ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

তোরা কে যাবি বল জ্যোৎস্না স্নানে,
আয় আয় আয়।
সে এক চাঁদনী পশর রাতে
ছুটি টলমল পায়ে,
সে যে ডাকে ধরা তলে
আয় আয় আয়।।

পাগলদের মাঝে নাকি চন্দ্রাকর্ষণের প্রভাব একটু বেশী বেশী। ভরা পূর্ণিমার বিচ্ছুরিত জাদুকরী জ্যোৎস্নার ডাকে তাদের ‘Data Base’ এর ‘Saved Memory’ তে ‘Virus’ এ সংক্রমিত হয়। তাদের মনটা আনচান করে, নাচন ওঠে হৃদ মাঝে, ধরাতলে কাঁপন তুলে টলমল পায়ে তারা হেঁটে চলে জ্যোৎস্না পানে! কে যেন কেবলই ডাকে আয় আয় আয়!!
তাদের ফিরায় সাধ্য কার??

জ্যোৎস্না নাকি কারো কারো মাঝে ভর করে। কেউ তাতে ঘর ছাড়ে, কেউবা ঘরের দোর টানে। চাঁদনী রাতে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়েছেন কি কখনও? সামনে বিশাল বিশাল ঢেউ আর গর্জন, পিছনের ঝাউ বনে বাতাসের বোল, আপনার চুলে আর ভ্রুতে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি কনা; আপনি হয়ত একা কিংবা দু’জনায়। বলুন তো বুকে হাত রেখে, আপনার হৃদস্পন্দন ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়েই চলছিলো!!

সকালের ট্রেন ধরবেন বলে সেই ফজরের আযান শেষে, ছোট ভাইয়ের হাতে নৌকার হাল ধরিয়ে দিয়ে আর নিজে লগি ঠেলে ঠেলে বিলের জলে এগিয়ে চলছেন। চন্দ্রিমা তখন শেষ বেলায়। তারারা নিবু নিবু। আজ বড্ড দেরি হয়ে গেল বুঝি। পিছনে বন্ধুপরিজন আর ভিটে মাটির টান আর সামনে কর্মব্যস্ত শহুরে জীবন। দূর আকাশে অজানা গন্তব্যে ছুটে চলা একটা এরোপ্লেন ক্রমে ক্রমে হারিয়ে গেল দৃষ্টির আড়ালে। দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রেক্ষাপট আর তার সাথে ভাবনার জগত্‍। ভাবনার মাঝেই চোখ পড়ে গেল বিলের জলে। জলে ভিতর চন্দ্রালোকে লগি হাতে এ কার ছায়া? হঠাত্‍ চমকে গেলেন তো?

মাঘী পূর্ণিমার মাঝ রাতে বাড়ির উঠানে সদ্য ফোঁটা গন্ধরাজ কিংবা হাসনাহেনার কাছে গিয়েছেন কখনও? গন্ধ নিয়েছেন ঐ ফুলের? কি রকম লেগেছিল তখন? কেমন নেশা নেশা লাগে, তাই না?

সে যাই বলুক লোকে, যেমন করেই ভাবুক, চলুন না আমরা ক’জন জ্যোৎস্না পাগল, ‘চাঁদনী পশর’ এক রাতে পদ্মায় ইলিশ ধরা নৌকো তে বা চা বাগানের মধ্যকার বিশাল বিশাল বৃক্ষের জ্যোৎস্না-ছায়ায় অথবা ‘নিদ্রার চর’ নামক নির্জন দ্বীপের কাশ বনে কিংবা ধরুন চিম্বুকের বুকে ছাঊনি তুলে! আর উত্তরে গেলে সোমেশ্বরীর বালুচড়ায় হেড়ে গলায় সুর তুলি ‘পূবালী বাতাসে……………’ আর হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে চিৎকার করে বলতে থাকি; আমি জ্যোৎস্না খা……………ব!

জ্যোৎস্না স্নানের একটা অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে শেষ করছি;

বেশ কয়েক মাস বিরিশিরি-দুর্গাপুর থাকার সুযোগ হয়েছিল। স্থানীয় কিছু বন্ধুও জুটে ছিল। তো সবাই একদিন মধ্যরাতে জ্যোৎস্না স্নানে সোমেশ্বরীর পাড়ে হাজির হলাম। (অবশ্যই হুমায়ুন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে) সময়টা শরত্‍ কাল ছিল বোধ করি। নদীর পাড়ে বালু খুঁড়ে, আমরা ক’য়েক আদম সন্তান জ্যান্ত কবরস্থ হলাম! কতক্ষন? নাহ! বেশিক্ষণ ওভাবে থাকা হয়নি। শরীরটাকে বালুতে পুঁতে রেখে, চন্দ্রমুখী হয়ে কিছুক্ষন পরেই আমরা আঁতকে উঠেছিলাম, শরীর আর মনের মাঝে কিরকম এক অজানা ভীতিকর অনুভুতি কাজ করছিলো। শরীরে কাঁপুনি উঠেছিল। পড়িমড়ি করে উঠে পড়ে, সুমেশ্বরীর শীতল জলে গা ধুয়ে কিছুটা শান্ত হলাম। অতঃপর নিজেদের ভয় পাওয়া নিয়ে হেসে লুটোপুটি খেলাম। আর হ্যাঁ, ঐদিনও আমি ভয়ের চোটে সিগারেটের উল্টো দিকে আগুন জ্বেলেছিলাম। এক বন্ধুর চপটাঘাতে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। ওটা যে ছিল ৪/৫ জনের সর্বশেষ ভরসার তামাক শলাকা!!


‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে, বসন্তেরই মাতাল সমীরণে আজ………’