ঘটনা সিলেটের। অদ্ভুত বিচিত্র ঘটনা। একজন চিকিৎসক পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য সৌদী আরব গেছেন। হজ তো ২/৪ দিনে পালন হয় না। ১৯ থেকে ৩০/৩২ দিন লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় চিকিৎসক সাহেব তার স্ত্রীকে আটকে রেখে গেছেন বাড়িতে। আটকা মানে আটকা_রীতিমত তালাবদ্ধ করে গেছেন। ডাক্তার সাহেবের স্ত্রীও আবার ডাক্তার। ভাবুন একবার কান্ড। ডাক্তার সাহেব এমন কান্ড কেন করলেন!তার কি মানসিক কোন সমস্যা!সে আলোচনায় যাবার আগে দৈনিক সমকালের সৌজন্যে রিপোর্টটা আগে পড়ি।

বন্দি ডা. নন্দিতা আহমেদ


সিলেটে চিকিৎসক স্ত্রীকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে চিকিৎসক স্বামীর হজে চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নগরীর মীরের ময়দানের কেওয়াপাড়া এলাকার পড়শী ২০৯ নম্বর বাসা থেকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে পরিবারের জিম্মায় দিয়েছে। উদ্ধারকৃত ডা. নন্দিতা আহমেদ (নন্দিতা সিনহা) মৌলভীবাজার জেলা কমলগঞ্জ

উপজেলায় তিলকপুরের বাসিন্দা এবং নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জুলফিকার আহমেদকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়েসন্তান রয়েছে।

নন্দিতার ভাই বিজিত সিনহা সিলেট কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন, তার বোনকে নিজ বাড়িতেই বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং তিনি যে কোনো সময় মারা যেতে পারেন। এমন অভিযোগ পেয়ে কোতোয়ালি থানার এসআই শাহ মো. মুবাশ্বিরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ কেওয়াপাড়ায় ওই বাসায় গেলে তালাবদ্ধ ফটকে নিয়োজিত পাহারাদার বাধা দেয়। এ সময় দোতলা থেকে ডা. নন্দিতা নিজের পরিচয় দিয়ে তার বন্দি থাকার বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন। তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রাখা হয়েছে বলে চিৎকার করে বাবার বাড়ি যাওয়ার আকুতি প্রকাশ করেন তিনি।

এ অবস্থায় পুলিশ ডা. জুলফিকারের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা এ ব্যাপারে কোনো সহায়তা করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে পুলিশ সিটি করপোরেশনের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল খালিককে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডা. নন্দিতাকে উদ্ধার করে। নন্দিতার ভাই বিজিত সিনহা জানান, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর বোনের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ না থাকলেও তারা খবর রাখতেন। স্বামী ডা. জুলফিকার সম্প্রতি দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকে নন্দিতার ওপর নির্যাতন শুরু হয় বলে জানান বিজিত। সর্বশেষ নিজঘরে বন্দি থাকায় তারা বাধ্য হয়ে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বলে জানান তিনি।

নন্দিতাকে তার ভাইদের কাছে হস্তান্তরের পর জুলফিকারের ভগি্নপতি পরিচয় দিয়ে জনৈক জাকির সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জানি না কেন বন্দি করে রাখা হয়েছে। তবে নিশ্চয়ই কোনো কারণ রয়েছে। না হলে চিকিৎসক দম্পতির ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটত না।

সবচেয়ে আগে এই ঘটনার নিন্দা না জানিয়ে পারছি না। আমাদের সমাজে এখনো নারী কতটা নিগৃহীত অত্যাচারিত নির্যাতিত–এই ঘটনা তারই নজির বহন করছে। ডাক্তার সাহেব বিয়েও করেছেন আরেকখানা। তার আত্মীয়রা আবার জোর গলায় সাফাইও গাইছে। বলছে আটকে যখন গেছে কারণও নিশ্চয়ই রয়েছে। কি সেই কারণ!ওই ব্যাটা আত্মীয় বেশ জোর গলায় বলতে চাইছে_আটকে রাখাটা দোষের তেমন হয় নি। কারণ থাকলে এমন আটকে বউকে বিদেশ ভ্রমনে যাওয়া যায়! এমনকি পবিত্র হজ পালনেও যাওয়া যায়। সমাজে নারীর করুন অবস্থা এখানে খুবই পরিষ্কার।

আরেকটা ব্যাপার ডা. নন্দিতা আহমেদের অবস্থাটা ভাবুন। তিনি এখন কতটা একা? কতটা নিসঙ্গ।সব ছেড়েছুড়ে তিনি ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে সংসার করতে এসেছিলেন। সংসার আর হয়নি। সঙ সারই হয়েছে। নিজের ধর্ম ত্যাগ করেছেন। সঙ্গত কারনে তার বাপের বাড়ির আত্মীয় স্বজন আর তার সঙ্গে তেমন জোরালো সম্পর্ক রাখেনি। ভাইরা রাখেনি। বোনরা রাখেনি। সেই বড় একা মানুষটা শেষ পর্যন্ত শিকার হলেন স্বামীর নিষ্ঠুরতার। যাকে বিশ্বাস করে তিনি সব ছেড়েছেন। সেই মানুষটাই তাকে তালা মেরে আটকে চলে গেছেন হজে। ধর্ম পালন করতে গিয়ে ডাক্তার কি অধর্মটাই না করলেন।

প্রশ্ন হল ডাক্তার এমনটা কেন করলেন। একটা মানুষকে এক মাসের জন্য আটকে গিয়েছিলেন তিনি।শুরুতে বলেছি ডাক্তার মিয়া মানসিক রোগী হতে পারেন। কিন্তু তার আত্মীয় স্বজন! তারাও কি মানসিক রোগী!তারা তো দিব্যি বলে ফিরছে। ঠিক আছে ।সব ঠিক আছে। নিশ্চয়ই কারণ আছে। আমার মনে হচ্ছে এসব নিতান্ত মানসিক বিকার নয়। এগুলো অপরাধ। এগুলো সামাজিক অপরাধ। এগুলো সংঘবদ্ধ পারিবারিক অপরাধ। এই অপরাধের অবশ্যই শক্ত বিচার দরকার। জঘন্য ঘটনা মেনে নেয়া যায় না।

তবে নারীর ওপর এই যে ক্রমাগত অত্যাচার;নির্যাতন;টর্চার। তার প্রতি সমাজবদ্ধ মানুষের সমর্থন।রিপোর্টে দেখুন। যে বাড়িতে নন্দিতা আহমেদ আটকা ছিলেন। সে বাড়ির দারোয়ান ব্যাটা মনে হচ্ছে সব জানতো। সেও আটকে রাখার অপরাধের অংশীদার। সে পুলিশকে জানায় নি। সে মালিক পুরুষের আজ্ঞা পালন করেছে । সমাজের এই সংঘবদ্ধ আচরন এটাও মানসিক বিকার।

দারোয়ান ব্যাটা যে ব্যাপারটাকে অস্বাভাবিক মনে করেনি। মালিকের আদেশ স্বাভাবিক মনে মেনে নিয়েছে। এটা জগদ্দল মানসিক বিকার। জাকির নামের যে আত্মীয় ব্যাপারটাকে কারণসম্মত মনে করেছে। সেও সামাজিক মানসিক বিকারের শিকার। আমরা সবাই কম বেশী এধরনের মানসিক বিকার ও মানসিক সমস্যার শিকার। আমাদের জন্য আরও বড় সমস্যা হল এই গুরুতর অপরাধকে আমরা সামাজিক সংঘবদ্ধতা ও এস্টাবলিশমেন্টের জোরে সঙ্গত ও স্বাভাবিক মনে করি। নন্দিতাকে আটকে রাখার যে অপরাধ তার কোন ক্ষমা নেই। আর যে সামাজিক বিশ্বাস ও বিকারগুলো আমরা সযতনে পালন করি সেগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।