ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

যদিও দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখনও মেয়েলি গীত চলে বিয়ের আসরে। কিন্তু শহর এলাকায় বিলুপ্তির পথে। সাধারণত: সামাজিক এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানেমেয়েলী গীত দলবেধে মহিলারা গায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের সে ঐতিহ্য হারিয়েযেতে বসেছে। আমরা ১৫ থেকে ২০ বছর আগে দেখেছি, কোন বাড়িতে বিয়ে হলেমহিলারা দলবেধে সারা রাত গীত গাইতো। শুনতেও খুব মজা লাগতো। মাঝে-মধ্যেসেখানে আমরা যেতাম। দেখতাম তাদের আনন্দ। এখনও যে, মেয়েলী গীত নেই তা নয়। তবে তা চোখে পড়ার মত নয়।কারণ, আধুনিক যুগের মেয়েরা সেসব গীত পছন্দ করে না বললেই চলে। তারা পছন্দ করে নাচতে।ব্যন্ড সংগীতের তালে তালে নাচকে খুবই ভালবাসে।

বিয়ের আসরেই বর-যাত্রীবা ডুলিবিবিরা আসলেই কনের পক্ষের মেয়েরা দলবেধে গাইতো,

“ডুলিবিবি আইসাছে পান খাইবার লালচে।“
যখন কনে বা বরকে কিছু খাওয়ানো হতো তখন বলতো,
“বসবো না, বসবো না,ছিঁড়া ছোপে আমরা বসবো নারে,
আরশের বাবা কি জানে নারে।“

শালিকারা গাইতো, “দুলা ভাই গিয়েছে শহরে, আনবে নাকের নথরে, সেই নথ নাকে দিয়ে নাক ঘুরিয়ে নাচবো রে।“

মাঝে মধ্যে গীত গাইতে গাইতে নাচতো মহিলারা। আর কয়েক বছর পর হয়ত মেয়েলীগীত হারিয়ে যেতে পারে বাংলার ঘর থেকে। কারণ, এখনকার মেয়েরা পশ্চিমাকালচারের বিশ্বাসী। পশ্চিমা ঢঙে সাজতে পেলে তরুণদের নাকি বেশি আকৃষ্ট করাযায়। সে জন্য এখন অতীতকে আর কেউ আঁকড়ে ধরে রাখতে চাচ্ছে না। গীতের পরিবর্তে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান পরিবেশন করে বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।

অথচ মেয়েলী গীতের সুর এত করুণ ও আবেগধর্মী যে, কেউ শুনলে সে গীতের কথা ভূলতে পারে না। জেলা শহরে বিয়ে হলেই ব্যন্ড দলকে ভাড়া করে নেওয়া হয়। এতেব্যয়ও বেশি। কিন্তু গ্রামের সহজ-সরল মেয়েদেরকে ভাড়া করা হয় না। তাদের চাওয়াপাওয়াও খুব বেশি নয়। তাদের দু’ চার টাকা দিলেই তারা খুশি থাকে।

বিয়ের ৪ থেকে ৫ দিন আগেই চলতো বিয়ের গীত। সারা রাত গীত শুনেই ভালই মজাপাওয়া যেত। ঢেঁকিতে ধান ভাঙার সময় জুড়ে দিতো বিভিন্ন ধরনের গীত। ধান ভাঙার পর বর বা কনের জন্য তৈরী করতো ঐতিহ্যবাহী খাবার যাকে বলা হতো ‘থুবড়া’ । ধুবড়া’র তালিকায় রাখতো রসগোল্লা,অন্ধাসা, ক্ষীর, ফিরনি এবং ভাপা পিঠা। আদর করে কনে এবং বরকে খাওয়ানোর সময় জুড়ে দিতোগীত। পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে শোনা যেত বিয়ের গীত। ওই গীত এতো মধুর ছিল যার কথা ভুলা যায় না। বরের আগমন,কনেকে গোসল করা, কনেকে বিদোয়ের বেলা যেসব গীতগাওয়া হতো তা এখনও মানুষের মন-প্রাণকেআকুল করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাহারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের শ্রদ্ধা কমে গেছে ঐতিহ্যের প্রতি। তবে একটা কথানা বলে পারছি না যে, ব্যন্ড তারকাদের সাথে সুন্দরীরা তালে তালে নাচলেও তেমনমজা লাগে না। কিন্তু তারপরেও কেন সেটা গ্রাম ও শহরের মানুষ বেশি উপভোগ করছে? আমারমনে হচ্ছে,ব্যাণ্ড সংগীতের তালে তালে নাচ দেখে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তারচেয়ে শত গুণে বেশি আনন্দ পাওয়া যেত মেয়েদের কণ্ঠে বিয়ের গীত শুনে। ধীরে-ধীরে সে ঐতিহ্য ধব্বংস হচ্ছে সে দিকে কারো খেয়াল নেই।

নারীদের হৃদয়ের আবেগ-উৎকন্ঠা,দুৰখ-কষ্ট, হাসি–কান্না,আনন্দ-বিরহেরপ্রকাশ ঘটে বিয়ের গীতে ।সাধারণত কয়েকজন বিভিন্ন বয়েসের নারীগোল হয়ে এক সাথে বসে খালি গলায় বিয়ের গীত পরিবেশন করত। গ্রামের বিয়েতে বিশেষ করে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে গানগাওয়ার জন্য ‘গীত গাওয়ানি’ মধ্যবয়সী মহিলাদের ডাক পড়ত। অথচ তাদের অধিকাংশ ছিল নিরক্ষর । সুরও তারাই দিতো । বিয়ের গীত সমূহ গীত গাওয়ানি’রা বংশক্রমে নিজেরা সহজে আয়ত্ত্ব করতো। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, “কন্যা ডাক দেও তোর জননী না মাইরে/মাওদিয়া যাওক সোনা মুখে হলদিরে/হলুদা, ডাক দেও তোর জনমদাতা বাপেরে/বাবা দিয়েযাউক তোর সোনা মুখে হলদিরে।“বোনেরা গাইত,“হামারভাইয়ের হলদি মাখিবার, মনে নাহি ছিলরে/জোর বেজোর হলদি মাখলে, জোনাকু শালারবহিনরে।“

বর বা কনেকে থুবড়া হিসেবে ক্ষীর খাওয়ার সময় দল বেঁধে মহিলারা গাইত, “আলুয়ার চালে কাঞ্চন দুধে ক্ষীরোয়া পাকালাম, সেই না ক্ষীরোয়া খেতে গরমি লেগেছে। কোথায় আছ বড়ভাবি পাক্কা হিলোয়রে।“

বিয়ে শেষে নিজ বাড়িতে ফিরে আসার সময় বরের প্রতি লক্ষ্য করে গীত গাইত,“কী গহনা আনিছেন দুলা মিয়া দেখানতো হামাকে / সবই জিনিসি আনিছি গুলজান বিবিনথুয়া ছারিছি দেশে।“

বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় কনেকে হাজার স্মৃতি, বেদনা ভুলে যেতে হচ্ছে । যেতে হচ্ছে নতুন বাড়িতে । গুছিয়ে নিতে হবে সংসার । তখন গীতের মাধ্যমে বলত, “মন বিন্দাইলাম বনে বনে, আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও বনে বনে/ আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও নিরলে বসিয়া।“ এ ধরনের অসংখ্য বিয়ের গীত মা-বোনেরা মুখস্ত করে রাখতো । বর্তমান সময়ের মহিলারা এ ধরনের বিয়ের গীত আর চর্চা করে না। অনেকের জানা বিয়ের গীত সমূহ ভুলে গেছে। ফলে ‘গীত গাওয়ানি’দের কদর কমে গেছে সমাজে। আধুনিকতার যান্ত্রিক যুগে ধনাঢ়্য পরিবারে বিয়ের আয়োজন করা হলে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা দিয়ে ভাড়া করা ব্যণ্ড দল। তারা বিভিন্ন মিউজিক বাজিয়ে আধুনিক গান পরিবেশন করে। আর যারা গরিব মানুষ তারাও বিয়ের আসরে বিয়ের গীতের আয়োজন করে না। তারা সাউণ্ডবক্স ভাড়া করে গান জুড়ে দেয়। সে গানের তালে তালে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নাচে।

আমাদের লোকজ ঐতিহ্য আমাদের রক্ষা করা উচিত। আমরা বাঙালি। আমরা যতই পশ্চিমা বিশ্বের ঐতিহ্যকে লালন করি না কেন, আমরা বাঙালি। আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা সহজেই হারাতে পারি না।

 

লেখক-

আজমাল হোসেন মামুন
সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
01704244089.