ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায় বন্ধু আছি বড় দুঃখে,
অমর কাব্য লিখিও তোমরা যারা আছো সুখে।

কবিতার লাইন দুটো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে, যারা জ্ঞাণী-গুণী তারা সারাজীবন অর্থ কষ্টে ভোগে। আমি উপরোক্ত বিষয়ের জন্য লেখাটি লিখি নি। লিখেছি অন্য এক কারণে, নিচে তা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি।
বেশ কয়েকমাস থেকে আমার সংবাদপত্র লেখালেখি এবং ব্লগে ব্লগিং করা কমে গেছে। কেন এমন হলো নিজেও বুঝতে পারছি না। অথচ একসময় লেখালেখি না করলে ভাল লাগতো না। যদিও আমি লেখক হিসেবে তেমন ভাল নয়। বলতে গেলে লেখক হিসেবে কোন স্বীকৃতি নেই আমার। তবে প্রতিবন্ধিতা বিষয়টি যখন ভাবতে শুরু করি তখন বুঝতে পেরেছি যে, এ দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীদের উন্নয়ন করাটা সহজ কাজ নয়। দেড় কোটি জনগোষ্ঠীদের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। তাদের চাওয়া-পাওয়া তথা ব্যাসিক নিড পূরণ না হওয়ায় হতাশার গ্লানি নিয়ে সারাজীবন কাটাতে হচ্ছে।

আমি যখন কোন মিটিং, সভা, সেমিনারে যাই তখন একই সমস্যার কথা শুনি। যারা শারীরিক প্রতিবন্ধী তারা প্রবেশগম্যতার জন্য রাম্প এর কথা বলে। দৃষ্টিরা বলে তাদের প্রবেশগম্যতার কথা। বাক-শ্রবণরা বলে ইশারা ভাষার কথা। সবগুলোকেই সমর্থন করি। সবগুলোই মহৎ কাজ। বেশ কিছুদিন আগে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের এক নেতা ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিল। জেলা প্রশাসক জিজ্ঞাসা করলো আপনারা কি কাজ করেন। প্রতিবন্ধী আন্দোলনের নেতা বললেন, স্যার সচেতনা বৃদ্ধি, এ্যাডভোকেসিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্থানে রেফার করি।জেলা প্রশাসক সরাসরি বলে ফেললেন, ওসব বুং বাং ছাড়েন মিয়া। আয়বর্ধনমূলক কাজ কর্ম করেন। বহুত সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেশে হয়েছে। আর দরকার নেই। কথাটি যখন এক বন্ধুর মুখে শুনলাম তখন আমার মধ্যে একটা নতুন উপলব্ধির সৃষ্টি হলো ।

সেটা হচ্ছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়নের জন্য দরকার শিক্ষা এবং আয়বর্ধকমূল কার্যক্রম। শিক্ষা ছাড়া কোন জনগোষ্ঠী উন্নতি লাভ করতে পারে না। ঠিক টাকা ছাড়া কারো জীবনে ক্ষমতায়ন ঘটবেনা ।যে যতই বলুক। বেশ কিছু দিন আগে সরকারি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ এর অধিক বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উত্তীর্ণ হয়ে দিয়েছে। ভাইভার আগে অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমার সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ চেয়েছে। অনেকে তাদের সাথে একযোগে কাজ করার কথা বলেছে। যেহেতু আমিও একজন প্রার্থী সেহেতু নিজেও তাদের সাথে একজোট হয়েছি। বিশেষ করে ভিপস নামের একটি সংগঠন এ ব্যাপারে যথেষ্ট এ্যাডভোকেসিও করেছে। একটি কথা না বলেও পারছি না যে, ঢাবির ১০ থেকে ১২ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সাথে একজোট হয়ে আমি নিজেও শিক্ষাসচিবের কাছে গিয়েছি। শিক্ষামন্ত্রী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করেছি। তারা সকলে আশ্বস্ত করেছে এবারের মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোটা সংরক্ষণ করা হবে। তোমাদের কোন চিন্তা নেই। জানি না দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাগ্যে কি আছে। তারপরেও মাথায় চিন্তা। দৃষ্টিরা হচ্চে মূলত গুরুতর প্রতিবন্ধী । এদেরকে ঠিকই পিছিয়ে রাখা হবে নাকি তারা অধিকার পাবে চাকুরির ক্ষেত্রে। কারণ, ভাইভা বোর্ডেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধকতা নিয়েই বেশি প্রশ্ন করেছে।

তবে কষ্ট পেয়েছি যে, কয়েকটি সংগঠনের নেতার কথায়। যারা গলা উঁচু করে কথা বলে। তাদের সাথে যখন এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেছি তখন তারা বলেছেন যে, টাকা ছাড়া কি কাজ হবে? দেশে দুর্নীতি চলছে। কোন কোন সংগঠনের প্রধানরা বলেছেন, কাজের চাপ। কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তখন একজন ক্ষীণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে আমার উপলব্ধি হয়েছে যে, নিজেদের অধিকারে কথা নিজেদেরই বলতে হবে। অথচ আমাদের চাকুরি হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কর্মরত নামধারী সংগঠন সমূহ বলবে আমাদের এ্যাডভোকেসির ফলে প্রতিবন্ধীদের চাকুরি হয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যারা উচ্চ শিক্ষিত প্রতিবন্ধী। তাদের জীবনে দুর্দশার সীমা নেই। না পারে ভিক্ষা করতে না পারে ঘরের কোণে বসে থাকতে। অথচ আমাদের নিয়ে বাস্তবে কোন সংগঠন চিন্তা করছে না। কেউ আছে ধান্দাপানি করার সুযোগে। কেউ প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে রাতারাতি বিখ্যাত হওয়া জন্য। আবার কতিপয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিবন্ধিত্বের আবেগ সৃষ্টি করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার ধান্দায় রয়েছে। যতটুকু কাজ না হচ্ছে তারচেয়ে বেশি প্রচারণা ওসব সংগঠনসমূহের যেমন ঠিক সরকারেও। কি হবে লেখালেখি এবং ব্লগিং করে। বৃথা সময় নষ্ট নাকি একসময় আমাদের দাবী পূরণ হবে।আর কতকাল আন্দোলন করতে হবে আমাদের। আমাদের কেন অধিকার দেওয়া হচ্ছে না? তাই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল, বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায় বন্ধু আছি বড় দুঃখে, অমর কাব্য লিখিও তোমরা যারা আছো সুখে।……. আজ এ পর্যন্ত।