ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

অতি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় শিক্ষকদের “কোচিং বাণিজ্য” নিয়ে অনেকটা জেহাদে নেমেছেন। কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানো বন্ধের ঘোষণায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণ। প্রথমেই আমাদের ভাবা দরকার একজন শিক্ষক সারামাস খেটে কেন সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে প্রাইভেট পড়ান? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন শিক্ষক নিতান্তই পেটের দায়ে, সংসারে সামান্য স্বচ্ছলতার জন্য প্রাইভেট পড়ান। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। একজন মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল শিক্ষকের মাসিক মূল বেতন হলো ৮০০০ টাকা সাথে ১০০ টাকা বাড়ীভাড়া ও ১৫০ টাকা চিকিৎসা ভাতা সাকুল্যে ৮,২৫০ টাকা। অপরদিকে একজন কলেজ শিক্ষকের মূল বেতন ১১,০০০ টাকা সাথে ১০০ টাকা বাড়ীভাড়া ও ১৫০ টাকা চিকিৎসা ভাতা সাকুল্যে ১১,২৫০ টাকা। প্রশ্ন হল, ১০০ টাকায় বাংলাদেশের কোথাও কি বাসা ভাড়া পাওয়া যায়? বর্তমানে থানা পর্যায়েও ৫০০০ টাকার নিচে কোন বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না এ বিষয়ে আশা করি সবাই আমার সাথে একমত হবেন। ফলে যে শিক্ষক ৮,২৫০ টাকা বেতন পান, ৫০০০ টাকা বাসা ভাড়া দিয়ে অবশিষ্ট ৩,২৫০ টাকায় তিনি কিভাবে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাস পার করবেন? কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অবশিষ্ট এ টাকার পরিমাণ ৩,২৫০ টাকার পরিবর্তে ৬,২৫০ টাকা- যা একটি সংসারের একমাস খরচ নির্বাহের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বর্তমানে সাধারণ মানের একজন ডাক্তার দেখাতেও কমপক্ষে ৫০০ টাকা ভিজিট দিতে হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ওষুধপত্রের কথা না হয় বাদই দিলাম। ফলে প্রাইভেট পড়িয়ে বাড়তি দু’পয়সা উপার্জন ছাড়া শিক্ষকদের বেঁচে থাকা কীভাবে সম্ভব? কোচিং বাণিজ্যের জন্য ঢালাওভাবে সমগ্র শিক্ষকসমাজকে দোষী করা হলেও কলেজ এবং স্কুল পর্যায়ে এমন অনেক বিষয় আছে যেসব বিষয়ে আদৌ প্রাইভেট পড়তে হয় না ফলে ঐসব বিষয়ের শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানোর কোন সুযোগ থাকে না। ফলে তাঁদের অবস্থা আরও শোচনীয়, শুধু বেতন নির্ভর জীবন যাপন। সরকারিসহ অন্যসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকসহ প্রায় সব পেশাতেই মূল বেতনের সমপরিমান উৎসবভাতা দেয়া হয়। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন শিক্ষক তাঁর মূল বেতনের মাত্র ২৫% উৎসবভাতা পেয়ে থাকেন। ২০০০ বা ২,৭৫০ টাকায় কোরবানী দেয়া কী সম্ভব, যদিও উৎসব উদযাপনের জন্যই উৎসবভাতা প্রদান করা হয়। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে ঈদ-উৎসবে নতুন জামা পড়তে বা একটু ভালো খাওয়া-দাওয়া করতে ইচ্ছে করেনা? দেশের মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থার মোট ১০ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান আর ৯০% শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নির্ভর- যেখানে ৫ লাখেরও বেশী শিক্ষক কর্মচারী পাঠদান কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। একই বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ হয়েও এবং একই পাঠ্যক্রম অনুসারে পাঠদান করেও তুলনামূলক বিচারে ফলাফলের দিক থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠাগুলো সবসময়ই সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এগিয়ে থাকে। অথচ বেতন ভাতা বা অন্যসব সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণ সর্বদাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অবহেলিত। শিক্ষকদেরকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্ত বৈষম্যের শিকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের পেটে ভাত না থাকলে তারা কিভাবে মানুষ গড়ার কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবেন? পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কোন শিক্ষকের বেতনই ২৫ হাজার রূপীর নীচে নয়। শিক্ষকরা যদি তাঁদের মানসম্মত জীবনধারণের জন্য মোটামুটি বেতনভাতা পেতেন তাহলে হয়তো প্রাইভেট বা কোচিং বাণিজ্য করতে হতো না, কারণ এটাও কম কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। অথচ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, “ভাত দেবার মুরোদ নেই কিল দেবার গোসাই”। আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণ করুন, তারপরে প্রাইভেট তথা কোচিং বাণিজ্য বন্ধের জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকসমাজের কোন আপত্তি থাকবে না। কারণ কথায় আছে, “পেটে দিলে পিঠে সয়”।