ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

a111

১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় প্রতি বছরের ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে এক দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে কতটুকু উন্নতি হয়েছে এ দেশের প্রবীণদের। প্রবীণরা অবহেলিত। জাতিসংঘ অনুযায়ী ৬০ বছর বয়সী মানুষকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা প্রায় ৭০ কোটি। সে হিসেবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭ ভাগ প্রবীণ। বাংলাদেশে প্রবীণদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ বিধবা। শিশু মৃত্যু এবং জন্মহার কমে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে ৯ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ১৭ শতাংশ হবে। তখন প্রবীণরা আরো অবহেলার শিকার হবে। তবে বেশি সমস্যায় পড়বে প্রবীণরা। যে সমস্যার ভার এসে পড়বে দেশের ওপর। সমস্যা মোকাবেলা করাটাও খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুসারে, ২০৩০ ও ২০৫০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ হবে প্রবীণ। ২০৪৪ সালে প্রবীণ জনগোষ্ঠির সংখ্যা কমবয়সী জনগোষ্ঠিকে ছাড়িয়ে যাবে।

প্রবীণরা তাঁদের ছেলে মেয়েদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে থাকে। একমনকি নাতি-নাতনী এবং পার্শ্ববর্তী দুষ্টু শিশুদের দ্বারাও অপমানিত হয়। ঠিকমত সেবা যত্ম থেকে ওরা বঞ্চিত। তবে মহিলা প্রবীণরা বেশি অবহেলিত। তাদের কোন গতি থাকে না। বাংলাদেশে প্রবীণদের আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা অতি নগণ্য। আজকাল রাজধানী ঢাকা শহরে দেখা যায়, ছেলে বসবাস করে বিলাস বহুল ফাটে। মা থাকে বস্তিতে। অথচ আমরা চিন্তা করি না। আমাদের লালন পালন করেছে কে? কে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পিছনে অর্থ ব্যয় করেছে। অনেকে প্রবাসে সুখী জীবন যাপন করলেও একটি বারও বৃদ্ধা মা বাবার কথা চিন্তা করে না। তাদেরকে সহযোগিতা করে না। মহান আলাহ পবিত্র কোরান শরীফে বলেছেন, তোমার প্রভু তোমাদের মায়েদের প্রতি সদব্যবহার করতে বলেছেন। যখন তারা বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছবে তখন তোমরা তাদের সাথে এমন আচরণ করিও না যাতে তারা ওঃ শব্দ মুখ দিয়ে বের করে। (আল কুরআন: সুরা বনি ঈসরাইল)

পৃথিবীর সকল ধর্মই প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শন করাকে অতি পূণ্যের কাজ মনে করে। যুদ্ধের সময় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিও দেখানো হয়ে থাকে। কারণ, একসময় ওরা তরুণ-তরুণী ছিলো। সমাজে ছিলো তাঁদের গ্রহণ যোগ্যতা। কিন্তু প্রবীণ বয়সে ওদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়।

গ্রামাঞ্চলে প্রবীণরা ছেলে ও বউয়ের হাতে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হলেও সমাজের নিকট বিচার পায় না। ওল্টো সমাজের গণ্য-মান্য ব্যক্তিরা প্রবীণদের অপমান করে। এতে কান্নায় চোখের জলে ভাসিয়ে দেয় সারা শরীর। ওসব ঘটনা প্রকাশিত হয় না। শুধু তারা বিচারের জন্য আলাহর নিকট দাবি করে। অনেক পরিবার বৃদ্ধ মা-বাবার মৃত্যু কামণা করে। মনে করে তাঁরা বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের পথের কাঁটা। প্রবীণদের মতামতে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ প্রবীণদের সারা জীবনের সঞ্চয়ের ওপর বা সম্পদের ওপর ভর করেই চলে পরিবারের সংসার।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের প্রতি সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সুবিধাভোগীর সংখ্যা ছিল ২২ লক্ষ ৫০ হাজার। ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৪ লক্ষ ৭৫ হাজারে উন্নীত করে ৮৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জনপ্রতি ৪০০ টাকা হারে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে যা মোট ১৩০৬.৮০ কোটি টাকা। উপকারভোগীর সংখ্যা (হাজার জনে) ২৭২২.৫০ জন।

যা প্রবীণদের তুলনায় অতি নগণ্য বলা যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেলেও বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা ও নিশ্চিত জীবন যাপনের সুযোগ তেমন বৃদ্ধি পায়নি। ফলে এরা সমাজের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৪ সালে সর্ব প্রথম ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয় নি। ১৯৯৮ সালে সীমিত পর্যায়ে দেশের সকল ইউপিতে প্রত্যেক ওয়ার্ডের জন্য ১০ জন করে সর্বাপেক্ষা প্রবীণদের মাসিক ১০০ টাকা হারে ভাতা প্রদানের আওতায় আনা হয়। সে বছর বরাদ্দ রাখা হয় ৫০ কোটি টাকা। তখন সুবিধাভোগীর সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ ১৫ হাজার ১৭০ জন। বর্তমানে তা বেড়েছে।

তবে আগামি বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, এ ভাতা পাওয়ায় গ্রামের অনেক প্রবীণদের পরিবারের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা বেড়েছে। তাঁরা ভাতার টাকা দিয়ে যখন নাতি-নাতনীদের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যায় তখন নাতি-নাতনীরা খুব খুশি হয়। সেবা-যত্মের পরিমাণও বেড়ে যায়। তাছাড়া বৃদ্ধ নিবাস প্রতিটি জেলায় স্থাপণ করতে হবে। তাহলে প্রবীণরা সেবা-যত্ম পাবে। মনে রাখতে হবে সবাইকে একদিন প্রবীণ হতে হবে। ওদের উৎসাহে আমরা বড় হয়েছি। ওরা আমাদের আদর যত্ম করে বড় করেছে। বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে সকলকে।

প্রবীণদের প্রতি কর্কশ ব্যবহার থেকে সকলকে বিরত থাকতে হবে। তাদের নায্য অধিকার দিতে হবে। তাদের মতামতের গুরুত্ব দিতে হবে। এটা সকলের দায়িত্ব কর্তব্য। আসুন সকলে আমরা প্রবীণদের নিয়ে একটা কিছু করার চেষ্টা করি। এ ব্যাপারে সকলকে সচেতন করি।

লেখক-

আজমাল হোসেন মামুন
সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

মোবাইল নং-০১৭০৪২৪৪০৮৯