ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

পর্বতাঞ্চলে আর আদিবাসী দু’য়ে মিলে প্রকৃতিকে মানিয়ে নিয়েছে বহুকাল ধরে। এরা জানে কি করে প্রকৃতির সম্পদকে ব্যবহার করা যায় কোনরূপ ক্ষতি (কোন কোন ক্ষেত্রে তারাও করে!) সাধন না করে। প্রকৃতিকে কি ভাবে লালন (বনায়ন) করতে হয় তাও শিখে নিয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকেই। তাইতো ঐ অঞ্চলে আদিবাসী, তাদের পরিবার, বাসস্থান, বাঁশের ঝাড়, এমনকি তাদের শুয়োরেরে খোঁয়াড় সবই যেন প্রকৃতির এক একটি অংশ হয়ে আছে।

তাহলে আজ কেন প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণ? কেন এমন নির্দয় প্রাণহানি? তা আর কাউকে বলে বোঝাতে হবে না বোধ করি।

আমি বড়ই নির্মম। আমার প্রতিশোধ অপ্রতিরোধ্য। ভুলে যেও না, আমার বিশালতায় তোমরা (মানুষ) কেবলই নগন্য, অতি তুচ্ছ। আর তাই মানুষ যখন তার
‘আধুনিকতা’র অস্ত্র নিয়ে আমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে, তা বড় একপেশে হয়ে দাঁড়ায়।

(যদি কিছু মনে না করেন) পাহাড় ধসে আজ যে প্রানহানি ঘটছে, প্রকৃতির বিচারে তা গৌন, মূখ্য হয়ে দাঁড়ায় পাহাড়ের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আমি আমার অসীম ঐশ্বরয্য তোমাদের জন্য ঢেলে দিয়েছি অকৃপন হাতে, আর তোমরা (মানুষ) তার অপব্যবহারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছ। দুঃখ হয় হতভাগ্য সেই সব দরিদ্র মানুষদের জন্য, যারা জীবনের তাগিদে ‘পাহাড় খাদক’দের খপ্পড়ে পড়ে, প্রকৃতি ধ্বংসের ‘হাতিয়ার’ হয়ে, অকারণে প্রান হারায়।

-মানব (রাষ্ট্র, গোষ্ঠী, ব্যক্তি) জাতি আজ সর্বগ্রাসী খাদকের ভূমিকায় আবর্তীণ। সব কিছু তার দখলে চাই। শূন্যস্থান রইবে নাকো শূন্য। তো ভাই, যাওনা শূন্য থেকে মহাশূন্যে। গড় আবাস, খোঁজ বাতাস। আমার বুকে কেন তোমার এই কোদাল আর কাস্তের আঘাত?

সমুদ্রের জলরাশি মেঘ হয়ে উড়ে যায় দূর পাহাড়ের চূড়ায়। তাই সমুদ্র তার সেই জলরাশি বৃষ্টি রুপে ফিরে পাবার আশায় আকুল হয়ে থাকে। আর সেই বৃষ্টির জল যখন পাহাড়ের বুক বেয়ে ধেয়ে আসে সমুদ্রের পানে, তোমরা তাকে নাগরিক জঞ্জালে আটকে দেও। আমার আর কি বা করার থাকে তখন? তাইতো আমি পাহাড়ে ধ্বস নামিয়ে, শহরকে প্লাবিত করে ছুটে যাই আমার গন্তব্য।

মানবজাতির প্রাণহানি আমাকেও ব্যথিত করে। তোমরাও যে আমাতে আশ্রিত। কিন্তু আমি যে আর সকলেরই মাতৃস্বরূপ। এই যে, পাহাড় পর্বত, নদী নালা, বন জঙ্গল, গাছ, পশু পাখি, আর সমুদ্র এরা তো সকলেই আমার সন্তান। আর তাই তোমরা যখন এদের কারও প্রতি অমানবিক ( অন্যরা কিন্তু তা করেনা, কারন তাদের মধ্যতো আর মানবিকতা নেই) আচরণ কর, তখন আমার সামোযস্য বজায় রাখা ছাড়া আর কি বা করার থাকে?

-তোমরা হয়তো ভাব, আমি নির্বাক নির্বোধ! গতিহীন! তা তো নই আমি! আমি চলি আমার আপন গতিতে। আমার গতি রোধে এমন কি কেউ আছে? যদিওবা কর চেষ্টা, আমি নজরুলের “বিদ্রোহী”। আমি বিধ্বংসী, আমি দুর্বার, আমি সব কিছুকে ভেঙ্গে করি চুরমার!

হে মানবকুল, তোমরা যে আজ নিজেদেরকেই ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে এসেছ। ক্ষান্ত হও। বাঁচাও ধরিত্রী। তবে তা অট্টালিকার শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত সুরম্য কক্ষের উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন আর তথাকথিত ‘Global Facility for Disaster Reduction and Recover -Fund’ এর মাধ্যমে নয়, তোমাদের প্রত্যেককে হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব।

তোমার যদি নিজের কাজে একটি গাছ কাটা প্রয়োজন পরে, তো নাওনা কেটে, কিন্তু ভাই এর বদলে আমার যে দু’টি চারা গাছ চাই। তোমাদের যদি নদীর বুকে বাধ দিতে হয়, তো আমার ন্যূন্যতম প্রবাহের ব্যবস্থাটুকু রেখ ভাই। তোমাদের সুন্দরবন তার অপার সম্পদের ভাগ তোমাদেরকে অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছে, ভয়াল ঘূর্ণিঝড় আর জ্বলোচ্ছ্বাস থেকে তোমাদের হাজার প্রানকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে, আর তোমরা তার বুক খালি করে ‘ব্যাঘ্রশাবক’ পাচারকারিতে নাম লেখাচ্ছ!

-প্রকৃতিকে টিকিয়ে না রাখলে তো তোমাদের নিজেদের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন। আর কতকাল এমন নির্বোধ আচরণ করবে? অচিরে তোমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এই কামনা করি। আর কোন ক্ষতি সাধন কোরনা আমার সন্তানদের। আমিও কথা দিচ্ছি তোমাদের মাতৃক্রোড় খালি করবনা।

বন্যেরা বনেই সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।