ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই দেশে একসময় সকলের ঘরে-ঘরে গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোহাল ভরা গরু ছিলো। সকলে সুখ-শান্তিতে মনোরম পরিবেশে স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতো। প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম আকাশ ছোঁয়া পরিমান ছিলনা। জান-মালের নিরাপত্তা ছিল। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে সহযোগিতায় একে অপরে এগিয়ে আসতো। দশে মিলে নিঃস্বার্থভাবে গ্রাম পর্যায়ে নানা উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করতো। কুটির শিল্পে নানা রকমের সৌখিন বস্তু ও দ্রবাদি উৎপাদিত হতো। মেয়েরা বর্ষাকালে শিকা তৈরী করত, নকসী্ কাঁথা সেলাই করত। শীতকালে নানা ধরনের পিঠা বানাত। ফলে দেশী দ্রবাদি ব্যবহারের প্রতি মানুষের ব্যাপক চাহিদা ছিলো। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্রয় মূল্য ছিলো ক্ষমতার মধ্যে । বৈচিত্রময় ষড় ঋতুতে নানা সংস্কৃতি চর্চা করা হতো। ধর্মে-ধর্মে ছিলনা বিভেদ। নিজ সংস্কৃতির প্রতি মানুষের ছিলো শ্রদ্ধাবোধ। কৃষক, মাঝি, মুচি, শ্রমিকসহ হ্রত দরিদ্র পেশাজীবী মানুষ দিনে হাড় ভাঙ্গা খাটুনি করে রাতে আরামে ঘুমাতো । বাবা মা, শিক্ষক, মুরবিবদের সম্মান করত। যৌতুত, নারী নির্যাতন, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, প্রতিহিংসার রাজনীতিসহ জঘন্যতম কর্মকান্ড অহরহ ঘটতো না। হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘাট, লংমাচ,রোড মার্চ, ক্যাম্পাসে রাজনীতিসহ দেশ ধবংস্নাতক কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকত মানুষ। দেশের প্রতি ছিলো মানুষের দেশপ্রেম। জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি, বর্গীদের অত্যাচার, ব্রিটিশদের শাসন, বিদেশী অপ-সংস্কৃতি চর্চা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চোরাচালান, হুন্ডি পাচারসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের সেই ঐতিহ্য কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে।

আর শোনা যায়না জেলে ও নৌকার মাঝির কন্ঠে ভাটিয়ালী, পল্লীগীতি, জারি-সারি গান, দেখা যায়না দরিদ্র কৃষকের মুখে হাসি। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম হু-হু করে বেড়ে চলেছে। নিম্নবিত্ত, দরিদ্র, অসহায়, কৃষক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সুবিধা বঞ্চিত মানুষ দিশেহারা । দু’মুঠো ভাত জোগাড় করার জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। অথচ এই সোনার দেশে রয়েছে সোনার মাটি, সোনার ছেলে।

কিন্তু গরিব-দুঃখী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষ তাদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দিন-দিন ধনী-গরিবের বৈষম্য ও অসমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৫ শতাংশ ধনী লোক জাতীয় আয়ের প্রায় ৩১ শতাংশ ভোগ করছে। দারিদ্রের সর্বনিম্ন অবস্থানকারী মাত্র ৫ শতাংশ লোক জাতীয় আয়ের মাত্র শুন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ ভোগ করে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ৩০ লাখ শহীদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। এ স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিলো একটি সমৃদ্ধিশালী,আত্ননির্ভরশীল, সুখী-সুন্দর, ও শান্তিময় দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমান আধুনিক বিশ্বের তথ্য-প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে বটে। কিন্তু স্বাধীনতার ৩৫টি বছর অতিক্রম করার পরও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনুস শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন। এটি জাতির সুনাম কে বিশ্বের দরবারে বৃদ্ধি করেছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষ শান্তি পাইনি।

বাঙালি জাতির জনক ‘বঙ্গ বন্ধু’ শেখ মজিবুর রহমান ১৪ আগষ্ট একশ্রেণীর ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে ক্ষমতায় এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নোংরা রাজনীতি, দুর্নীতি, অশিক্ষা, মজুতদারদের শোষণ এদেশুও জাতিকে কুঁড়ে-কুঁড়ে খেয়েছে। গত ৫ বছরে দেনা বেড়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা। যে দেনার দায় দেশের সকল মানুষের ঘাড়ে চাপছে।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত হয় মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য। এটাতে ৮ টি টার্গেট রয়েছে। যথা: ১. চরম দারিদ্র ও ক্ষুধা দুর করা ২. সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন ৩. নারী-পুরুষের সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন ৪. শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস ৫. মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি ৬. এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগের বিস্তার রোধ করা ৭. টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ৮. উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব। ২০১৫ সালের মধ্যে টার্গেটগুলো পূরণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই একমত হয়ে স্বাক্ষর করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ২০১০ সা, দুর্নীতি, জোতদার-মজুতদারদের শোষণসহ নানা কারণে দেশের মানুষ কে অসান্তি ভোগ করতে হয়েছে। ১/১১ এর মাধ্যমে দেশ ও জাতির স্বার্থে তত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশ থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদ করার জন্য দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য পেশাজীবীদের গ্রেফতার করেছিলো। এমনকি বর্তমান প্রধান মন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাননীয় বেগম জিয়া এবং ছেলে তারেক রহমানসহ অনেক এমপি, মন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছে পুলিশর হাতে। কোন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের ছাড় দেয়া হয় নি। পরবর্তীতে কিছু হয় নি। দুর্নীতিবাজদের অনেকেই ক্ষমতায় এসেছে। তারা সাধু সেজেছে। তাদের নাকি ঘায়েল করার জন্য তত্তাবধায়ক সরকার গ্রেফতার করেছিলো। অনেকে ড. মঈনউ আহমেদের বিচার দাবি করেছে। এমনকি বিরোধী দলীয় নেত্রী তিসাহেবের বিচার চান।ল পর্যন্ত টার্গেট দেয়া হয়। ২০১১ সাল শেষের পর্যায়ে।কিছু-কিছু ক্ষেত্রে ভালোই এগিয়েছে আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, নোংরা রাজনীতির কারণে দেশ এগুতে পারছে না।

দুদক দুর্নীতি বন্ধে তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন কতে পারে নি। উল্টো দুদকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের একাধিক অভিযোগম সংবাদ সংবাদপত্রের প্রকাশিত হয়েছে।

লে আবারক ও দুর্নীতিবাজরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে। এতে সন্দেহ নেই। ফলে কিছুদিন আগে শেয়ার বাজারে কারসাজির মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে পথের ভিখারী বানানো হয়েছে।
স্বাধীনতার ৪০ বছরের শেষে দেশের ১৫ কোটি জনগণের স্বপ্ন হচ্ছে- কবে বাংলাদেশ উন্নত ও শান্তির দেশ হবে। কবে মালেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মহাথির মুহাম্মদের মত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশে জন্ম গ্রহণ করবে। বর্তমান দিন বদলের সরকারের অদম্য চেষ্টা ও ভূমিকা কি দেশকে এগিয়ে নিতে পারবে? সবার একই প্রশ্ন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সহযোগিতা না হলে দেশ কখনো উন্নত হবে না। বিষয়টি নিয়ে সকলে নিজের অবস্থান থেকে চিন্তা ভাবনা করি।
লেখক:
আজমাল হোসেন মামুন
(ফ্রিলান্স সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী )