ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

মাননীয় আদালত, ‘ফতোয়ার’ বৈধতা দিয়েছন’, এ কথা ঠিক নয়; বরঞ্চ, ‘ফতোয়ার’ আবশ্যকতা যুক্তি সঙ্গত কারণে মেনে নিয়েছেন। যারা অন্যজনের মতামত আর বাকস্বাধীনতায় অবিশ্বাসী, যারা নিজেদেরকে ‘সবজান্তা শমসের’ মনে করে, যারা নীতি-নৈতিকতা বা ধর্মহীনহীন ভাবে যাচ্ছেতাই করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, ভোট বা কোন কিছু পাওয়ার আশায়, যারা মাথায় টুপি/কপালে তিলক আর হাতে তাসবীহ/গলায় জপ-মালা নিয়ে, মসজিদ-মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডায়, ঘুরে ঘুরে মানুষকে ধোঁকা দিতে, নির্লজ্জ-বেহায়ার মত আচরণ করে; “সেই তারা-ই” সকল ধর্মকে তাদের আগ্রাসনের “পথের কাঁটা” মনে করে; যুগে যুগে চেষ্টা চালিয়ে আসছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বিধি-বিধান, তথা ধর্মকে নিষ্ক্রিয় করা যায় কি-না — আর সে ধারবাহিকতায়, ‘সেই তারা’, ধর্মকে আদালতের কাঠগড়াতে দাঁড় করিয়ে সফল হওয়ার চেষ্টায় গলদঘর্ম হচ্ছে [মাননীয় আদালত ধর্মহীন না হ্‌ওয়াতে বারে বারে ব্যর্থতার কালিমা তাদের বদনেই লেপিত হয়]। সম্ভবতঃ ২/৩ বছর পূর্বে পত্রিকায় দেখেছিলাম, ‘ভারতে কোন এক মামলায় ‘ভগবানের’ বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী করা হয়েছিল। এতে বোঝা যায়, সামাজিক শৃঙ্খলায় একমাত্র কার্যকর বিধিবিধান, অর্থাৎ, ধর্মকে নিষ্ক্রিয় করে, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে, ঘোলা পানিতে “মাছ” শিকারে ‘সেই তারা’ কত মরিয়া !!

‘সামাজিক শৃঙ্খলায় একমাত্র কার্যকর বিধিবিধান’ বলার কারণ হলো; মানুষ রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান মানে, পুলিশ, জেল, জরিমানা, লোকলজ্জা ইত্যাকার ভয়ে। তাই, সুযোগ আসলেই, রাষ্ট্রীয় আইনকে ফাঁকি দিয়ে, নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে মনের ইচ্ছা প্রবলতর হয়। কারণ, রাষ্ট্রীয় আইন, মনের শাসনও করে না আর মনের বিচারও করে না। অপরদিকে মানুষ ধর্মীয় বিধিবিধান মানে, আন্তরিক বিশ্বাসের কারণে। তাই, ধর্মীয় আইন শুরুতেই মনের শাসন আর মনের বিচার করে বলে, মানুষ “স্বনিয়ন্ত্রিত” থাকে। স্বনিয়ন্ত্রিত মানুষ সমাজে শান্তির নিয়ামক। অতএব, কোনও সমাজে, “স্বনিয়ন্ত্রিত” মানুষের অর্থাৎ ধার্মিকের সংখ্যার অনুপাত যত বেশী থাকবে, সেখানে সামাজিক শৃঙ্খলাও তত বেশী থাকবে। আর “স্বনিয়ন্ত্রিত” মানুষের সংখ্যা কমে গেলে, সামাজিক বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে। মাননীয় আদালত, সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরোধী বলেই, ধর্মীয় বিধি-বিধানের পক্ষে; আর আদালতের সৃষ্টি তো অপরাধী-চক্রের শাস্তি-বিধান করে, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা অটুট রাখার জন্যে।
যারা চেঁচামেচি করে বলতেছে, ধর্মীয় বিধি-নিষেদ নারীর অধিকার ক্ষুন্ন করছে, —- আসলে তারা তাদের মনের কথা আড়াল করছে, — আর তা’ হলো, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ, অপকর্মকারীদের অপকর্ম করার সুযোগ-শুবিধা ক্ষুন্ন করছে। মনে হয়, তারা তাসলীমা নাসরীনের মতো, নারীর জরায়ুর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা তো, অন্যের স্ত্রী-মা-ভগিনী-সন্তানকে ভোগ করার প্রত্যাশী, কিন্তু তারা কী তাদের স্ত্রী-মা-ভগীনি-সন্তানকে অপরের ভোগের জন্য সহায়তা করবে ??
পর্যালোচনা করলে, দেখা যাবে যে, কোন ধর্মেই ‘অপরাধী’ সৃষ্টির কোনও উপাদানই নেই —- ‘দুষ্টের দমন, আর শিষ্টের প্রতিপালন’ ধর্মের মৌলিক ভিত্তি। সে কারণে-ই ‘ধর্ম’, ‘দুষ্টদের’ চোখের বালি। কালে কালে ‘দুষ্ট-চক্র’-ই, ধর্মের নানান বিকৃতি ঘটিয়ে, নিজেদের ‘স্বার্থ’ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সে দোষ তো ধর্মের নয়, — ‘দুষ্ট-চক্রেরই। ধর্মে অপরাধের উপাদান নেই বলে, ‘জাগ্রত বিবেকের আদালত’, ধর্মের আবশ্যকতার পক্ষে।
যে কোন ‘বিষয়ে’ পদক্ষেপ নিতে হলে, সে ‘বিষয়’ সম্বন্ধে ভালভাবে জানা, এক বা একাধিক মানুষের নিকট, পরামর্শ্ব/উপদেশ/মতামত চাওয়া হয়। অনুরূপভাবে কেউ কোন ধর্মের অনুসারী হলে, সে ধর্মের উপযুক্ত বিশারদের নিকট, বিভিন্ন কাজের বিষয়ে, উক্ত ধর্মীয় বিধি-বিধান জানতে চাওয়া হয়। তখন উপযুক্ত ধর্ম-বিশারদ ধর্মানুযায়ী যে মতামত প্রদান করেন; তা-ই ইসলামী পরিভাষায় “ফতোয়া” হিসেবে পরিচিত। প্রত্যেক ধর্মেরই অনুসারীগণ নিজ নিজ ‘ধর্ম-বিশারদের’ নিকট প্রয়োজনীয় তথ্যাদি জানতে চান। এটা আদালতের ‘রায়ের’ মতো নয়, বরং, আইনজীবী প্রচলিত আইনের নিরিখে, প্রার্থীকে যেমন আইনী পরামর্শ্ব দিয়ে থাকেন, তদনুরূপ। আইন অনুযায়ী, রায় দেয়ার এখতিয়ার যোগ্য বিচারকের, আর বাস্তবায়ন করার দায়-দায়ীত্ব, রাষ্ট্রের দায়ীত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের।
(চলবে)