ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাস্থ্য

 

নাসরিন আকতার (৪০) একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী। লেখা-পড়া কিছুই জানেনা। ১৪ বছর বয়সে পার্শ্ববর্তী এক দরিদ্র কৃষকের সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামী কৃষি কাজে সব সমই ব্যস্ত থাকত। সাংসারিক দায়িত্ব পালন করত নাসরিন। বিবাহিত জীবনের ২৬ বছরে ঘরে জন্ম নেয় ৬ মেয়ে ও ১ ছেলে। ছেলের আশায় সন্তান নেওয়া বন্ধ করে নি। ফলে এই বয়সী সন্তানদের নিয়ে অতি কষ্টে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। মাঝে মধ্যে উপোস বা অনাহারে থাকতে হয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হলে স্বামী দোষ দেয় নাসরীনের। নাসরীন নিজের দোষ স্বীকার করে ঘরে বসে কাঁদে। অথচ তাদের বাড়ীর পাশে ছিল ইউপি স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কেন্দ্র।

মোসাঃ সুখি বেগম (৪৭) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক দিনমজুরের ঘরে জন্ম গ্রহণ করে। গ্রাম্য রীতি অনুযায়ী মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় পার্শ্ববতী গ্রামের আল আমিন নামের এক দিনমজুরের সাথে। বর্তমানে সে চার মেয়ে এবং চার ছেলের জননী। স্বামীর একার রোজগারে সংসার চালাতে হয়। ভিটে মাটি যা ছিলো বিক্রি করে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে। মাত্র ১ কাঠার জমির ওপর একটি ঘর তাদের সম্বল। বিভিন্ন স্থানীয় ব্যাংক ও এনজিওতে প্রায় লক্ষাধিক টাকার ঋণ নিয়েছে। ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেতে দুই ছেলের বাল্যকালে বিয়ে দিয়েছে। ছেলেদের বিয়ের যৌতুকের টাকা দিয়েও দেনা পরিশোধ করতে পারে নি। এখন স্বামী স্ত্রীর মাঝে সব সময় ঝগড়া লেগেই থাকে। পাশ্ববর্তী মানুষ শুধু সুখি বেগমের ঘাড়ে দোষ চাপান। অথচ বাড়ির পাশে প্রায় দুই যুগ আগে থেকে রয়েছে গ্রাম্য স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র।

শুধু নাসরিন আকতার ও সুখি বেগমই নয়। এদের মত রয়েছে লাখ লাখ নারী। যারা জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্বন্ধে সচেতন না হওয়ায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে।
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্যতম ও জনবহুল দেশ। এই দেশের ৮০ ভাগ জনগোষ্ঠী বসবাস করে গ্রামাঞ্চলে। মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হচ্ছে আমাদের দেশে। এসব নারীদের অধিকাংশ অশিক্ষিত। তারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ। একসময় মানুষ মনে করত যিনি জন্ম দিয়েছেন তিনি দিবেন খাবার। এই ধ্যান-ধারণা আধুনিক কালে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে গেছে। ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটো সন্তান। একটি হলে ভালো। শহুর এলাকা ও শিক্ষিত পরিবার ছাড়া গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও রয়েছে অনেক নারী যাদের দুই তিনজন ছেলে মেয়ে থাকা সত্বেও সন্তান নেওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে। ফলে জনসংখ্যা হু হু করে বেড়েই চলছে। ১৮৬০ সালে বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে লোক সংখ্যা ছিলে মাত্র ২ কোটি। ১৯৪১ সালে ৪.২০ কোটিতে দাঁড়ায়। ১৯৭৪ সালে আদম শুমারী মতে, ৭.৬৪ কোটি জনসংখ্যা ছিল। ২০০১ সালে দাঁড়ায় ১২.৯৩ কোটি। অর্থাৎ ২৭ বছরে বেড়েছে ৫.২৮ কোটি জনসংখ্যা। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। এক হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর জন্ম নিচ্ছে ২৫ লাখ শিশু এবং মৃত্যুবরণ করছে মাত্র ৬ লাখ শিশু। ফলে প্রতিবছর বাড়ছে ১৯ লাখ মানুষ। তাছাড়া আধুনিক যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নত ব্যবস্থা থাকায় বাংলাদেশী মানুষের গড় আয়ু আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন জনসংখ্যা সমস্যা সবচে বড় সমস্যা।

গ্রামাঞ্চলে সন্তান প্রসবের কারণ হচ্ছে, অধিকাংশ নারী ও পুরুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্বন্ধে সচেতন নয়। কারণ বাল্য বিবাহের প্রবণতা বেশী প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্বন্ধে এখনও গ্রাম্য নারীরা সচেতন নয়। স্ত্রীর গর্ভে পুরুষ শিশুর জন্ম হোক সেটা চায় স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে। এতে দেখা যায় দুই বা তিন জন কন্যা সন্তান থাকা সত্ত্বেও ছেলে সন্তানের আশায় ক্রমান্বয়ে সন্তান জন্ম দিতে থাকে। নারী-পুরুষ উভয়ে জীবিকার নির্বাহের জন্য কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকে। বিনোদনের জন্য কোন ব্যবস্থা না থাকায় যৌন তৃপ্তিকে একমাত্র বিনোদন ব্যবস্থা মনে করে। ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোন খেয়াল থাকে না। অধিক সন্তান প্রসবের দরুণ মায়েদের স্বাস্থ্য হানি ঘটে। অধিক সন্তান প্রসব করতে গিয়ে নারীরা ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন নারী ফিস্টুলা রোগে ভূগে। কারণ টাকার অভাবে ৮৭ ভাগ ডেলিভারী সম্পন্ন হয় বাড়ীতে।

পবিত্র কোরান শরীফে ইরশাদ হয়েছে, সন্তান জন্মদাতার কর্তব্য তাগিদে (সন্তান) ভদ্রভাবে ভরণ পোষণ করা। ( সুরা বাকারাহ্ আয়াত: ২৩৩) বেশি সন্তান জন্ম দিলে বাচ্চাদের সঠিকভাবে গড়ে তুলা সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের মতে, খাদ্য উৎপাদন অপেক্ষা জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্য সামগ্রী বাড়ে গাণিতিক হারে, জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে।

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করার জন্য স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে দায়ী হলেও সম্পূর্ণ দায় এসে পড়ে নারীর ঘাড়ে। তবে এই কথা অনস্বীকার্য যে, জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সর্ব প্রথমে স্ত্রীকে সচেতন হতে হবে। এক সময় ধর্মীয় নেতারা বলতেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ হারাম। কিন্তু আধুনিককালের আলেম ওলামাদের মতে, তিনটি কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। কারণ সমূহ হচ্ছে, স্ত্রী যদি মনে করে সন্তান জন্ম প্রসব করার কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার আশংঙ্কা রয়েছে, সন্তান লালন-পালন করতে ঝামেলা হবে, অসুস্থতার কারণে। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের এখতিয়ার স্ত্রীর। এছাড়াও হাদীসে বলা হয়েছে, জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য আজল করার কথা। হাদীসের আলোকে আধুনিক কালের আলেম ওলামারা বলেন, আজল করার ক্ষেত্রে স্ত্রী অনুমতি প্রয়োজন। এখানে থেকেও স্পষ্ট যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করার দায়িত্ব নারীর।

দেশে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার ও পরিকল্পনা কেন্দ্র, সরকারি স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সহ অসংখ্য ব্যবস্থা রয়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু মাঠ কর্মীরা গ্রামেগঞ্জে দম্পতিদের দ্বারে দ্বারে যায়না। ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এছাড়াও সরকারিভাবে যে পিল বা মায়া বড়ি প্রদান করা হয় তা এদেশের নারীরা খেলে মাথা ঘুরায় প্রাথমিক অবস্থায়। ফলে অনেক নারী সহ্য করতে না পেরে খাওয়া বাদ দেয়। জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য ইনজেকশনও নারীদের নানা সমস্যা করে। অন্যান্য যে সব জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি রয়েছে সে সম্বন্ধে গ্রামাঞ্চলের নারীরা অজ্ঞ। ফলে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্বন্ধে অজ্ঞ তাদের উচিত স্থানীয় স্বাস্থ্য, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও পারিবারিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক গুলোতে স্ব-উদ্যোগে যোগাযোগ করতে হবে। তাছাড়া শিক্ষিত নারীদের নিকট পরামর্শ নিতে হবে। দাদি, নানী, চাচী, ফুফু, ননদ, শাশুড়ি ও ভাবীরা নব সন্তান প্রসবী নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সর্তক ও সহায়তা করতে পারে। নারীর সদিচ্ছা না থাকলে যতই সচেতন করা হোক না কেন সব বিফল হবে।

বিভিন্ন নারী সংগঠন সমূহকে অধিক সন্তানের পরিণতি বিষয়ে নাটক, বিজ্ঞাপন, প্রবন্ধ, ফিচার ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণের নারীর একান্ত সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন তা না হলে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় এ কথা কারো অস্বীকার করার অবকাশ নেই।

***
আজমাল হোসেন মামুন
(azmal22@gmail.com)
উন্নয়নকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
দক্ষিণখান,& উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট