ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

হ্যা একেই বলে মায়ের ভালবাসা। মায়ের ভালবাসার মূল্য হয় না। পত্রিকায় মর্মান্তিক ঘটনাটা পড়ে সত্যিই মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। ঢাকার বাংলা দৈনিকগুলো মর্মস্পর্শী ভাবে ঘটনাটা তুলে ধরেছে।

রিপোর্টার এস এম আজাদ একটি কাগজে লিখেছেন
জীবন দিয়ে দুই সন্তানকে বাঁচালেন মা । তার আবেগ ছোয়া বর্ণনা হল-

‘আম্মু, আব্বু কোথায়? আব্বুর কাছে যাব’- কয়েক দিন ধরে সাত বছরের রশ্মি সারাক্ষণ মাকে এ কথা বলছিল। ‘কালই আমরা যাব’- এ কথা বলে প্রতিদিনই শিশুসন্তানকে সান্ত্বনা দিতেন মা রত্না। আর আড়ালে লুকিয়ে ফেলতেন চোখের পানি। কত দিন হল স্বামী রিপন খন্দকারকে তিনিও দেখছেন না! ‘জেলখানায় না জানি কেমন আছে সে। কী খায়, না খায়। বাইরের পানি পান করে না রিপন। রান্না করে খাবার নেওয়া যাবে তো জেলখানায়?’ – নিজে খেতে বসে এসব ভেবে গলা দিয়ে যেন খাবার ঢুকত না রত্নার। দুঃখ করে ছেলে রিফাতকে বলেছেন, ‘তোর আব্বু সেখানে না খেয়ে মরে যাবে রে। ওর জন্য পানি আর কিছু খাবার নিতে হবে।’ শুক্রবার রিফাতের স্কুল বন্ধ। তাই ছেলের সঙ্গে কথা বলে শুক্রবারই একবার স্বামীকে দেখতে যাবেন বলে ঠিক করেন রত্না। কাকডাকা ভোরে উঠে দুই সন্তান নিয়ে রিকশায় চেপে রওনাও হন। রেলক্রসিংয়ে ওঠার পর হঠাৎ দেখেন দ্রুতগতিতে একটা ট্রেন ছুটে আসছে তাদের দিকে। প্রাণ বাঁচাতে শুরু হয়ে যায় ছোটাছুটি। রত্না দুই সন্তানকে বাঁচাতে তাদেরকে রিকশা থেকে নিরাপদ দূরত্বে ছুড়ে ফেলেন। কিন্তু নিজেকে আর সরাতে পারেননি। মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তাঁর জীবন। শেষবারের মতো স্বামীর মুখ আর দেখা হল না। বাচ্চারা হয়ত কিছুদিন বাদেই ফিরে পাবে তাদের বাবাকে। কিন্তু মা যে হারিয়ে গেল চিরদিনের জন্য।

মায়ের মৃত্যুর পর গতকাল ছেলে খন্দকার আশফাক রিফাত ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সকালে খিলগাঁও রেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মায়ের মৃত্যুর সময় ১৪ বছরের রিফাতও ছিল তাঁর সঙ্গে। আরো ছিল তাঁর সাত বছর বয়সের বোন খন্দকার আতিকা সুলতানা রশ্মি। রিফাত কিছু কথা বললেও মাকে হারিয়ে রশ্মি ছিল পুরোপুরি নির্বাক। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র রিফাত জানায়, তার বাবা রিপন খন্দকার গত ১০ ডিসেম্বর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হন। তিনি বনানীর একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক। রিফাতের দাবি, তার বাবা গণগ্রেপ্তারের শিকার। কেন্দ্রীয় কারাগারের হাজতে থাকা বাবাকে দেখার জন্য রশ্মি খুব কান্নাকাটি করত। নানা দুশ্চিন্তায় অস্থির ছিলেন রিফাতের মা-ও। গত বৃহস্পতিবার রিফাতকে তার মা বলেন, ‘কাল তোর স্কুল বন্ধ, আমরা কালই যাব। এ নিয়ে মা-ছেলে মিলে নানা পরিকল্পনাও করে। হাজতে রান্না করা খাবার নেওয়া যাবে কি না, তা জানা না থাকায় তারা কিছু বিস্কুট নিয়ে যাবে বলে ঠিক করে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে রওনা হয় তারা।’

রিফাত জানায়, রেলক্রসিংয়ের একটি ট্রেন যাওয়ার পর ব্যারিয়ার তুলে দেওয়া হয়। তাদের রিকশাসহ কিছু যানবাহন সেই ফাঁকে ঢুকে পড়ে। পাশের রাস্তা দিয়ে ঢোকে দু-একটি। কিন্তু ট্রেন দেখে আবার ব্যারিয়ার ফেলে দেওয়া হয়। তখন আর যানবাহনগুলো সরতে পারেনি। প্রাইভেটকার ও রিকশা থেকে সব মানুষ রাস্তার পাশের দিকে দ্রুত সরে যায়। তারা মাঝে আটকা পড়ে যায়। মা প্রথমে রিফাতকে ধাক্কা দিয়ে রিকশা থেকে দূরে ফেলে দেন। পরে ফেলে দেন রশ্মিকে। এরপর ট্রেন এসে তাদের রিকশাটিকে গুঁড়িয়ে দেয়। দুর্ঘটনার সময় রিফাতের বাবার জন্য নেওয়া পানির বোতল ও বিস্কুটের প্যাকেটটা তার মায়ের হাতেই ধরা ছিল।

কাগজে যখন খবরটি পড়েছিলাম তখনই ভেবেছিলাম এই মায়ের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে দুকথা লিখব। তিনি জীবন দিয়ে বাচিয়ে গেলেন তার সন্তানদের। তার চির শান্তি কামনা করছি। তার বেহেশত নসীব হোক।

বলা বাহুল্য মায়েরা এমনই। এমনই তারা জীবনে মরনে আগলে রাখেন সন্তানকে। অথচ এই মা যখন বৃদ্ধ হন তখন আমরা যথার্থ মর্যাদা দিতে পারি না। তার ঠিক মত যত্ন আত্মি করতে পারি না।
দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদকীয় লিখেছে এই মাকে নিয়ে। সাধু ভাষায় লেখা মর্মস্পর্শী কথায় তারা লিখেছে–

একেই বলে মায়ের ভালবাসা

জন্ম-মৃত্যু সবকিছুই মহান আল্লাহর হাতে। রাখে আল্লাহ মারে কে আর মারে আল্লাহ রাখে কে-এই কথা আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। রত্না খন্দকার এভাবে প্রাণ হারাইবেন এবং তাহার সন্তানরা বাঁচিয়া যাইবে অলৌকিকভাবে, তাহা উপস্থিত লোকজন ভাবিতে পারেন নাই। তবে এই দুর্ঘটনার জন্য কে বা কাহারা দায়ী তাহাই এখানে আলোচ্য বিষয়। রেলক্রসিং দুর্ঘটনায় সাধারণত আমরা অবৈধ রেলক্রসিং কিংবা গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করিয়া থাকি। এইখানে ইহার কোনটিই ঘটে নাই। খিলগাঁও রেলক্রসিংটি আমরা বৈধ বলিয়াই জানি। সেখানে গেটম্যান উপস্থিত ছিলেন। তিনি ক্রসিংবারও ফেলিয়াছিলেন যথারীতি। কিন্তু সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের ড্রাইভার বেপরোয়াভাবে বারের বা ইহার আশেপাশের ফাঁক-ফোকর দিয়া রেললাইনে উঠিয়া যায় বিপজ্জনকভাবে। ইহারই প্রেক্ষিতে ঘটে দুর্ঘটনাটি। বস্তুত ইহা আমাদের অসচেতনতা, কোনকিছুকে তোয়াক্কা না করা ও অধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ। আমরা বিভিন্ন সম্পাদকীয়তে বারংবার ইহার উপরই গুরুত্বারোপ করিয়া আসিতেছি। জনকল্যাণ ও জনস্বার্থ রক্ষায় সরকারকে স্বীয় দায়িত্ব অবশ্যই পালন করিতে হইবে। কিন্তু জনগণ যদি সর্বক্ষেত্রে সজাগ ও সচেতন না হন, তাহা হইলে শেষপর্যন্ত অনেক সমস্যারই সুরাহা হয় না বা হইতে পারে না।

দায়িত্বরত গেটম্যান জানাইয়াছেন যে, নিয়ম লংঘন করিয়া রেললাইন পার হওয়ার সময় বাধা দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু চালকরা কথা শোনে নাই। এভাবে তাহার কথা কেহ শোনে বা আবার কেহ শোনে না, বরং অনেক সময় গালিগালাজ বা গায়ে হাত তোলারও চেষ্টা করে। বলাবাহুল্য, এই পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নহে। সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করিতে হইলে সকলকে আইন ও নিয়ম-কানুন মানিয়াই চলিতে হইবে। খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের আইনের হাতে সোপর্দ করা প্রয়োজন। তাছাড়া ক্রসিংবার একটু বড় করিতে অসুবিধা কোথায়? রেল প্রশাসনকে ইহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। বাংলাদেশে নানাভাবে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অহরহই ঘটিতেছে। এভাবে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুরও ইয়ত্তা নাই। তবে গণসচেতনতাই আমাদের বহুলাংশে এই সংকট হইতে পরিত্রাণ দিতে পারে।

সত্যি মায়ের এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের নানা দায়িত্বহীনতাকেও আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। রেল কর্মীরা আরেকটু সতর্ক হলেই এই মমতাময়ী মাকে বাঁচানো সম্ভব হত। এই ব্যার্থতার অনুশোচনা আমাদের মনে ক্ষত হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।