ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

আমরা বাঙ্গালী জাতি, হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে ধারন করে চলেছি আমরা বহুকাল ধরে। অনেক ধর্মের মানুষ এখানে একসাথে মিলেমিশে বসবাস করার অভ্যাস আমাদের বহু পুরানো। আমাদের এই উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, জীবনযাপন প্রনালী, কৃষ্টি-কালচার, সভ্যতা-বভ্যতা, লাইফ স্টাইল, পোষাক-পরিচ্ছদ, আদব-কায়দা, এই সবকিছুই বিশ্বের অন্যান্য ভৌগলিক এলাকার তুলনায় একটু আলাদা এবং অনেক বেশী পরিমার্জিত। উপমহাদেশের কথা বিবেচনা করলে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা ইত্যাদি এলাকার মানুষের জীবন যাপন প্রনালী, কৃ্ষ্টি-কালচার সভ্যতায় অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। যতটুকু বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে ব্যতিক্রম ঘটনাবলী যা সম্পুর্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেনা । আমার আজকের এই লেখার উদ্দ্যেশ শুধু আমাদের পোষাক-পরিচ্ছদ নিয়ে। প্রিয় পাঠক কোন ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিবেন প্লিজ্। আজ থেকে ২০০ বা ৩০০ বছর আগের ইতিহাস দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।সম্রাট আকবর, শাজাহান, জাহাঙ্গীর, আওরঙ্গজেব, চেঙ্গিস খান,মির্জা গালিব, টিপু সুলতান কিংবা মহাত্না গান্ধীর সময়কাল ইতিহাসে পড়েছি কেবল। কিন্ত চলচিত্রের আশির্বাদের কারনে কতিপয় মুগল আমলের চলচিত্র দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল যেখানে চলচিত্রের নায়ক নায়িকাদেরকে অত্যন্ত শালীন পরিশিলীত পোষাক পরিধান করে অভিনয় করতে দেখা যায়। যেখানে পোষাক হত তাদের সুন্দর উন্নত ব্যাক্তিত্বের পরিচায়ক। ছবিগুলো ছিল আমাদের জীবন থেকে নেয়া সুখদুঃখের ঘটনাবলীর প্রতিচ্ছায়া। সমস্ত শরীর আবৃত রেখে ঝকঝকে চকচকে আলো ঝিলমিল পোষাক পরিচ্ছদ আমাদের মনে দারুন এক আকঙ্খা জাগিয়ে তুলত ‘এইরকম একটা পোষাক আমারও যদি থা্কত’ এই ভাবনায়। আর মেয়েদের পোষাক? সে তো ছিল দারুন এক্ পুজনীয় ব্যাপার। কি সুন্দর তারা ঝিলমিল খচিত পোষাক পরিধান করে, এমন ভাবে কোথাও যেন কোনপ্রকার শালীনতার অমর্যাদা না হয় সেই খেয়াল রেখে অভিনয় করত, আর আমাদের মন ভরে উঠত অসম্ভব এক ভাল লাগায় অসম্ভব এক কল্পনায়।শালীন অথবা মার্জিত পোষাক্ কে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে “যে পোষাক পরিধান করিলে শরীর অথবা শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো সম্পূর্নরুপে আবৃত থাকে এবং লোকচক্ষুর দৃষ্টিরগোচর হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা যাতে করে তার মনে (যে দেখল) খারাপ অথবা প্রতিক্রিয়াশীল কোন চিন্তা প্রবেশ করতে পারেনা যা তার মানবিক্ মুল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে, তাকেই আমরা মার্জিত অথবা শালীন পোষাক বলে অভিহিত করতে পারি” । যাই হোক, বিনোদন ছিল তখন সপরিবারে উপভোগ করার মত একটি সার্বজনীন ব্যাপার। গত শতকেও ভারত,পাকিস্তান কিংবা স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশেও অনেক চলচিত্রে সুন্দর সুন্দর শালীন পোষাক পরিচ্ছদ করে অভিনয় করতে দেখা গেছে যেগুলো আমাদের সমাজে পোষাক-আশাক সম্বন্ধে অনেক ভাল ইমপ্রেষন তৈরী করে। চলচিত্রের গান থাকত অন্যরকম এক আরাধনার বিষয়। কত মধুর, কত ভাবাত্নক, কত আবেগময় ছিল গানের কথা ও সুর। উদাহরন হিসাবে এই মুহুর্তে মোগল-ই-আজম, মির্জা গালিব, সোর্ড অব টিপু সুলতান, আনার কলি, আকবর ড্যা গ্রেট্ ইত্যাদি ছাড়াও আরও অনেক আধুনিক্ ও রোমান্টিকধর্মী ছবি যেমন দ্বীপ জেলে যাই, আনন্দ আশ্রম, কাভি খুশী কাভি গাম, ফির তেরি কাহানী ইয়াদ আয়ে, জুর্ম, মুকাদ্দার কি সিকান্দার,অথবা বাংলাদেশী ছবি যেমন ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘মনের মত বউ’, ওরা এগার জন, মাটির পুতুল, এবং অধুনা টেলিফিল্ম ধাঁচের ছবি ব্যাচেলর, হঠাৎ বৃষ্টি, রং নাম্বার, আগুনের পরশমনি, হাউসফুল, ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি, ফেরা, ইত্যাদি ছাড়াও আরো অনেক ছবিতে নায়ক নায়িকাদের সুন্দর শালীন পোষাক ও সাবলীল অভিনয় আমাদের মনকে সুন্দরভাবে প্রভাবিত করে । এমনকি আরব্য রজনী তথা এরাবিয়ান নাইট্স এ দেখা অনেক ছবিতে (যেমন আলিবাবা চল্লিশ চোর) দস্যুবৃত্তির মানুষ যেমন ডাকাত বা হিংস্র চরিত্রের অভিনেতাকেও দেখা গেছে অনেক সুন্দর ও মার্জিত পোষাক পরিধান করে অভিনয় করতে।এবার আসা যাক্ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন যেমন পেন্ট-শার্ট পরিহিত ছেলেমেয়েদেরকে একসাথে একযোগে চলাফেরা কিংবা ক্লাশ করতে দেখা যায় আজ থেকে ২০-৩০ বৎসর আগে কি আমরা তা কল্পনা করেছিলাম কেউ? কখনো কি ভেবেছি আমরা যে এই দেশে পাঠক্ এই বাংলাদেশের মাটিতে মেয়েরা টাইট জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট পড়ে যাবে ক্লাশ করতে, যাবে শপিং করতে, হাটবে বয়ফ্রেন্ডদের হাত ধরে, অথবা লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে পাবলিক ভর্তি বাসের মধ্যেই বসবে জড়াজড়ি করে অথবা চুমু খেয়ে প্রকাশ করবে যে তারা পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসে। এই চিত্রতো ইউরোপ আমেরিকার জন্য, বাংলাদেশে কেন তারা এই প্র্যাকটিস্ করতে চাইছে বুঝিনা। তাদের উদ্দেশ্যই বা কি? আমরাতো বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছি, গড়েছি বাংলা সংস্কৃতির বলয়, পড়েছি বাংলা মায়ের কবিতা-গান, শিখেছি বাঙ্গালি সভ্যতার সাতকাহন, খেয়েছি বাংলা মায়ের বকুনি হাজারবার, দেখেছি বাংলামায়ের ক্ষতবিক্ষত রক্তাত্ব অগ্নিমুখ, পেয়েছি বাবার কড়া শাসন। আমরাতো পারিনা ইউরোপ আমেরিকার মত পোষাক পড়ে ইউরোপ আমেরিকার মত খোলামেলা চলাফেরা করবে আমাদের সন্তানেরা এই বাংলাদেশে, এটা ভাবতে। তাহলে আমরা যারা রক্ষনশীল জীবন যাপনে বিশ্বাসী তারা যাব কোথায়, কেউ কি বলতে পারেন প্রিয় পাঠক্ ? এই বাংলা কি আমাদের বসবাসের জন্যে নয়? পাশ্চাত্য সংস্কৃতি কি পুরোপুরি গিলে খাবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির আবহকে?

আমরা তো দেখেছি, যারা শালীন ও মার্জিত পোষাক পরিধান করে তাদের ব্যাক্তিত্ব, সম্মান, সম্ভ্রমবোধ সবকিছুই খোলামেলা পোষাক পরিহিতার চেয়ে আরো বেশী উন্নত হয়ে থাকে। যারা পর্দা আব্রু রক্ষা করে চলে, মার্জিত পোষাক পরিধান করে চলে, সংরক্ষিত জীবন যাপন করে তাদেরকে কি আমরা কখনো ইভ্ টিজিং এর শিকার হইতে দেখি? নাকি দেখি কোথাও লাঞ্চিত হইতে? যদি এমন শিকার কখনো হয়েও যায় তখন কি গোটা সমাজ তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় না? আজ সকালে যখন অফিসে আসছিলাম দিবানিশি পরিবহনে, রামপুরা বাজার এলাকায় আসতেই দুই দুইটা পুলিশের পিক্‌ আপ্ ভ্যান দেখলাম আমাদের পাশাপাশি এগিয়ে আসছে। হঠাৎ গাড়ির ভিতরে চোখ পড়তেই দেখি প্রথমটাতে একজন মহিলা তার সর্বাঙ্গ ঢাকা একটি স্মার্ট পোষাকে বসে আছেন হয়ত কোন মহিলা পুলিশ অফিসার সাদা পোষাকে অফিসে যাচ্ছেন, আর তার পরের গাড়িতেও দেখতে পেলাম একই দৃশ্য তাও আবার পুলিশের গাড়িতে অর্থাৎ পুলিশ পড়ছে মার্জিত-শালীন পোষাক্। ভাবলাম এরা তো সবার জন্য অনুকরনীয় হতে পারতো, সব মেয়ে অথবা মহিলারা যদি এমন করে পর্দা-আব্রু ধরে রাখত তাহলে পাশ্চাত্য পোষাক আর সংস্কৃতি কাকে গিলে খেতে পারবে? কে সাহস পাবে ওদেরকে একটু টিজ্ করার? পুরুষরাও যদি বইতে থাকি একই ধারায়্ ? আমাদের সরকার কি পারবেনা, ইরান, তুরস্ক, সৌদি আরব, আফগানিস্থান, পাকিস্তান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, লিবিয়া, ইয়েমেন, কাতার, কুয়েত অথবা জাপান (মেয়েদের পোষাক অত্যন্ত মার্জিত এবং স্মার্ট) ইত্যাদি দেশের মত ড্রেস্ কোড্ তৈরী করে অথবা কোড অফ কন্ডাক্ট প্রবর্তন করে নিয়ন্ত্রন করতে আমাদের, রক্ষা করতে আমাদের ইজম্, আমাদের কৃষ্টি, আমাদের কালচার এবং আমাদের সভ্যতা? এটা কি খুব কঠিন কাজ প্রিয় পাঠক্। ভারত বর্ষের আরেক মহীয়সী নারী ইন্ধিরা গান্ধী তার পুত্রবধু সোনিয়া গান্ধী, শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা কিংবা আমাদের দেশের মহিয়ষী নারী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, জাসদ নেত্রি শিরিন আখতার, বেগম খালেদা জিয়া, ওনাদেরকে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শালীন পোষাক শাড়ীতেই কি সবচেয়ে বেশী সুন্দর আর পবিত্র লাগেনা? পরিহিত পোষাক শালীন, মার্জিত অথবা বাঙ্গালী ধাঁচের হলেইতো আমাদের নারীদের ব্যক্তিত্ব, আকর্ষনীয়তা, মর্যাদা আর সম্মান আরো বেশী বাড়িয়ে দেয় তাইনা প্রিয় পাঠক্? আমরা কি ৩০-৩৫ বৎসর আগেই ভাল ছিলাম না?

******************************( লেখাটি আরও পরিমার্জন করা হবে)