ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 
chhora-ma

১০ মে আন্তর্জাতিক মা দিবস। ১৯১৪ সাল থেকে প্রতি ইংরেজি মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি মর্যাদার সাথে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রতিটি মূহুর্ত মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্ণ ভালবাসা প্রদর্শন। তবে সবসময় মায়ের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা প্রতিটি সন্তানের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ, ‘মা’ পৃথিবীর সবচেয়ে আপন। সবকিছুর ঋণ পরিশোধ করা গেলেও মায়ের পরিশোধ করা সম্ভব নয়। ‘মা’ শব্দটির বাংলা অর্থ জননী, গর্ভধারিণী, ধাত্রী, গুরুপত্নী, ব্রাহ্মণী, রাজপত্নী, গাভী, শুশ্রুষাকারিণী, প্রতিপালিকা ইত্যাদি। ‘মা’ ডাকতে  খুবই মধূর লাগে। কবির ভাষায়, ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু যেন ভাই, ইহার চেয়ে নাম যে মধুর, ত্রিভুবনে নাই।’

‘মা’ তাঁর সন্তান কে খুবই ভালোবাসে। কারণ সন্তান প্রসবের সময় মায়েরা যে কষ্ট অনুভব করে তা ‘মা’ ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। বাবা শুধু ভরণ-পোষণ দেয়। কিন্তু ‘মা’ সন্তানকে লালন-পালন করে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে- “মা’য়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত।” গণশিল্পী আলমগীরের ভাষায়, “মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপুস বানাইলেও ঋণ শোধ হবে না।”

হিন্দু ধর্মে বলা হয়েছে- মা-বাবার সেবা কর। খ্রিষ্টান ধর্মে বলা হয়েছে- পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করার কথা। মোদ্দাকথা পৃথিবীর সকল ধর্মে মা-বাবার সাথে কর্কশ ব্যবহার করাকে মহাপাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নেপোলিয়ান বলেছেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।”

‘মা’ চান সন্তানের মঙ্গল। সন্তানের সফলতা মায়ের সফলতা, সন্তানের ব্যর্থতা মায়ের হৃদয় কে ব্যথিত করে। বিশেষ করে যেসব মায়েদের সন্তান প্রতিবন্ধী। সেসব মায়েদের দুঃখের সীমা থাকে না। ‘মা’ সকল সন্তানকে একই চোখে সমান দৃষ্টিতে দেখে। অনেক প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে যাদের অবস্থা গুরুতর। ‘মা’ তাদের পাশে বসে থাকে। কারণ মায়েরা প্রসব বেদনা সব সন্তানের েেত্রই অনুভব করে। ফলে মহান আলাহ পবিত্র কোরানে ঘোষণা করেছেন “আমি মানুষকে কষ্টের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।” প্রতিবন্ধী সন্তানকে সকল মানুষ ঘৃণা করলেও ‘মা’ কখনও ঘৃণা করে না। ‘মা’ স্বপ্ন দেখে হয়ত সন্তানটির প্রতিবন্ধিতা কমবে।

এক সমীায় দেখা গেছে- অনেক নারী স্বামী ও ননদ কর্তৃক অকথ্য নির্যাতিত হওয়ার পরও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে বিচ্ছেদ করে না। অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মায়েদের অবস্থা আরোও করুণ। প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অনেক ‘মা’ কে স্বামী  তালাক দিয়েছে। ঘর থেকে সন্তানসহ বের করে দিয়েছে। তবু ‘মা’ সন্তানটিকে নিজের বুকের কাছে রেখেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিবন্ধী সন্তান মায়েদেরকে সমাজ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। মনে করে হয়ত মায়ের পাপের ফসল হিসেবে সন্তান প্রতিবন্ধী। যা ‘মা’কে খুব কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়।

কবি মায়ের কোলকে বিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করেছেন। ‘মা’ পারে একমাত্র সকল সন্তানের মনে সাহস যোগাতে। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমার পালনকর্তা (কতিপয়) সিদ্ধান্ দিয়েছেন (তা এই) যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচারণ করবে। যদি তাঁরা বৃদ্ধকালে পৌঁছে যায়, তাহলে (তাদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে) তাদের তুমি উহ্ শব্দও বলবে না এবং তাদের ধমকও দেবে না। আর তাদের সঙ্গে তুমি সম্মানজনক কথা বলবে এবং তাদের জন্য দোয়ার মধ্য থেকে ন¤্রতার বাহু ঝুঁকিয়ে দাও। আর তাদের জন্য দোয়াস্বরূপ বলবে, হে আমার পালনকর্তা, তাদের দু’জনের ওপর ঐরূপ দয়া কর, যেরূপ তারা আমাকে ছোটবেলায় লালন-পালন করেছিলেন (সুরা বনি ইসরাইল, ২৩-২৪ আয়াত)।

হাদীস শরীফে রয়েছে, “একবার এক সাহাবী হযরত রাসুলে কারীম (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন। হে আলাহর রাসুল! সবচেয়ে কার মর্যাদা বেশী। রাসুলুলাহ (সা.) বললেন, তোমার মা। আবার জিজ্ঞাসা করলেন তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারপরে কে? তোমার মা। তারপরে কার মর্যাদা বেশী। এবার রাসুলুলাহ (সা.) বললেন, তারপরে তোমার বাবা।”

হযরত ইবনে মাসউদ বলেন, “একবার আমি হজরত নবী করীমকে (সা.) জিজ্ঞেস করলাম, কোন কাজটি আল্লাহ পাকের দরবারে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করা। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত)। হযরত আবু উমামাহ (রা.) নামক এক সাহাবী বলেন, একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.) সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অধিকার কী? তিনি (সা.) বললেন, তাঁরা দু’জন তোমার জান্নাত অথবা তোমার জাহান্নাম (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)।”
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি রাসুলে আকরাম (সা.) এর কাছে এসে ইসলামের জন্যে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার মা জীবিত আছেন কিনা? যখন লোকটি উত্তরে বলল, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ফিরে যাও এবং তোমার মায়ের কাছে থাক। কেননা, বেহেশত তাঁর পায়ের নিচে (আহমদ, বায়হাকি, নাসায়ি)।

দুঃখের বিষয়, আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মায়েদের অবস্থা খুবই করুণ। ছেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বিলাস বহুল বাসায় বসবাস করে। মা পড়ে থাকে একা গ্রামে। থাকে না মায়ের সেবা করার মত লোক। এমনকি অনেক মানুষ বৃদ্ধা মায়ের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। অথচ দীর্ঘ ২ থেকে আড়াই বছর মায়ের বুকের দুধ পান করা সহ লালন-পালন করেছে সন্তানকে মা। এতে দেখা যাচ্ছে, সন্তান থাকার পরেও অনেক মায়েদের ভিার ঝুলি ঘাড়ে নিতে হচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে মায়েদের কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এর চেয়ে মায়ের কষ্ট কী আর হতে পারে?

আসুন আমরা সকল সন্তান মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার হাত প্রশস্ত করি। মায়ের সুখের জন্য ত্যাগ করি জীবন। যাতে মায়েদের মুখে ফুট ওঠে হাসি। প্রতিটি দিনের প্রতি মূহুর্ত মা দিবস হিসেবে গণ্য করি।এই প্রত্যাশা রইল সকলের প্রতি।

লেখক-
আজমাল হোসেন মামুন
শিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী
উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।
মোবাইল নং-০১৭০৪২৪৪০৮৯